তাকে বুঝতে পারত না বলেই এই লোকগুলো ধরেই নিয়েছিল যে বুড়োটার সঙ্গে কথা বলা বৃথা, তাদের পরিকল্পনার গভীরতা সে কখনো পরিমাপ করতে পারবে না, সবসময় সেই একই পুরনো কথা বলবে-বলবে সোনালি সেতুর কথা, বলবে যে এইসব ছিন্নবাস বিপর্যস্ত সৈন্যদের নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করা অসম্ভব, ইত্যাদি। এসব কথা তারা অনেক শুনেছে। তাছাড়া, তার সব কথাই এত সহজ ও সরল, আর তাদের প্রস্তাবগুলি এতই জটিল ও কুশলী যে এটা একান্ত স্পষ্ট যে সে লোকটি বুড়ো ও নির্বোধ, আর তারা ক্ষমতাসীন হলেও প্রতিভাবান।
খ্যাতিমান নৌ-সেনাধ্যক্ষ ও পিটার্সবুর্গের মহানায়ক উইগেনস্তিন যখন সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিল তখনই জেনারেলদের এই মনোভাব ও কথাবার্তা একেবারে তুঙ্গে উঠল। কুতুজভ সবই জানল, বুঝল, কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁধে ঝাঁকুনি দিল। শুধু একবার, বেরিজিনার ব্যাপারে পরে, সে রাগে ফেটে পড়ল এবং বেনিংসেনকে (সে আলাদাভাবে ম্রাটের কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল) নিম্নবর্ণিত চিঠি লিখল : আপনার নষ্ট স্বাস্থ্যের কারণে ইয়োর এক্সেলেন্সি যেন এই চিঠি পেয়েই দয়া করে কালুগা যাত্রা করেন এবং ইম্পিরিয়াল ম্যাজেস্ট্রির কাছ থেকে আরো নির্দেশ ও কর্ম-নিযুক্তির জন্য সেখানেই অপেক্ষা করে থাকেন।
কিন্তু বেনিংসেনের যাত্রার পরে গ্র্যান্ড ডিউক জারেভিচ কনস্তান্তিন পাভলভিচ সেনাদলের সঙ্গে যোগ দিল। এই অভিযানের গোড়ায় সে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু পরে কুতুজভ তাকে সরিয়ে দিয়েছিল। এবার সেনাদলে এসেই কুতুজভকে জানিয়ে দিল, আমাদের বাহিনীর যৎসামান্য সাফল্য ও অগ্রগতির মন্থরতার দরুন সম্রাট তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই সম্রাট নিজে সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হবে।
কি রাজদরবারে কি সমরক্ষেত্রে সমান অভিজ্ঞ এই বৃদ্ধ মানুষটি-সেই কুতুজভ যে গত অগস্ট মাসে সম্রাটের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হয়েছিল এবং গ্র্যান্ড ডিউক ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারীকে সরিয়ে দিয়েছিল-যে নিজের ক্ষমতায় এবং সম্রাটের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মস্কো পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, এবার সে সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল যে তার দিন শেষ হয়ে এসেছে, তার যা করার তা করা হয়েছে। আর যে ক্ষমতায় সে এখন অধিষ্ঠিত আছে বলে মনে করে সেটা আর তার নেই। আর শুধু যে রাজদরবারের মনোভাব থেকেই সে এটা বুঝতে পারল তাও নয়। সে বুঝল, যে সামরিক কর্মক্ষেত্রে তার ভূমিকা সে পালন করেছে সেখানকার কাজ শেষ, হয়েছে, আর তার উদ্দেশ্যই সিদ্ধ হয়েছে। আর সেইসঙ্গে বার্ধক্যজীর্ণ শরীরের ক্লান্তি এবং দৈহিক বিশ্রামের প্রয়োজন সম্পর্কেও সে সচেতন হয়ে উঠল।
২৯শে নভেম্বর কুতুজভ ভিলনা প্রবেশ করল–যাকে সে বলত আদরের ভিলনা। দুবার সে ভিলনার শাসনকর্তা হয়েছে। সমৃদ্ধ শহরটার কোনো ক্ষতি হয়নি, সেখানে সে পেল পুরনো বন্ধুবান্ধব ও পরিচিত জনের সান্নিধ্য, পেল জীবনের সেই আরাম যা থেকে দীর্ঘকাল সে বঞ্চিত ছিল। আর হঠাৎই সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের চিন্তা-ভাবনা থেকে সরে গিয়ে সেই শান্ত জীবনের মধ্যে সে ডুব দিল যাতে সে চিরদিন অভ্যস্ত, মনে হল, ইতিহাসের ক্ষেত্রে যা কিছু ঘটছে এবং এখনো করণীয় আছে, তাকে নিয়ে তার কোনোরকম চিন্তা-ভাবনাই নেই।
যে দুর্গ-প্রাসাদে কুতুজভ এসে উঠেছে সেখানে সর্বপ্রথম তার সঙ্গে এসে দেখা করল চিচাগভ। নৌ বিভাগের সাধারণ ইউনিফর্মের সঙ্গে একটা ছোরা ঝুলিয়ে এবং টুপিটাকে বগলদাবা করে সে দুর্গের বিবরণ ও শহরের চাবিগুলো কুতুজভের হাতে তুলে দিল। কুতুজভের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ আনা হয়েছে তার খবর চিচাগভ জানত। তাই তার ব্যবহারে একটি বাহাত্তরে বুড়োর প্রতি এক অল্পবয়সীর তাচ্ছিল্যপূর্ণ অথচ শ্রদ্ধাশীল ব্যবহারই অতিমাত্রায় প্রকাশ পেল।
কথাপ্রসঙ্গে কুতুজভ বলল, চীনামাটির বাসনপত্রে বোঝাই যে গাড়িগুলি বরিসভে তার কাছ থেকে আটক করা হয়েছিল সেগুলি উদ্ধার করা হয়েছে এবং তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তাতে চিচাগভ জবাব দিল, আপনি কি বলতে চান যে আমার খাবার থালাটাও নেই…বরং আপনি যদি কোনো ডিনার-পার্টি দিতে চান তো আমি প্রয়োজনীয় সবকিছু সরবরাহ করতে পারি।
কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে কুতুজভ তার সূক্ষ্ম, অন্তর্ভেদী হাসির সঙ্গে বলল, আমি যা বলেছি শুধু সেইটুকুই বলতে চেয়েছিলাম।
সম্রাটের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কুতুজভ সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশকে ভিলনাতেই আটকে রাখল। আশপাশের লোকরা বলেছে, সেই শহরে অবস্থানকালে সে অস্বাভাবিক রকমের শ্লথগতি এবং শারীরিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সামরিক ব্যাপারে সে উপস্থিত হত অনিচ্ছাসত্ত্বে, সবকিছু জেনারেলদের উপর ছেড়ে দিল, এবং সম্রাটের আগমনের অপেক্ষায় অযথা আমোদ-প্রমোদে কাল কাটাতে লাগল।
৭ই ডিসেম্বর পিটার্সবুর্গ ছেড়ে সম্রাট তার দলবল-কাউন্ট তলস্তয়, প্রিন্স বলকনস্কি, আরাকচিভ ও অন্যান্যদের নিয়ে ১১ তারিখে ভিলনা পৌঁছে স্লেজ নিয়ে সোজা গিয়ে উঠল দুর্গ-প্রাসাদে। প্রচণ্ড তুষারপাত সত্ত্বেও শত শত জেনারেল ও রাজকীয় কর্মচারী পূর্ণ প্যারেড-ইউনিফর্মে সজ্জিত হয়ে দুর্গের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল, আর সেমেনভ রেজিমেন্টের একটা গার্ড-অব-অনারের ব্যবস্থা করা হল।
