এই সময়াপহরক কুতুজভ যার নীতি ছিল ধৈর্য ও সময়, চূড়ান্ত যুদ্ধের এই শত্রুই কিন্তু অতুলনীয় গাম্ভীর্যের সঙ্গে সবরকম প্রস্তুতি নিয়ে বরদিনোতে যুদ্ধ করেছিল। এই কুতুজভ অস্তারলিজের যুদ্ধ শুরু হবার আগেই বলেছিল যে সে যুদ্ধে আমাদের হার হবে, অন্য সকলের মতের বিরুদ্ধে সেই বৃদ্ধ পর্যন্ত বলেছে যে বরদিনোতে আমাদের জয় হয়েছে, অথচ যুদ্ধে জয়লাভ করে কোন সেনাবাহিনী পশ্চাদপসরণ করেছে এ রকম ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। পশ্চাদপসরণের সময় একমাত্র সেই বারবার বলেছে যে তখন আর অকারণে কোন যুদ্ধ করা উচিত নয়, নতুন করে আর একটা যুদ্ধ শুরু করা অথবা রুশ সীমান্ত অতিক্রম করাও উচিত নয়।
কিন্তু সকলের অভিমতের বিরোধিতা করে সেই বৃদ্ধ মানুষটি একাকি কেমন করে তৎকালীন ঘটনাবলি সম্পর্কে জনমতের গুরুত্বটা এমনভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিল যাতে সারা কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটিবারের জন্যও তাকে তা থেকে সরে যেতে হয়নি?
তৎকালীন ঘটনাবলির তাৎপর্যকে প্রত্যক্ষ করবার এই অসাধারণ ক্ষমতার উৎস ছিল তার অন্তরের নিষ্কলুষ জাতীয়তাবোধ।
তার এই জাতীয়তাবোধের স্বীকৃতি হিসেবেই জনসাধারণ স্বয়ং জারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে-রাজানুগ্রহবঞ্চিত একটি বৃদ্ধকেই-এই জাতীয় যুদ্ধে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিল। আর এই জাতীয়তাবোধই তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল মানবিকতার সেই সর্বোচ্চ মঞ্চে যেখান থেকে প্রধান সেনাপতিরূপে সে তার সর্বশক্তি নিয়োেগ করেছিল মানুষকে হত্যা ও ধ্বংস করতে নয়, তাদের রক্ষা করতে, তাদের করুণা করতে।
ইওরোপিয় নায়কের–মানুষের তথাকথিত শাসনকর্তার যে নকল ছাঁচ ইতিহাস আবিষ্কার করেছে, তার মধ্যে ফেলে এই সরল, বিনয়ী ও প্রকৃত মহৎ মূর্তিটিকে ঢালাই করা যায়নি।
অনাগত ভৃত্যের দৃষ্টিতে কোন মানুষই মহৎ হতে পারে না, কারণ মহত্ত্ব সম্পর্কে তারও একটা নিজস্ব ধারণা থাকে।
.
অধ্যায়-৬
তথাকথিত ক্রাসনু যুদ্ধের প্রথম দিনটি ছিল ৫ নভেম্বর। সন্ধ্যার দিকে–জেনারেলদের মধ্যে অনেক বির্তক ও ভুলভ্রান্তির পরে, এবং পরস্পরবিরোধী হুকুম দিয়ে অ্যাডজুটান্টদের দিকে দিকে পাঠিয়ে দেবার পরে যখন একটা কথা পরিষ্কার বোঝা গেল যে শত্রুপক্ষ সর্বত্র পালাতে শুরু করেছে এবং আর কোন যুদ্ধ হবে না, তখন কুতুজভ ক্রাস ছেড়ে দোতে চলে গেল, তার প্রধান ঘাঁটি সেইদিনই সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছে।
পরিষ্কার দিন। তুষার ঝরছে। ছোট, মোটা সাদা ঘোড়ার পিঠে চেপে কুতুজভ দোত্ৰু চলেছে, পিছনে চলেছে অসন্তুষ্ট জেনারেলদের একটা বড় দল, তারা ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। পথের দুধারে আগাগোড়া সেদিনকার ফরাসি বন্দিরা (সংখ্যায় তারা সাত হাজার) দলে দলে শিবির-আগুনের পাশে ভিড় করে শরীর গরম করছে। দোক্রর কাছাকাছি এক জায়গায় ছিন্নবাস পরিহিত বন্দিদের একটা মস্ত বড় দল কলগুঞ্জনে ব্যস্ত, হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই দিয়ে শরীরটা ঢেকেছে, ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বেঁধেছে, রাস্তার উপর এক সারি ফরাসি কামানের পাশে তারা দাঁড়িয়ে আছে। প্রধান সেনাপতিকে দেখে তাদের কলগুঞ্জন থেমে গেল, সকলেরই চোখ পড়ল কুতুজভের উপর, তার মাথায় লাল পটি দেওয়া সাদা টুপি, আর একটা প্যাড-লাগানো ওভারকোট। সাদা ঘোড়ায় চেপে সে ধীরে ধীরে তাদের পার হয়ে গেল, কামানগুলো কোথায় দখল করা হয়েছে আর সৈনিকদের কোথায় বন্দি করা হয়েছে সেকথা বুঝিয়ে বলতে লাগল একজন জেনারেল।
কুতুজভ কি যেন ভাবছে, জেনারেলের কথাগুলি তার কানে গেল না। অসন্তোষভরা চোখ দুটি কুঁচকে সে একদৃষ্টিতে হতভাগা বন্দিদের দিকেই তাকিয়ে চলেছে। তুষারপাতের ফলে নাক ও গাল বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাদের প্রায় সকলকেই কিছুত দেখাচ্ছে, প্রায় সকলেরই চোখ লাল, ফোলাফোলা, পুঁজ জমেছে।
একদল ফরাসি রাস্তার খুব কাছে দাঁড়িয়েছিল। তাদের মধ্যে দুজন একটুকরো কাঁচা মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে, একজনের মুখে ঘা দগদগ করছে। তাদের দ্রুত সঞ্চালিতে দৃষ্টির মধ্যে কেমন একটা ভয়ংকর পশুর মতো ভাব ফুটে উঠেছে।
কুতুজভ অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে এই সৈন্য দুটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখে ভাঁজ পড়ল, চোখ কুঁচকে গেল, চিন্তিতভাবে মাথাটা দোলাতে লাগল। আর এক জায়গায় দেখল, একটি রুশ সৈনিক একজন ফরাসি কাঁধে হাত রেখে বন্ধুর মতো কি যেন বলছে। সেই একইরকম মুখের ভাব করে কুতুজভ আর একবার মাথাট দোলাতে লাগল।
ফরাসিদের কাছ থেকে দখল-করা কতকগুলি পতাকার দিকে প্রধান সেনাপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রিয়োব্রাঝেনস্ক রেজিমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে একজন জেনারেল সমানে কথা বলে যাচ্ছিল, তার দিকে ফিরে কুতুজভ শুধাল, আপনি কি বলছিলেন?…ওঃ, ঐ পতাকাগুলির কথা!
অন্যমনস্কভাবে কুতুজভ চারদিকে তাকাল। চারদিক থেকে হাজার হাজার চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে, তার মুখের একটা কথার জন্য অপেক্ষা করে আছে।
প্রিয়োব্রাঝেনস্ক রেজিমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে চোখ বুজল। পারিষদবর্গের একজন ইঙ্গিতে সৈন্যদের বলল, পতাকাগুলো হাতে দিয়ে তারা প্রধান সেনাপতিকে ঘিরে দাঁড়াক। কুতুজভ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল, তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও কর্তব্যের খাতিরে মাথাটা তুলে কথা বলতে শুরু করল। একদল অফিসার তাকে ঘিরে দাঁড়াল। বেশ মনোযোগ দিয়ে অফিসারদের সেই বৃত্তের দিকে সে তাকাল, তাদের কয়েকজনকে চিনতে পারল।
