একজন বার্তাবাহক ঘর্মাক্ত কলেবরে তিন-ঘোড়ায় টানা এয়কা গাড়িতে চেপে সকলের আগে দুর্গদ্বারে পৌঁছে চিৎকার করে ঘোষণা করল, আসছেন! আর কনভনিৎসিন ছুটে গিয়ে কুতুজভকে খবরটা দিল, সে তখন দ্বাররক্ষকের ঘোট বাসায় অপেক্ষা করছিল।
এক মিনিট পরেই সেই বুড়ো মানুষটির মস্তবড় দশাসই মূর্তিটা হেলেদুলে এসে বারান্দায় দাঁড়াল। পরনে পূর্ণ ইউনিফর্ম, বুকের উপর সম্মান-স্মারকগুলি ঝোলানো, পেটের উপর একটি চাদর জড়ানো। টুপিটাকে কাৎ করে মাথায় পরে নিল, দস্তানা দুটো হাতে নিল, তারপর বেশ কষ্ট করে একপাশ হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে রাস্তার সমতলে পৌঁছে সম্রাটের জন্য তৈরি প্রতিবেদনটি হাতে নিল।
চারদিকে ফিসফিস ও ছুটাছুটি শুরু হল। আর একটা এয়কা গাড়ি তীর বেগে ছুটে এল, সকলের দৃষ্টি ঘুরে গেল অগ্রসরমান স্লেজটার দিকে। তাতে সম্রাট ও বলকনস্কির মূর্তি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
পঞ্চাশ বছরের অভ্যাসবশত এ সবকিছুই বৃদ্ধ জেনারেলকে উত্তেজিত করে তুলল। অতি সযত্নে সাজ পোশাকটা ঠিক করে নিল, টুপিটা ঠিক মতো বসাল, মনে সাহস আনল, আর ঠিক যেমুহূর্তে মেজ থেকে নেমে সম্রাট তার দিকে চোখ তুলে তাকাল অমনি প্রতিবেদনটা তার হাতে দিয়ে কোমল কৃতজ্ঞ গলায় কথা বলতে শুরু করল।
সম্রাট দ্রুত সঞ্চালিত দৃষ্টিতে কুতুজভের মাথা থেকে পা পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখল, মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টি দ্রুকুটিকুটিল হয়ে উঠল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে ভাব দমন করে বুড়ো মানুষটির দিকে এগিয়ে গেল, হাত বাড়িয়ে তাকে আলিঙ্গন করল। দীর্ঘদিনের অভ্যাসবশত সেই আলিঙ্গনের ফলেও কুতুজভের বুকের ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
সম্রাট অফিসার ও সেমেনভ রেজিমেন্টকে অভিনন্দন জানাল, তারপর পুনরায় বুড়ো মানুষটির হাতটা চেপে ধরে তার সঙ্গেই দুর্গে প্রবেশ করল।
ফিল্ড-মার্শালকে একাকি পেয়ে সম্রাট শত্রুর পশ্চাদ্ধাবনে শ্লথ গতি এবং ক্রাসনু ও বেরিজিনাতে ভুলের জন্য অসন্তোষ প্রকাশ করল, এবং বিদেশে আর একটি অভিযানের অভিপ্রায় ব্যক্ত করল। কুতুজভ কোনো উত্তর দিল না, কিছু মন্তব্যও করল না। সাত বছর আগে অস্তারলিজ রণক্ষেত্রে যে বিনীত, ভাবলেশহীন দৃষ্টি নিয়ে সম্রাটের নির্দেশ শুনেছিল, আজও সেই একই দৃষ্টি ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে।
পড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে ভারী শরীরটা দুলিয়ে কুতুজভ যখন নতশিরে নাচঘরটা পার হয়ে যাচ্ছিল, তখন কার যেন কণ্ঠস্বরে তার গতিরোধ হল, প্রশান্ত মহামহিম!
কুতুজভ মাথা তুলল। অনেকক্ষণ কাউন্ট তলস্তয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। একটা রুপোর পাত্র হাতে নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। পাত্রের উপর একটা ছোট কি যেন রয়েছে। কুতুজভ কিছুই বুঝতে পারল না।
সহসা তার মনে পড়ে গেল, তার গোল মুখে একটা প্রায় অলক্ষ্য হাসি খেলে গেল, মাথা নীচু করে শ্রদ্ধাভরে সে পাত্র থেকে জিনিসটি তুলে নিল। জিনিসটি প্রথম শ্রেণীর অর্ডার অব সেন্ট জর্জ।
.
অধ্যায়-১১
পরদিন ফিল্ড-মার্শাল একটি নৈশভোজ ও বলনাচের আয়োজন করল। সম্রাট উপস্থিত থেকে তাকে কৃতার্থ করল। কুতুজভ প্রথম শ্রেণীর অর্ডার অব সেন্ট জর্জ লাভ করল, সম্রাট তাকে সুউচ্চ সম্মান দেখাল, কিন্তু সম্রাটের অসন্তোষের কথাও প্রত্যেকেই জানল। যথাবিহিত সৌজন্য দেখানো হল, সে ব্যাপারে সম্রাটই প্রথম। দৃষ্টান্ত স্থাপন করল, কিন্তু সকলেই জানল যে বুড়ো মানুষটিই দোষী, সে কোনো কাজের নয়। ক্যাথারিনের সময়কার একটা রীতি অনুযায়ী কুতুজভ যখন হুকুম দিল, যেসব পতাকা দখল করা হয়েছে সম্রাট নাচঘরে ঢুকলেই সেগুলি তার পায়ের কাছে যেন নামিয়ে দেওয়া হয়, তখন সম্রাটের মুখটা ঈষৎ বিকৃত হয়ে গেল, বিড়বিড় করে সম্রাট যা বলল তার মধ্যে কেউ কেউ শুনতে পেল, পুরোনো বিদূষক কথা দুটি।
কুতুজভের প্রতি সম্রাটের অসন্তোষ বিশেষভাবে বেড়ে গেল ভিলনাতে, কারণ আসন্ন অভিযানের গুরুত্বটা সে বুঝতে পারল না, বুঝিবা বুঝতে চাইলও না।
পরদিন সকালে সম্রাট যখন সমবেত রাজকর্মচারীদের বলল : আপনারা শুধু রাশিয়াকে রক্ষা করেননি, রক্ষা করেছেন সারা ইওরোপকে, তখনই সকলে বুঝল যে যুদ্ধ শেষ হয়নি।
শুধু কুতুজভই সেটা বুঝতে পারল না, সে প্রকাশ্যেই এই বলে নিজের মতো ব্যক্ত করল যে নতুন কোনো যুদ্ধ অবস্থার উন্নতি করতে পারবে না, রাশিয়ার গৌরবকেও বৃদ্ধি করতে পারবে না, শুধু যে গৌরব রাশিয়া অর্জন করেছে তাকে নষ্ট করবে। নতুন করে সৈন্য সংগ্রহ করা অসম্ভব, জনসাধারণ যথেষ্ট কষ্ট সহ্য করেছে, পরাজয়ের সম্ভাবনাও তো রয়েছে-এইসব কথাই সে সম্রাটকে বোঝাতে চেষ্টা করল।
এই যখন ফিল্ড-মার্শালের মনোভাব তখন স্বভাবতই তাকে আসন্ন যুদ্ধের পথে একটা বিঘ্ন বলেই মনে করা হতে লাগল।
এই বুড়ো মানুষটির সঙ্গে অপ্রীতিকর সংঘর্ষ এড়াতে অস্তারলিজে তাকে নিয়ে যা করা হয়েছিল এবং রুশ অভিযানের একেবারে শুরুতে বার্কলেকে নিয়ে যা করা হয়েছিল সেই স্বাভাবিক পথটাই বেছে নেওয়া হল–ক্ষমতা সরিয়ে দেওয়া হল স্বয়ং সম্রাটের হাতে, আর এইভাবেই বুড়ো লোকটিকে কিছু না জানিয়ে প্রধান সেনাপতির পায়ের নীচ থেকে মাটি কেটে সরিয়ে দেওয়া হল।
এই উদ্দেশ্য নিয়েই ধীরে ধীরে তার দলবলকে নতুন করে গড়া হল, আর আসল ক্ষমতা চলে গেল ম্রাটের হাতে। তোল, কনভনিৎসিন ও এর্মলভ নতুন নতুন পদ পেল। সকলেই ফিল্ড-মার্শালের চরম দুর্বলতা ও ভগ্নস্বাস্থ্যের কথা জোর গলায় বলে বেড়াতে লাগল।
