বাঃ, বেশ তো চলছে। আচ্ছা, এবার তুমি গাও জালেতায়েভ।
জালেতায়েভ অনেক কষ্টে ঠোঁট চেটে চেটে কথাগুলি উচ্চারণ করল।
খাসা হয়েছে। ঠিক ফরাসি বাবাজীর মতোই! হো, হো, হো! তুমি আর কিছু খাবে কি?
ওকে আরো খানিকটা পরিজ দাও। অনাহারের পরে পেটটা ভরাতে অনেক সময় লাগে।
আরো খানিকটা পরিজ দেওয়া হল। মোরেল হাসতে হাসতে তৃতীয় পাত্রে হাত দিল। তাকে দেখে অল্পবয়সী সৈনিকরা সকলেই খুশি। কিন্তু এই সব বাজে হৈ-চৈ মর্যাদাহানিকর বিবেচনা করে বুড়ো সৈনিকরা আগুনের অপর দিকটাতে চুপচাপ শুয়ে রইল। অবশ্য কেউ কেউ মাঝে মাঝে কনুইতে ভর দিয়ে মোরেলকে দেখে মুচকি মুচকি হাসতে কসুর করল না।
কোট দিয়ে শরীরটা ঢাকতে ঢাকতে একজন বলল, ওরাও তো মানুষ! তেতো সোমরাজ গাছও তো তার শিকড়েই জন্মায়।
হে প্রভু! হে প্রভু! আকাশে কত তারা! ভয়ংকর! তার মানে, প্রচণ্ড তুষারপাত…
সকলে চুপ করে গেল।
তাদের কেউ দেখছে না জানতে পেরে তারারাও যেন কালো আকাশের বুকে কেলি শুরু করে দিল : এই জ্বলছে, এই নিভছে, এই কাঁপছে, যেন পরস্পরের কানে কানে কোন রহস্যময় খুশির কথা বলছে।
.
অধ্যায়-১০
গাণিতিক হ্রাস-বৃদ্ধির একটা সমান হারে ফরাসি সৈন্যদের সংখ্যা হ্রাস পেতে লাগল। যে বেরিজিনা অতিক্রম সম্পর্কে এত কথা লেখা হয়েছে সেটা এই অভিযানের চূড়ান্ত পর্যায় মোটেই নয়, ফরাসি বাহিনীর ধ্বংসের একটা মধ্যবর্তী পর্যায় মাত্র। বেরিজিনা সম্পর্কে যে এত কথা লেখা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে তার কারণ-ফরাসিদের দিক থেকে দেখতে গেলে, তাদের বাহিনী যেসব বিপদ-আপদ অনেকদিন ধরেই সয়ে আসছিল হঠাৎ ঐ নদীর উপরকার সেতুর মুখে সেটা একটি মুহূর্তে কেন্দ্রীভূত হয়ে এমন একটা শোচনীয় দৃশ্যের সৃষ্টি করেছিল যা প্রত্যেকের স্মৃতিতে স্পষ্ট হয়ে আছে, আর রুশদের দিক থেকে দেখতে গেলে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে পিটার্সবুর্গে তখন একটা নতুন পরিকল্পনা (আবারও সেটা পফুয়েলেরই সৃষ্টি) রচনা করা হয়েছিল যাতে বেরিজিনা নদীতে একটা সমর-কৌশলের ফাঁদ পেতে নেপোলিয়নকে ধরা যায়। প্রত্যেকেই নিশ্চিত ছিল যে সবকিছুই পরিকল্পনামাফিক ঘটবে, আর তাই তারা বারবার বলেছে যে বেরিজিনার মুখেই ফরাসি বাহিনীকে ধ্বংস করা হয়েছে। বস্তুত, সংখ্যাতত্ত্ব থেকে এটাই দেখা যায় যে বিনষ্ট কামান ও সৈন্যের বিচারে বেরিজিনার ফরাসিদের ক্ষয়-ক্ষতি ক্রাসনুর তুলনায় অনেক কমই হয়েছিল।
বেরিজিনা সেতু-মুখের একমাত্র গুরুত্ব হল, সেখানেই সন্দেহাতীতভাবে পরিষ্কার প্রমাণ হয়ে গেল যে ফরাসিদের পশ্চাদপসরণের পথকে বিচ্ছিন্ন করে দেবার সবগুলি পরিকল্পনাই ছিল ভ্রান্ত, আর কুতুজভ ও সাধারণ সৈনিকরা যে কর্মপন্থা গ্রহণ করতে চেয়েছিল অর্থাৎ শত্রুপক্ষকে বাধা না দিয়ে কেবল অনুসরণ করে চলা–সেটাই ছিল একমাত্র সঠিক পথ। ফরাসিরা তখন দলে দলে পালাচ্ছিল ক্রমাগত গতিবেগ বাড়িয়ে, তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল লক্ষ্যস্থলে পৌঁছবার চেষ্টায়। তারা পালাচ্ছিল আহত জন্তুর মতো, তাই তাদের পথে বাধা দেওয়া ছিল অসম্ভব। সেতুটা যখন ভেঙে পড়ল তখন নিরস্ত্র সৈনিক, মস্কোর অধিবাসী, এবং নারী ও শিশু সকলেই নৌকোর দিকে ধেয়ে গেল, ছুটে গেল বরফ-ঢাকা জলের দিকে, কিন্তু আত্মসমর্পণ করল না।
এই আবেগ খুবই যুক্তিপূর্ণ। পলাতক এবং পশ্চাদ্ধাবনকারী দুয়েরই অবস্থা তখন সমান খারাপ। যতক্ষণ তারা নিজেদের লোকের মধ্যে ছিল ততক্ষণ প্রত্যেক পক্ষই নিজের লোকদের কাছ থেকে সাহায্য পাবার আশায় ছিল। কিন্তু যারা আত্মসমর্পণ করল তারা অপর পক্ষের মতো একই শোচনীয় অবস্থায় পড়লেও জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সমান অংশীদার হতে পারে না। বিজয়ী পক্ষের শুভবুদ্ধি সত্ত্বেও অর্ধেক ফরাসি বন্দি যে শীতে ও ক্ষুধায় মারা গিয়েছিল একথা ফরাসিদের জানাবার কোন প্রয়োজন ছিল না, কারণ তারা জানত যে এর অন্যথা হতে পারে না। যেসব দয়ালু রুশ কম্যান্ডার ফরাসিদের প্রতি সদয় ছিল–এমন কি রুশ সেনাদলভুক্ত ফরাসিরাও-বন্দিদের জন্য কিছুই করতে পারেনি। যে পরিস্থিতিতে রুশ বাহিনী পড়েছিল সেই একই পরিস্থিতিতে ফরাসি বাহিনী ধ্বংস হয়ে গেল। আমাদের ক্ষুর্ধাত সৈনিকদের কাছ থেকে রুটি ও কাপড় ছিনিয়ে নিয়ে তা ফরাসিদের দেওয়া একান্তই অসম্ভব ছিল। ফরাসিরা ক্ষতির কারণ না হতে পারে, ঘৃণার বস্তু না হতে পারে, অপরাধীও না হতে পারে, কিন্তু তাদের কোন প্রয়োজন তো ছিল না। কিছু রুশ হয় তো তাও করেছিল, কিন্তু তারা বিরল ব্যতিক্রম।
ফরাসিদের পশ্চাতে নিশ্চিত ধ্বংস, কিন্তু সম্মুখে আশা। তাদের জাহাজগুলি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সমবেত পলায়ন ছাড়া মুক্তির অন্য কোনো পথ ছিল না, আর ফরাসিদের সব শক্তি সেইপথেই কেন্দ্রীভূত হল।
তারা যত পালাতে লাগল ততই তাদের অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে উঠল, বিশেষ করে বেরিজিনার পরে, কারণ পিটার্সবুর্গ পরিকল্পনার ফলে সেখানে রুশদের মনে নতুন আশা জেগেছিল। পিটার্সবুর্গ-বেরিজিনা পরিকল্পনা যদি বিফল হয় তো কুতুজভের জন্যই হবে, এই আশংকায় রুশ কম্যান্ডারদের অসন্তোষ, ঘৃণা ও পরিহাসের ভাষা ক্রমেই কঠোরতর হতে লাগল। পরিহাস ও ঘৃণাকে অবশ্য প্রকাশ করা হত সশ্রদ্ধ ভাষায়, কাজেই তার দোষটা যে কোথায় সে প্রশ্নও কুতুজভের পক্ষে ভোলা সম্ভব ছিল না। সামনাসামনি সকলেই সৌজন্যের মুখোশ পরে থাকত, কিন্তু পিছন থেকে তাকে দেখে চোখ টিপত, আর পদে পদে তাকে ভুল পথে নিতে চেষ্টা করত।
