ফরাসি বাহিনীর কয়েকজন বন্দি ওরিলে থাকত। তাদের মধ্যে একজন তরুণ ইতালিয়কে ডাক্তারটি একদিন পিয়েরের সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে এল।
অফিসারটি প্রায়ই পিয়েরের সঙ্গে দেখা করতে আসতে লাগল, আর পিয়েরের প্রতি ইতালিয় যুবকটির অনুরাগ নিয়ে প্রিন্সেস প্রায়ই হাসি-ঠাট্টা করত।
পিয়েরের সঙ্গে দেখা করতে, তার সঙ্গে কথা বলতে, তার নিজের অতীত জীবনের কথা, বাড়ির কথা, ভালোবাসার কথা বলতে পারলেই ইতালিয় যুবকটি খুব আনন্দ পেত। ফরাসিদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে মনের ক্ষোভ ঢালতে পারলে সে খুব খুশি হত।
একদিন সে পিয়েরকে বলল, সব রুশ যদি তিলমাত্রও আপনার মতোই হয়, তাহলে তো এরকম একটা জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মহাপাপ। ফরাসিদের হাতে আপনি এত কষ্ট সয়েছেন, অথচ তাদের প্রতি কোনো শত্রুতা আপনি মনের মধ্যে পোষণ করেন না।
শুধু ইতালিয় যুবকটির অন্তরের সৎগুণগুলিকে উদ্বুদ্ধ করে এবং সে কাজে আনন্দ অনুভব করেই পিয়ের যুবকটির উচ্ছ্বসিত অনুরাগ অর্জন করতে পেরেছে।
ওরিলে অবস্থানের শেষের দিকে ভ্রাতৃসংঘের একজন পূর্বপরিচিত ভাই কাউন্ট উইলার্স্কি পিয়েরের সঙ্গে দেখা করতে এল। ওরিল প্রদেশের একটা বড় জমিদারির এক উত্তরাধিকারিণীকে সে বিয়ে করেছে এবং সেই শহরে কমিসারিয়েট বিভাগে একটি অস্থায়ী চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছে।
আগেকার দিনে টাকাপয়সার ব্যাপার নিয়ে, বিশেষ করে কেউ টাকাপয়সা চাইতে এলে পিয়ের বড়ই বিপদে পড়ে যেত। নিজেকে প্রশ্ন করত, দেব কি দেব না? আমার টাকাটা আছে, আর তার ওটা দরকার। কিন্তু অন্য কারো দরকার তো আরো বেশি। কার দরকার সব চাইতে বেশি? আর হয় তো দুজনই জোচ্চোর। পুরোনো দিনগুলোতে এইসব প্রশ্নের সামনে সে বড়ই অসহায় বোধ করত, আর যতক্ষণ দেবার মতো কিছু থাকত ততক্ষণ যে এসে চাইত তাকেই দিয়ে দিত। সে সময় সম্পত্তির ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন দেখা দিলেই এক একজন এক একরকম পরামর্শ দিত, আর সে বড়ই বিপাকে পড়ে যেত।
কিন্তু এখন সে সবিস্ময়ে লক্ষ্য করছে যে এসব প্রশ্ন নিয়ে তার মনে এখন আর কোনো সন্দেহ বা বিহ্বলতা নেই। তার মধ্যে এখন এমন একজন বিচারক আসন পেতে বসেছে যে তার কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত এক বিধানের বলে কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয় সেটা মুহূর্তেই স্থির করে দেয়।
এই নতুন বিচারকের আশ্রয় সে প্রথম লাভ করল যখন জনৈক ফরাসি বন্দি, একজন কর্নেল, তার কাছে এল, অনেক বড় বড় কথা বলল, এবং এই বলে শেষ করল যে তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে পাঠাবার জন্য তাকে চার হাজার ফ্রাঁ পিয়েরকে দিতেই হবে। তিলমাত্র অসুবিধা বোধ বা প্রচেষ্টা ছাড়াই পিয়ের টাকাটা দিতে অস্বীকার করল, আর পরে এই ভেবে বিস্মিত হল যে আগে যে-কাজটা ছিল প্রায় দুঃসাধ্য এখন সেটা কত সহজ ও সরলভাবে হয়ে গেল। জাগতিক ব্যাপারে তার এই স্থির সিদ্ধান্তের মনোভাবের আর একটা প্রমাণ পিয়ের পেল তার স্ত্রীর ঋণশোধ এবং মস্কোতে ও শহরতলীতে তার বাড়িঘরগুলি নতুন করে তৈরি করা সম্পর্কে তার সিদ্ধান্তকে লক্ষ্য করে।
তার বড় নায়েব ওরিলে এসে পিয়েরের সঙ্গে দেখা করল। তার সঙ্গে বসে পিয়ের নিজের স্বল্প আয়ের হিসাব করল। বড় নায়েবের হিসাব মতে মস্কোর অগ্নিকাণ্ডের ফলে তার ক্ষতি হয়েছে প্রায় বিশ লক্ষ রুবল।
এই ক্ষতির জন্য সান্ত্বনা জানাতে প্রধান নায়েব তাকে হিসাব কষে দেখিয়ে দিল যে এইসব ক্ষতি সত্ত্বেও তার আয় হ্রাস না পেয়ে বরং আরো বৃদ্ধি পেতে পারে যদি সে তার স্ত্রীর ঋণ শোধ করতে অস্বীকার করে, সে ঋণ শোধ করার কোনো বাধ্যবাধকতা তার নেই-এবং তার মস্কোর বাড়ি এবং মস্কোর জমিদারিতে অবস্থিত পল্লীভবনটি নতুন করে তৈরি না করে, সেইসব বাড়ির জন্য তার বছরে ব্যয় হয় আশি হাজার রুবল, অথচ উপার্জন হয়না কিছুই।
স্মিত হাসির সঙ্গে পিয়ের বলল, হ্যাঁ, সেকথা সত্যি। সেসবের আমার কোনো প্রয়োজন নেই। সর্বস্বান্ত হয়ে আমি অধিকতর ধনী হয়েছি।
কিন্তু জানুয়ারি মাসে সা ভেলিচ মস্কো থেকে এসে সেখানকার পরিস্থিতির একটা বিবরণ দিল এবং মস্কোর বাড়ি ও পল্লীভবন পুনরায় নির্মাণের দরুন জনৈক স্থপতির একটা হিসাব দিয়ে বলল যে সে কাজ করার ব্যবস্থাটা পাকা হয়ে গেছে।সেইসময়ই প্রিন্স ভাসিলি এবং পিটার্সবুর্গের অন্য পরিচিতজনরা চিঠি লিখে তার স্ত্রীর ঋণের কথাটা জানিয়ে দিল। আর পিয়েরও স্থির করে ফেলল যে, নায়েবের যে প্রস্তাব তাকে এত খুশি করেছিল সেটা ছিল ভুল। কাজেই সে অবিলম্বে পিটার্সবুর্গ যাবে এবং স্ত্রীর ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলবে, আর মস্কোতে বাড়িঘরও নতুন করে তৈরি করবে। সেটা যে কোন প্রয়োজন তা জানে না, কিন্তু এটা সে নিশ্চিত জানে যে কাজটা প্রয়োজনীয়। এতে তার আয় তিন-চতুর্থাংশ হ্রাস পাবে, কিন্তু এটা অবশ্য করতে হবে।
উইলার্স্কিও মস্কো যাচ্ছিল, স্থির হল দুজন একসঙ্গেই যাবে।
ওরিলে স্বাস্থ্যোদ্ধারের সময় আনন্দ, মুক্তি ও জীবনের একটা অনুভূতি পিয়েরের হয়েছিল, কিন্তু এবার যাত্রাপথে খোলা পৃথিবীতে এসে, শত শত নতুন মুখ দেখে, সেই অনুভূতি তীব্রতর হল। সারা পথ তার নিজেকে ছুটিপাওয়া স্কুলের ছাত্রের মতো মনে হতে লাগল। সরকারি গাড়ির কোচয়ান, ডাক-ঘাঁটির ওভারসিয়ার, রাস্তার ও গ্রামের চাষীর দল, সবকিছুই তার কাছে নতুন করে অর্থবহ হয়ে উঠল। উইলার্স্কি অনবরত ইউরোপের তুলনায় রাশিয়ার অজ্ঞানতা, দারিদ্র্য ও অনগ্রসরতার নিন্দা করতে লাগল, তবু তার উপস্থিতি ও মন্তব্য পিয়েরের আনন্দকে শুধু বাড়িয়েই তুলল। উইলাঙ্কি যেখানে দেখে মৃত্যু, পিয়ের সেখানেই দেখে অসাধারণ জীবনীশক্তি-যে শক্তি এই বরফাবৃত বিস্তীর্ণ প্রান্তরের বুকে এই মৌলিক, বিচিত্র, অসাধারণ মানুষগুলির জীবনকে রক্ষা করছে। উইলার্স্কির কথার কোনো প্রতিবাদ সে করল না, বরং তার সঙ্গে একমতই হল-যে আলোচনা শেষপর্যন্ত ফলপ্রসূ হবে না তাকে এড়িয়ে চলবার সহজতম পথই হল আপাতত একমত হওয়া-আর তার কথা শুনতে শুনতে পিয়ের আনন্দের হাসি হাসতে লাগল।
