প্রথমে সৈনিকদের এবং পরে অফিসারদের সম্বোধন করে বলল, তোমাদের সকলকে ধন্যবাদ। কঠোর ও বিশ্বস্ত কাজের জন্য তোমাদের সকলকেই ধন্যবাদ জানাই। জয় সম্পূর্ণ হয়েছে, রাশিয়া তোমাদের ভুলবে না! চিরদিন তোমরা সম্মানিত থাকবে!
কথা থামিয়ে সে আবার চারদিকে তাকাল।
একটি সৈনিক প্রিয়োব্রাঝেনস্ক পতাকার পাশে ফরাসি ঈগল-মার্কা একটা পতাকা ধরে ছিল। হঠাৎই তার হাতের ফরাসি ঈগলটাকে নিচু করে ফেলতেই কুতুজভ তাকে বলল, ওর মাথাটা নিচু কর, নিচু কর! নিচু, আরো নিচু, ঠিক আছে। হুররা বাছারা!
হুর-র-রা! হাজার কণ্ঠে উঠল গর্জন।
সৈন্যরা চিৎকার করতে লাগল। কুতুজভ ঘোড়ার পিঠে সামনে ঝুঁকে মাথাটা নিচু করল, তার চোখে একটা মৃদু, ব্যঙ্গের হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল।
চিৎকার থেমে গেলে আবার বলল, দেখ ভাইসব…সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের ভাব ও গলার স্বর বদলে গেল। এ যেন প্রধান সেনাপতি কথা বলছে না, কথা বলছে একটি সাধারণ বুড়ো মানুষ যে তার সহকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা শোনাতে চায়।
অফিসার ও সৈনিকদের মধ্যে একটা চঞ্চলতা দেখা দিল, তার কথা ভালোভাবে শুনবার জন্য সকলেই এগিয়ে গেল।
দেখ ভাইসব, আমি জানি এটা সহ্য করা তোমাদের পক্ষে শক্ত, কিন্তু কোন উপায় নেই! সহ্য কর, আর বেশি দিন নয়। অতিথিদের বিদায় করতে পারলেই আমরা বিশ্রাম নেব। তোমাদের সেবার কথা জার ভুলবেন না। তোমরা কষ্ট পাচ্ছ। তবু তো তোমরা দেশেই রয়েছ, আর ওরা-দেখতেই তো পাচ্ছ ওদের কি হাল হয়েছে, বন্দিদের দেখিয়ে সে বলল। আমাদের চাইতেও ভিক্ষুকের চাইতেও ওদের অবস্থা শোচনীয়। ওরা যখন শক্তিশালী ছিল, তখন আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি, কিন্তু এখন আমরা ওদের প্রতি করুণা দেখাতে পারি। ওরাও তো মানুষ। তাই নয় কি বাছারা?
চারদিকে তাকাল, তার উপর নিবদ্ধ সশ্রদ্ধ বিস্ময়-বিমুগ্ধ দৃষ্টির মধ্যে সে সমবেত সকলের সহানুভূতিরই আভাস পেল। তার মুখ ক্রমেই উজ্জ্বলতর হয়ে উঠল, সেখানে ফুটে উঠল একটি বৃদ্ধ মানুষের মৃদু হাসি, তার ঠোঁটের কোণ দুটি সংকুচিত হল, চোখের উপর ভাজ পড়ল। কথা থামিয়ে বুঝি বা বিচলিত হয়েই সে মাথাটা নোয়াল।
হঠাৎ মাথা তুলে সে চিৎকার করে বলল, কিন্তু কে ওদের এখানে আসতে বলেছিল? ঠিক শাস্তি হয়েছে, য-যত…
চাবুক ঘুরিয়ে সে জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল। সৈন্যরা আনন্দের সঙ্গে হুররা! বলে চেঁচিয়ে উঠল।
কুতুজভের কথাগুলি সৈনিকরা মোটেই বুঝতে পারেনি। ফিল্ড-মার্শালের কথাগুলি কেউ পুনরাবৃত্তি করতে পারবে না! তার ভাষণটি শুরু হয়েছিল গম্ভীরভাবে। কিন্তু তারপরই হয়ে উঠল একটি বুড়ো মানুষের সরল মনের কথা, কিন্তু সেই ভাষণের হৃদ্য আন্তরিকতা, জয়-গৌরবের সঙ্গে শত্রুর প্রতি করুণার মিশ্র অনুভূতি, এবং আমাদের আদর্শের ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে সচেতনতা–এ সবকিছু সৈনিকরা শুধু যে বুঝেছিল তাই নয়, প্রতিটি সৈনিকের অন্তরকে তা স্পর্শ করেছিল, তাদের দীর্ঘ সানন্দ উল্লাস-ধ্বনিতেই তা প্রকাশ পেল। পরে জনৈক জেনারেল যখন কুতুজভের কাছে জানতে চাইল যে তার কালিচে-গাড়িটা আনতে পাঠানো হবে কিনা তখন সে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে কুতুজভ অপ্রত্যাশিতভাবে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, গভীর আবেগে তার হৃদয় উদ্বেলিত হয়ে উঠল।
.
অধ্যায়-৭
ক্রাসনু যুদ্ধের সর্বশেষ দিন ৮ নভেম্বর সৈন্যরা যখন রাতের বিশ্রামঘাঁটিতে হাজির হল তখন গোধূলির অন্ধকার নেমে আসছে। সারাদিন আবহাওয়া শান্ত ছিল, মাঝে মাঝে সামান্য বরফও পড়েছে, কিন্তু সন্ধ্যার দিকে আবহাওয়া পরিষ্কার হতে লাগল। পড়ন্ত বরফের ভিতর দিয়ে লাল-কালো তারকাখচিত আকাশ দেখা দিল, তুষারপাত তীক্ষ্ণতর হল।
যে পদাতিক রেজিমেন্টটি তারুতিনো ছেড়েছিল তিন হাজার সৈন্য নিয়ে, এখন তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র নয়শো। সেই রেজিমেন্টটাই বড় রাস্তার ধারে একটি গ্রামের রাতের ঘাঁটিতে এসে প্রথম পৌঁছল। কোয়ার্টার-মাস্টাররা জানাল, রুগ্ন ও মৃত ফরাসি, অশ্বারোহী সৈন্য ও কর্মচারীতে সব কুটিরই ভর্তি হয়ে গেছে। শুধু রেজিমেন্ট-কম্যান্ডারের জন্য একটা ঘর পাওয়া যেতে পারে।
কম্যান্ডার ঘোড়া নিয়ে সেই ঘরটাতে গেল। বাকি রেজিমেন্ট গ্রামের ভিতর দিয়ে এগিয়ে শেষ কুটিরটার সামনে তাদের অস্ত্রশস্ত্র স্তূপ করে রাখল। বহু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমন্বিত একটা প্রকাণ্ড জন্তুর মতো রেজিমেন্ট তাদের বিছানা ও খাবার তৈরির কাজে লেগে গেল। একদল এক-হাঁটু বরফ ভেঙে গ্রামের দক্ষিণ দিকের বার্চের বনে ঢুকে গেল, সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে ভেসে আসতে লাগল কুড় ল ও তলোয়ারের শব্দ, ডাল ভাঙার শব্দ, নানারকম খুশির হল্লা। আর একদল হাঁড়ি-কড়াই ও যইয়ের বিস্কুট বের করল এবং ঘোড়াগুলোকে খাবার দিল। তৃতীয় দলটা, গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে অফিসারদের থাকার ব্যবস্থা করার কাজে লেগে গেল, ফরাসিদের মৃতদেহগুলি বয়ে নিয়ে দূরে ফেলে দিল, ঘরের বোর্ড, শুকনো কাঠ ও চালের খড় টেনে নিয়ে আগুন জ্বালাল, আর বাঁশের বেড়া দিয়ে নিজেদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে লাগল।
জন পনেরো লোক একটা চালাঘরের ছাদটা খুলে ফেলার পরে হৈ-হৈ করে তার উঁচু বাঁশের বেড়াটা ধরে টেনে নামাতে চেষ্টা করছিল।
