লাল-চুল লোকটি সার্জেন্টও নয়, কর্পোরালও নয়, কিন্তু গায়ে বেশ জোর আছে বলেই দুর্বলতর লোকগুলিকে দাপটের সঙ্গে হুকুম করছে। যাকে দাঁড়কাক বলা হল সেই শীর্ণ, ছোটখাট মানুষটি হুকুমমতো উঠে দাঁড়াতেই আগুনের আলোয় দেখা গেল একটি সুদর্শন তরুণ এক বোঝা কাঠ বয়ে এনেছে।
এখানে নিয়ে এস-খুব ভালো কাজ করেছ!
তারা কাঠ চিড়ল, সেগুলোকে আগুনে ফেলে দিয়ে ফুঁ দিতে লাগল, গ্রেটকোটের কোণ দিয়ে হাওয়া করতে লাগল, ফট ফট শব্দ করে হু-হুঁ করে জ্বলে উঠল। সকলে আরো ঘন হয়ে বসে পাইপ ধরাল। নবাগত সুদর্শন তরুণটি দুহাত বুকের উপর কোনাকুনি ভাজ করে দু-পা বরফের উপর ঠুকতে লাগল।
মাগো। শিশিরকণাগুলো ঠাণ্ডা কিন্তু পরিষ্কার। ভালোই হয়েছে যে আমি বন্দুকধারী… গান গাইতে গাইতে সে মাঝে মাঝেই হিক্কা তোলার ভান করে চলল।
তরুণটির বুটের তলা ঝুলে আছে দেখে লাল-চুল লোকটি চেঁচিয়ে উঠল, দেখহে, তোমার জুতোর তলা যে উড়ে যাবে! এত নাচছই বা কেন?
নর্তক থামল, ঝুলে-পড়া চামড়াটা খুলে নিয়ে আগুনের মধ্যে ফেলে দিল।
ঠিক বলেছেন বন্ধু, বলে তরুণটি বসে পড়ল। ঝোলার ভিতর থেকে একটুকরো নীল ফরাসি কাপড় বের করে পায়ের পাতাটা জড়িয়ে নিল। পা দুটো আগুনের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বলল, বাম্প ওগুলোর ক্ষতি করে।
শীঘ্রই আমাদের নতুন বুট দেওয়া হবে। ওঁরা বলছেন, এদের তুলোধোনা করাটা শেষ হলেই আমরা ডবল কিট পেয়ে যাব।
একজন সার্জেন্ট-মেজর বলল, মনে হচ্ছে কুকুরের বাচ্চা পেত্ৰভটা সকলের পিছনে পড়ে আছে।
অপরজন বলল, সারাক্ষণ আমি তার উপর নজর রেখেছি।
আচ্ছা, সৈনিক হিসেবে বেচারা বড়ই দুর্বল…।
কিন্তু সকলে বলছে, তৃতীয় কোম্পানির নয়জনকে কাল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঠিক, সবই ঠিক, কিন্তু কারো পা যদি জমে যায় তাহলে সে হাঁটবে কেমন করে?
একথা যে বলল তিরস্কারের ভঙ্গিতে তার দিকে ফিরে একটি বুড়ো সৈনিক বলল, তুমিও তাই করতে চাও না কি?
যে লোকটিকে দাঁড়কাক বলা হয়েছিল সে আগুনের ও-পাশে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, দেখুন, আপনি তো জানেন, মোটা লোক সরু হয়ে যায়, কিন্তু সরু লোকের কপালে জোটে মৃত্যু। তারপর সার্জেন্ট মেজরের দিকে ঘুরে দৃঢ়কণ্ঠে বলে উঠল, আমার কথাই ধরুন। ওদের বলুন, আমাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিক। আমার সারা শরীরে ব্যথা, আমি আর চলতে পারছি না।
সার্জেন্ট-মেজর শান্ত গলায় বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে।
সৈনিকটি আর কথা বলল না। গল্প-গুজব চলতে লাগল।
নতুন প্রসঙ্গের অবতারণা করে একজন বলল, আজ ফরাসি বাবাজীদের অনেককে ধরা হয়েছে। তাদের কারো পায়েই সত্যিকারের বুট বলতে কিছু নেই। সব যেন সৈনিকের ভূত।
নর্তক তরুণটি বলল, কসাকরা তাদের বুটগুলি হাতিয়েছে। কর্নেলদের জন্য ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে তাদের বাইরে বের করে দিয়েছে। তাদের দেখলে সত্যি করুণা হয়। তাদের যখন ফেলে দিল তখনো একজনকে জীবন্ত বলে মনে হল, তোমরা কি বিশ্বাস করবে, ওদের ভাষায় সে যেন বিড়বিড় করে কি বলল।
প্রথম লোকটি বলতে লাগল, কিন্তু ওরা খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, মনে হয় বেশ বড় ঘরের মানুষ। আহা, আপনি কি মনে করেন? ওদের সেনাদলে সব শ্রেণীর মানুষই আছে।
নর্তক তরুণটি বিচলিত হাসি হেসে বলল, কিন্তু আমাদের কথা ওরা কিছুই বোঝে না। আমি শুধিয়েছিলাম, সে কার প্রজা, তাতে নিজের ভাষায়ই বিড় বিড় করে কি যেন বলল। দুর্ভাগ্য আর কি!
প্রথম লোকটি বলতে লাগল, কিন্তু বন্ধুগণ, আশ্চর্যের কথা কি জান, মোঝায়েস্কের চাষীরা বলছে তারা যখন মৃতদেহগুলিকে রণক্ষেত্রে কবর দিচ্ছিল তখনো যে সব মৃতদেহ প্রায় একমাসকাল সেখানে পড়েছিল সেগুলি তখনো ছিল কাগজের মতো সাদা, পরিষ্কার, বারুদের ধোয়ার মতো কোন গন্ধও তা থেকে পাওয়া যায়নি।
সেটা কি ঠাণ্ডার জন্য? একজন শুধাল।
তুমি খুব বুদ্ধিমান! ঠাণ্ডার জন্যই বটে! আরে, তখন তো বেশ গরম। যদি ঠাণ্ডার জন্যই হবে তাহলে তো আমাদের মৃতদেহগুলোও পচত না। কিন্তু সেখানে গিয়ে আমাদের মৃতদেহগুলি দেখে এস, সব পচে গেছে, পোক পড়েছে। তাদের টেনে নিয়ে যাবার সময় আমরা তো মুখে রুমাল বেঁধে মাথা ঘুরিয়ে নেই : কাজটা করা খুবই শক্ত। কিন্তু ওদের মৃতদেহগুলি কাগজের মতো সাদা, বারুদের ধোয়ায় যেটুকু গন্ধ থাকে তাও নেই।
সকলে চুপ।
সার্জেন্ট-মেজর বলল, তাহলে নিশ্চয় তাদের খাদ্যের ফল। তারা তো সকলেই ভদ্রলোকদের খাবার খেত।
কেউ তার কথার প্রতিবাদ করল না।
মোঝায়েঙ্কের যুদ্ধক্ষেত্রের নিকটবর্তী চাষীরা বলছে, চারদিকের দশটা গাঁয়ের লোক ডেকে এনে বিশদিন ধরে গাড়ি বোঝাই করেও মৃতদেহগুলি সরিয়ে দেওয়া শেষ করা যায়নি, আর নেকড়ের কথা যদি বল…
জনৈক বুড়ো সৈনিক বলল, এটাই তো আসল যুদ্ধ। মনে করে রাখবার মতো একমাত্র যুদ্ধ। কিন্তু তারপর থেকে…লোকে শুধু যন্ত্রণাই ভোগ করছে।
আর তুমি কি জান বাবা, গত পরশু আমরা যেই তাদের দিকে ধেয়ে গেলাম, অমনি, বিশ্বাস কর, আমরা তাদের কাছে পৌঁছবার আগেই তারা বন্দুক ছুঁড়ে ফেলে নতজানু হয়ে বসে পড়ল। বলে উঠল, ক্ষমা কর! এটা তো মাত্র একটা ঘটনা। লোকে বলছে, প্লাতভ দু-দুবার স্বয়ং নেপোলিয়নকে ধরেছিল। কিন্তু তাকে ধরার সঠিক মন্ত্র তো তার জানা ছিল না। তাকে ধরছে, আবার ধরছে, কিন্তু কোন লাভ হচ্ছে না। সে হাতের মধ্যেই পাখি উড়ে যায়। তাকে মারবারও কোন পথ নেই।
