তাকে মর্যাদার আসন থেকে সরিয়ে সে আসন অন্যকে দিতে হলে তার স্বাস্থ্য তো খারাপ হতেই হবে। আর আসলেও তার স্বাস্থ্য তো খারাপই ছিল।
সুতরাং তার ভূমিকা যখন শেষ হয়ে গেল তখন স্বাভাবিক ও সরল পথেই নতুন ও প্রয়োজনীয় অভিনেতার দ্বারা একে একে তার স্থান পূরণ করা হতে লাগল।
১৮১২ সালের যুদ্ধের যে জাতীয় তাৎপর্য প্রতিটি রুশের অন্তরের নিধি, তাছাড়াও সে যুদ্ধকে এবার লাভ করতে হবে একটা ইওরোপীয় তাৎপর্য।
জনসাধারণের পশ্চিম থেকে পুবে অভিযানের পরেই শুরু করতে হবে তাদের পুব থেকে পশ্চিমে অভিযান, আর সেই নতুন যুদ্ধের জন্য চাই এমন একজন নেতা যার গুণ-গরিমা, মনোভাব কুতুজভ থেকে ভিন্ন, যে পরিচালিত হবে ভিন্ন অভিপ্রায়ের দ্বারা।
রাশিয়ার মুক্তি ও গৌরবের জন্য যেমন প্রয়োজন হয়েছিল কুতুজভকে, তেমনই জনগণকে পুব থেকে পশ্চিমে পরিচালিত করতে, জাতীয় সীমান্তকে নতুন করে নির্ধারণ করতে প্রয়োজন হল প্রথম আলেক্সান্দারকে। ইওরোপ, শক্তি-কাম্য, বা নেপোলিয়ন বলতে কি বোঝায় কুতুজভ তা বুঝতে পারল না। সত্যি সে বুঝতে পারেনি। শত্রুকে ধ্বংস করে রাশিয়াকে মুক্ত করে গৌরবের শিখরে প্রতিষ্ঠিত করার পরে, একজন রুশ হিসেবে রুশ জনগণের প্রতিনিধির আর কিছু করার ছিল না। জাতীয় যুদ্ধের প্রতিনিধির সম্মুখে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই রইল না। কুতুজভের মৃত্যু হল।
.
অধ্যায়-১২
সাধারণত যা ঘটে থাকে, বন্দি থাকা অবস্থায় যেসব দৈহিক দুঃখকষ্ট ও মানসিক চাপ পিয়েরকে সহ্য করতে হয়েছিল তার ফল ফলতে লাগল সে অবস্থা থেকে মুক্তিলাভের পরে। মুক্তি পেয়ে সে প্রথম গেল ওরিল, সেখানে তিন দিন কাটিয়ে কিয়েভ যাত্রার মুখে অসুস্থ হয়ে তিন মাস শয্যাশায়ী হয়ে কাটাল। ডাক্তাররা বলল তার পিত্ত জ্বর হয়েছে। চিকিৎসা চলল, রক্তমোক্ষণ করা হল, খাবার ওষুধ দেওয়া হল-সে ভালো হয়ে উঠল।
উদ্ধারলাভের সময় থেকে অসুস্থ হওয়া পর্যন্ত সময়ে যা কিছু ঘটেছিল তার প্রায় কোনো কথাই পিয়েরের মনে নেই। শুধু মনে পড়ে একঘেয়ে ধূসর আবহাওয়া, কখনো বৃষ্টি পড়ছে, কখনো বরফ, শরীরের ভিতরে যন্ত্রণা, পায়ে ও এক পাশে ব্যথা। সাধারণভাবে আরো মনে পড়ে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও দুর্ভাগ্যের কথা, অফিসার ও জেনারেলদের কৌতূহল ও জেরার যন্ত্রণা, যানবাহন ও ঘোড়া সংগ্রহ করার অসুবিধা, এবং নিজের দিক থেকে সর্বক্ষণ চিন্তা ও অনুভূতির অক্ষমতা। মুক্তির দিনটিতেই সে দেখেছিল পেতয়া রশুভের মৃতদেহ। সেই একই দিনে জানতে পেরেছিল, বরদিনো যুদ্ধের পরে এক মাসেরও বেশি সময় বেঁচে থাকার পরে প্রিন্স আন্দ্রু সম্প্রতি মারা গেছে রস্তভদের ইয়ারোস্লাভলের বাড়িতে, সেই সঙ্গে দেনিসভ আরো জানিয়েছিল যে হেলেনের মৃত্যু হয়েছে, যদিও সে ধরেই নিয়েছিল যে এ খবরটা পিয়ের অনেক আগেই জেনেছে। সেসময় পিয়েরের কাছে সবকিছুই আশ্চর্য লেগেছিল : মনে হয়েছিল এসব কথার কোনো তাৎপর্যই সে ধরতে পারছে না। তখন তার একমাত্র লক্ষ্য যেসব জায়গায় মানুষ মানুষকে খুন করছে সেখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালিয়ে এমন কোনো শান্তিপূর্ণ আশ্রয়ে চলে যাওয়া যেখানে গেলে সে সেরে উঠবে, বিশ্রাম নিতে পারবে, এবং যেসব বিচিত্র নতুন ঘটনার কথা শুনেছে তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে পারবে। কিন্তু ওরিলে পৌঁছেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। রোগ থেকে সেরে উঠে দেখল, তার দেখাশুনা করার জন্য মস্কো থেকে এসেছে তার দু চাকার তেরেন্তি ও ভাস্কা, আর এসেছে তার জ্ঞাতি-বোন বড় প্রিন্সেস যে নিজের এলেৎসের জমিদারিতে থাকে এবং তার উদ্ধার ও অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তাকে দেখতে এসেছে।
একটু একটু করে রোগ থেকে সেরে উঠলেও অনেকদিন পর্যন্ত সে স্বপ্নের মধ্যে দেখতে পেত, সে যেন এখন সেই বন্দি জীবনই কাটাচ্ছে। সেই অবস্থায়ই একটু একটু করে সে জেনেছে প্রিন্স আন্দ্রুর মৃত্যু, তার স্ত্রীর মৃত্যু এবং ফরাসিদের ধ্বংসের খবর।
রোগ থেকে সেরে উঠতে উঠতে মুক্তির একটা সানন্দ অনুভূতি পিয়েরের অন্তরকে ভরে তুলল। অবাক হয়ে দেখল, অন্তরের এই মুক্তির অনুভূতি যেন একটা বাহ্যিক মুক্তির পরিবেশও রচনা করেছে। এখানে এই অপরিচিত শহরে সে একেবারে একা-কোনো পরিচিত মানুষ নেই। কেউ তার কাছে কিছু চাইল না, তাকে কোথাও পাঠাল না। যা কিছু চেয়েছিল সবই সে পেয়েছে : যে স্ত্রীর চিন্তা ছিল তার নিরন্তর যন্ত্রণার কারণ সেও আর এখানে নেই, কারণ সে তো ইহলোকেই নেই।
আঃ, কী সুন্দর! কী চমৎকার! সুস্বাদু গোমাংস-চা সাজানো পরিষ্কার টেবিলটা যখন তার দিকে এগিয়ে দেওয়া হয়, রাত হলে যখন সে একটা পরিষ্কার নরম বিছানায় গা এলিয়ে দেয়, অথবা যখন তার মনে পড়ে যে ফরাসিরা চলে গেছে আর তার স্ত্রী ইহজগতে নেই, তখনই সে নিজের মনে বলে ওঠে, আঃ, কী সুন্দর! কী চমৎকার!
তারপর পুরনো অভ্যাসবশত নিজেকেই প্রশ্ন করে : আচ্ছা, তারপর কি? এখন আমি কি করব? সঙ্গে সঙ্গে নিজেই জবাব দেয়, ঠিক আছে, আমি বাঁচব। আঃ, কী চমৎকার!
যে প্রশ্নটি আগে তাকে যন্ত্রণা দিত, জীবনের যে লক্ষ্যকে সে অবিরাম খুঁজে বেড়াত, এখন আর সে প্রশ্ন তার সামনে নেই। জীবনের লক্ষ্যকে অনুসন্ধান করে ফেরা যে সাময়িকভাবে দূর হয়েছে তাই নয়, তার জীবনে। তার কোনো অস্তিত্বই আর নেই, কোনোদিন থাকবে না। আর জীবনের এই লক্ষ্যহীনতাই তাকে এনে দিয়েছে। পরিপূর্ণ মুক্তির আনন্দ, সুখের অনুভূতি।
