তোমাকে দেখেই বুঝেছি তুমি একটি পাক্কা মিথ্যাবাদী!
মিথ্যাবাদী, বটে! এটাই আসল সত্য।
সে যদি আমার হাতে পড়ত, তাহলে ধরামাত্রই একটা আস্পেন গাছের বর্শা দিয়ে তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলতাম। সে যে কত মানুষের সর্বনাশ করেছে!
বুড়ো সৈনিকটি হাই তুলে বলল, ওসব কথা এখন থামাও। সে আর এখানে আসছে না।
আলোচনায় ভাটা পড়ল, সৈন্যরা ঘুমের আয়োজন করতে লাগল।
একজন সবিস্ময়ে আকাশের ছায়াপথের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, তারাগুলোর দিকে তাকাও। কী রকম অদ্ভুত কিরণ দিচ্ছে। মনে হবে বুঝিবা নারীরা তাদের কাপড় বিছিয়ে দিয়েছে।
ওটা আসছে বছর ভালো ফসলের লক্ষণ।
আরো কিছু কাঠ দরকার!
পিঠ গরম করি তো পেট ঠাণ্ডায় জমে যায়। আশ্চর্য ব্যাপার।
হা প্রভু!
ঠেলছ কেন? আগুনটা কি তোমার একার জন্য? দেখ, ও কেমন হাত-পা ছড়িয়ে শুয়েছে!
সব চুপ হয়ে গেল। যারা ঘুমিয়ে পড়েছে তাদের নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। অন্যরা পাশ ফিরে শরীর গরম করতে করতে দু-একটা কথা বলছে। একশো পা দূরের একটা শিবির-আগুনের পাশ থেকে হাসির হররা ভেসে এল।
একজন বলে উঠল, পঞ্চম কোম্পানির গর্জনটা শোন! ওখানে অনেকে জমেছে!
একজন উঠে পঞ্চম কোম্পানিতে চলে গেল।
ফিরে এসে বলল, ওরা খুব ফুর্তি করছে। দুটি ফরাসি বাবাজী এসে হাজির হয়েছে। একজন একেবারে জমে গেছে, আর অপরজন রাজা-উজির মারছে। ব্যাটা গান গাইছে…
আরে, তাহলে আমিও গিয়ে দেখে আসি।
বেশ কয়েকজন পঞ্চম কোম্পানির কাছে চলে গেল।
.
অধ্যায়-৯
পঞ্চম কোম্পানি বনের একেবারে প্রান্তে একটা গুপ্ত ডেরায় তখন বিশ্রাম করছে। বরফের মাঝখানে একটা বড় শিবির-আগুন উজ্জ্বল আভায় জ্বলছে, তার আলো, শুভ্র হিমানীকণায় ঢাকা গাছের ডালপালাগুলি আলোকিত হয়ে উঠেছে।
মাঝরাতে বনের ভিতর বরফের উপর তারা পায়ের শব্দ ও শুকনো ডালপালার মচমচ শব্দ শুনতে পেল।
একজন বলল, ভালুক আসছে হে।
সকলে কান খাড়া করল। আগুনের উজ্জ্বল আলোয় বন থেকে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে বেরিয়ে এল অদ্ভুত সাজে সজ্জিত দুটি মনুষ্যমূর্তি।
দুজন ফরাসি, তারা বনের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। কর্কশ গলায় নিজেদের ভাষায় কি যেন বলতে বলতে তারা আগুনের কাছে এগিয়ে এল। আমাদের সৈন্যরা তাদের কথা কিছুই বুঝতে পারল না। একজন অপরজনের চাইতে লম্বা, তার মাথায় অফিসারের টুপি, দেখে খুবই ক্লান্ত মনে হল। আগুনের কাছে এসে বসতে গিয়ে সে পড়ে গেল। অপরজন অনেক বেশি শক্ত-সমর্থ। মাথায় একটা শাল বাঁধা। সঙ্গীকে তুলে ধরে তার মুখটা দেখিয়ে কি যেন বলল। সৈন্যরা তাদের ঘিরে দাঁড়াল, রুগ্ন লোকটির জন্য একটা গ্রেটকোট পেতে দিল, আর দুজনের মতো পরিজ ও ভদকা এনে দিল।
ক্লান্ত লোকটি ফরাসি অফিসার রাম্বল, আর মাথায় শাল ঢাকা লোকটি তার আর্দালি মোরেল।
পরিজের পাত্রটা শেষ করে খানিকটা ভদকা পেটে ঢেলে মোরেলের মেজাজ হঠাৎ অস্বাভাবিক রকমের খুশি হয়ে উঠল, সৈন্যদের সঙ্গে অবিরাম বকবক করতে লাগল, অবশ্য সৈন্যরা তার কথা কিছুই বুঝতে পারল না। রাম্বল কিছু খেল না, কনুইয়ের উপর মাথাটা রেখে আগুনের পাশে চুপচাপ শুয়ে থেকে রক্তিম শূন্য দৃষ্টি মেলে রুশ সৈনিকদের দিকে তাকিয়ে রইল। মাঝে মাঝে একটা টানা আর্তনাদ করে আবার চুপ করে থাকছে। তার কাঁধের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে মোরেল সৈনিকদের বোঝাতে চেষ্টা করল যে সে একজন অফিসার, তাকে একটু গরমে রাখা দরকার। সেখানে উপস্থিত জনৈক রুশ অফিসার তার কর্নেলের কাছে লোক পাঠিয়ে জানতে চাইল, ফরাসি অফিসারটিকে তার ঘরে নিয়ে গিয়ে একটু গরমে রাখা চলবে কি না। লোকটি এসে জানাল, কর্নেল লোকটিকে তার কাছেই পাঠিয়ে দিতে বলেছে, তখন রাম্বলকে যেতে বলা হল। সে উঠে হাঁটতে চেষ্টা করতেই তার পা টলতে লাগল। পাশের সৈনিকটি ধরে না ফেললে সে পড়েই যেত।
একটি সৈনিক চোখ টিপে রাম্বলকে ঠাট্টা করে বলল, একাজ আর কখনো করবেন না, কি বলেন?
আরে বোকা কোথাকার! কি বাজে বকছ, চাষা তো, একেবারে চাষা! চারদিকে থেকে সকলে তাকে বকতে লাগল, আহা, ভালো মানুষের দল, আমার দয়ালু, বড় দয়ালু বন্ধুরা! এরাই তো মানুষ! আমার সাহসী, দয়ালু বন্ধুরা! ছোট শিশুর মতো সে একজন সৈনিকের কাঁধে মাথাটা রাখল।
এদিকে মোরেল তখন সৈন্যপরিবৃত হয়ে আগুনের পাশে সবচাইতে ভালো জায়গাটাতে বসে পড়েছে।
মোরেল বেশ শক্ত-সমর্থ, ফোলা চোখ দুটো থেকে জল পড়ছে, তার পরনে একটা মেয়েদের জোব্বা, মাথায় টুপির উপরে মেয়েদের মতো করে একটা শাল জড়িয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে যে তার নেশা হয়েছে। পাশের সৈনিকটির গলাটা জড়িয়ে ধরে ভাঙা গলায় একটা ফরাসি গান ধরেছে।
মোরেল যে সৈনিকটিকে জড়িয়ে ধরেছে সে একজন গায়ক ও রসিক লোক। সে বলে উঠল, এবার-এবার আমাদের শিখিয়ে দাও! আমি ঠিক তুলে নেব। বল-বল।
চোখ মিটমিট করে মোরেল ফরাসিতে গেয়ে উঠল, সাহসী রাজা চতুর্থ হেনরি দীর্ঘজীবি হোন! সে শয়তানের আছে চারটি…
সুরটা ঠিক মতো ধরে নিয়ে সৈনিকটি হাত নেড়ে নেড়ে গানটার পুনরাবৃত্তি করল।
চারদিক থেকে হাসির হররা উঠল, সাবাস! হা, হা, হা!
মোরেলও মুখ কুঁচকে হেসে উঠল।
বেশ, বেশ, চালিয়ে যাও, চালিয়ে যাও!
তিন গুণের অধিকারী ত্রিনাথ আমার,
পানে দক্ষ, যুদ্ধে দড়,
সাহসেও বড় সড়…
