সকলে সমস্বরে বলে উঠল, এবার, এক সাথে, সবাই মিলে, হেইয়ো জোয়ান, মারো টান! ধপাস করে দেয়ালটা পড়ে গেল, সেইসঙ্গে জোয়ানরাও ছিটকে পড়ল। শুরু হয়ে গেল উচ্চ হাসি ও হল্লা।
এবার এক সাথে হাত লাগাও। দুজন-দুজন করে। একটু সবুর কর বাছারা…একটা গান ধর!
সকলে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। একটা মিষ্টি মোলায়েম গলায় গান শুরু হল। তৃতীয় কলিটা শেষ হতে শেষ সুরটা যখন মিলিয়ে গেল, অমনি বিশটা কণ্ঠস্বর একসঙ্গে গর্জন করে উঠল : উ-উ-উ-উ। এই তো চাই। এক সাথে। মারো টান, হেইয়ো জোয়ান। কিন্তু হাজার চেষ্টায়ও বেড়াটা নড়ল না। সকলেই চুপ। শুধু শোনা গেল বড় বড় নিঃশ্বাসের শব্দ।
এই যে ষষ্ঠ কোম্পানির বাছারা! আচ্ছা বদমাশ তো তোমরা! একটু হাত লাগাও না বাবা…আবার একদিন আমাদেরও তো ডাকতে হতে পারে।
ষষ্ঠ কোম্পানির জন বিশেক সৈন্য গ্রামের দিকে যাচ্ছিল। তারাও এসে হাত লাগাল। আর পঁয়ত্রিশ ফুট লম্বা ও সাত ফুট উঁচু বাঁশের বেড়াটা হেলেদুলে গ্রামের পথ দিয়ে চলতে চলতে শ্রান্ত লোকগুলোর কাঁধের উপর কেটে বসতে লাগল।
জোরসে ধরো…পড়ে যাচ্ছ নাকি? আরে, থামছ কেন? এই যে, ওদিকে… অর্থহীন খুশি-ভরা বকাবকি অবাধে চলতে লাগল।
হচ্ছে কি তোমাদের? সহসা জনৈক সার্জেন্ট-মেজরের কর্তৃত্বপূর্ণ গলা শোনা গেল। এখানে ভদ্রলোকরা রয়েছেন, স্বয়ং জেনারেল রয়েছেন কুটিরে, আর তোমরা যত সব মুখ-ফাজিল শয়তান আর জানোয়ারের দল! এটাই তোমাদের প্রাপ্য। চিৎকার করে কথাগুলি বলে প্রথম যাকে হাতের কাছে পেল তারই পিঠে লাগাল একটা মোক্ষম ঘুষি। চেঁচামেচিটা কম করতে পার না?
সকলে চুপ করল। বেড়ার উপর পড়ে গিয়ে আহত সৈনিকটির মুখে ছড়ে গিয়ে রক্ত পড়ছে, সে আর্তনাদ করে মুখ মুছতে লাগল।
সার্জেন্ট-মেজর চলে যেতেই সভয়ে সে ফিসফিস করে বলে উঠল, দেখ না, শয়তানটা কী মার মেরেছে! মুখটাকে রক্তাক্ত করে দিয়েছে।
কেমন লাগছে বল? কে যেন হাসতে হাসতে বলল। তারপর গলা নামিয়ে সকলে এগিয়ে চলল।
গ্রাম ছাড়িয়ে গিয়ে আবার তারা আগের মতোই জোর গলায় কথা বলতে লাগল, মাঝে মাঝেই তাতে চুটকি কথার ফোড়ন।
কুটিরের মধ্যে প্রধান অফিসাররা জড়ো হয়ে আজকের ঘটনাবলী ও আগামীকালের রণ-কৌশল নিয়ে আলোচনা করছে। প্রস্তাব করা হয়েছে, আগামীকাল বদিক ধরে এগিয়ে উপ-রাজাকে (মুরা) বিচ্ছিন্ন করে গ্রেপ্তার করা হবে।
সৈন্যরা যতক্ষণে বাঁশের বেড়াটাকে যথাস্থানে টেনে নিয়ে গেল ততক্ষণে চারদিকে শিবির-আগুনগুলো জ্বলে উঠে রান্নার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। কাঠ ফেটে শব্দ হচ্ছে, বরফ গলছে, সৈনিকদের কালো-কালো ছায়াগুলি ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কুড়ল ও কাটারিগুলো চারদিকে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সবকিছুই করা হয়েছে বিনা হুকুমে। রাতের মতো কাঠ আনা হয়েছে, অফিসারদের মাথা গুজবার ঠাই করে দেওয়া হয়েছে, কড়াইতে খাবার সিদ্ধ হচ্ছে, বন্দুক ও যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
উত্তরের দিক থেকে আত্মরক্ষার জন্য বাঁশের বেড়াটাকে এনে সেইদিকে দাঁড় করানো হয়েছে। তার সামনেও একটা শিবির-আগুন জ্বালানো হয়েছে। সকলে ঢাক বাজাল, নাম ডাকা হল, রাতের খাবার খেল, রাতের মতো আগুনের চারদিকে গোল হয়ে বসল-কেউ মোজা মেরামত করতে লাগল, কেউ বা পাইপ ধরাল, আবার কেউ বা পোশাক খুলে আগুনের তাতে শার্টের উকুন তাড়াতে বসে গেল।
.
অধ্যায়-৮
একথা মনে হতে পারে যে রুশসৈন্যরা সেসময় যে অবিশ্বাস্য রকমের শোচনীয় অবস্থার মধ্যে পড়েছিল–গরম জুতো ছিল না, ভেড়ার চামড়ার কোট ছিল না, মাথার উপরে ছাদ ছিল না, পায়ের নিচে ছিল আঠারো ডিগ্রির বরফ (১৮ ডিগ্রি=শূন্য ফারেনহিটের আট ডিগ্রি নিচে), এমন কি পুরো রেশনও ছিল না (কমিসারিয়েট বিভাগ সবসময় সেনাদলের সঙ্গে সমান তালে চলতে পারত না)-তাতে সে দৃশ্য খুবই করুণ ও কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু আসলে অত্যন্ত ভালো বাস্তব পরিবেশেও সেনাবাহিনী কখনো সেসময়কার চাইতে অধিক খুশি ও প্রাণচঞ্চল ছিল না। তার কারণ সৈন্যদের মধ্যে যারাই মন-মরা অথবা দুর্বল হয়ে পড়ল তাদেরই দিনের পর দিন সেনাদল থেকে ছাঁটাই করা হতে লাগল। দৈহিক ও মানসিক দিক থেকে দুর্বল সৈন্যদের পিছনে ফেলে আসা হল, আর দৈহিক ও মানসিক দিক থেকে যারা বাহিনীর প্রাণস্বরূপ তাদেরই শুধু রাখা হল।
অন্য সব জায়গার তুলনায় অষ্টম কোম্পানির বাঁশের বেড়াটার আড়ালেই সবচাইতে বেশি লোক জমায়েত হল। দুজন সার্জেন্ট-মেজরও তাদের দলে গিয়ে বসে পড়ল, তাদের শিবির-আগুনই সব চাইতে বেশি জ্বলজ্বল করে জ্বলতে লাগল। তাদের বেড়ার পাশে বসার অনুমতির জন্য চাঁদা হিসেবে তারা কাঠ দাবি করতে লাগল।
আরে মকিভ, তোমার হয়েছে কি কুকুরের বাচ্চা? তুমি কি শেষ হয়ে গেছ, না কি তোমাকে নেকড়েয় খেয়েছে। আরো কিছুটা কাঠ নিয়ে এস। লাল-চুল, লাল-মুখ একটি লোক চোখ ঘুরিয়ে চেঁচিয়ে বলল। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করলেও আগুনের কাছ থেকে না সরেই সে অপর একটি সৈনিককে বলল, আর তুমি ধোঁয়ায় চোখ জ্বল কিন্তু কাঠ নিয়ে এস। অনও নয়, কিন্তু গায়ে বেশ জোখ মানুষটি হুকুমমতো লোকগুলিতেই আগুনের খুব ভালো কাজ ফেলে দিয়ে আরো ঘন হতে লাগ
