রুশ মানসিকতা যেসব মহাপুরুষদের (Grands Hommes) স্বীকার করে না তাদের নয়, কিন্তু যেসব বিরল ও একক ব্যক্তি ঈশ্বরের ইচ্ছাকে উপলব্ধি করে তার কাছেই নিজের ইচ্ছাকে সঁপে দেয়, এই তাদের নিয়তি। উচ্চতর বিধানকে মেনে নেবার জন্য জনতার ঘৃণা ও বিদ্বেষ এইভাবেই তাদের দণ্ডিত করে।
বিচিত্র ও ভয়ংকর শোনালেও যে-নেপোলিয়ন ইতিহাসের হাতের একটি অতি নগন্য যন্ত্রমাত্র, যে কখনো কোথাও, এমনকি নির্বাসনকালেও, কোনোরকম মানিবক মর্যাদার স্বাক্ষর রাখতে পারেনি, সেই নেপোলিয়নই রুশ ইতিহাসকারদের কাছে স্তুতিবচন ও উৎসাহের বস্তু, সেই এক মহাপুরুষ। কিন্তু কুতুজ-সে মানুষটি একেবারে শুরু থেকে ১৮১২ সালে তার কাজের শেষপর্যন্ত, বরদিনো থেকে ভিলনা পর্যন্ত, একটিবারও কি কথায় আর কি কাজে কখনো, দোলাচলচিত্ত হয়নি, আত্মত্যাগ ও ভবিষ্যৎ-সচেতনতার এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যা ইতিহাসের ব্যতিক্রমস্বরূপ,-সেই কুতুজভ তাদের কাছে একটি অস্পষ্ট করুণার পাত্রবিশেষ, তার সম্পর্কে এবং ১৮১২ সাল সম্পর্কে কিছু বলতে গেলেই তারা কেমন যেন লজ্জা বোধ করে।
অথচ একটিমাত্র লক্ষ্যে স্থিরদৃষ্টি হয়ে কর্মের পথে এগিয়ে চলার এমন আর একটি ঐতিহাসিক চরিত্রের কল্পনা করাও তো শক্ত, আর সমগ্র জাতির ইচ্ছার অধিকতর উপযুক্ত বা তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আর একটি লক্ষ্যের কথা কল্পনা করাও তো সমান শক্ত। আবার, ১৮১২ সালে কুতুজভের সমগ্র কর্মপ্রচেষ্টা যে লক্ষ্য সাধনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছিল, অন্য কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির দ্বারা সেরূপ পরিপূর্ণভাবে লক্ষ্য পূর্ণ করবার আর একটি দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতা থেকে খুঁজে বের করা তো ততোধিক শক্ত।
কুতুজভ কখনো, পিরামিডের উপর থেকে নিচে তাকিয়ে চল্লিশ শতাব্দীর কথা বলেনি, বলেনি পিতৃভূমির জন্য তার ত্যাগের কথা, সে কি করতে চেয়েছিল বা করতে পেরেছিল তার কথা : সাধারণভাবে বলা যায়, সে কখনো নিজের কথা বলেনি, কোনো মুখোশ আঁটেনি মুখে, অতি সাধারণ মানুষের মতো অত্যন্ত সরলভাবে নিজেকে প্রকাশ করেছে, মুখেও বলেছে সরলতম সাধারণ কথা। চিঠি লিখেছে মেয়েদের কাছে আর মাদাম দ্য স্তাইলের কাছে, উপন্যাস পড়েছে, সুন্দরীদের সঙ্গ ভালোবেসেছে, জেনারেল, অফিসার ও সৈনিকদের সঙ্গে হাসি-তামাশা করেছে, এবং কেউ কিছু প্রমাণ করতে চাইলে কখনো তার প্রতিবাদ করেনি। ইয়াউজা সেতুর কাছে কাউন্ট রস্তপচিন যখন ঘোড়া ছুটিয়ে কুতুজভের কাছে এসে ব্যক্তিগতভাবে তাকে তিরস্কার করে বলেছিল : আপনি যে কথা দিয়েছিলেন বিনা যুদ্ধে মস্কো ছেড়ে যাবেন না তার কি হল? কুতুজভ তখন উত্তরে বলেছিল : বিনা যুদ্ধে আমি মস্কো ছেড়ে যাব না, যদিও তখন মস্কো পরিত্যক্ত হয়েই গেছে। সম্রাটের কাছ থেকে এসে আরাকচিভ যখন বলল যে এর্মলভকে গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধানের পদে নিযুক্ত করা উচিত তখন কুতুজভ জবাব দিল : ঠিক, এই কথাই আমি নিজেও ভাবছিলাম, যদিও একমুহূর্ত আগে এর উল্টো কথাই সে বলেছিল। একদল নির্বোধ জনতার মধ্যে যখন একমাত্র সেই বুঝেছে আসন্ন ঘটনাবলীর প্রচণ্ড তাৎপর্য, তখন মস্কোর সে মহাবিপদের জন্য রস্তপচিন তাকেই দায়ী করুক আর নিজেকেই দায়ী করুক তাতে কি আসে যায়? আর গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান হিসেবে কে নিযুক্ত হল না হল, তাতেও তো বিশেষ কিছুই আসে-যায় না।
নিজে কখন কি বলছে না বলছে সে খেয়াল না থাকলেও এই মানুষটি কিন্তু পুরো কর্মকাণ্ডের মধ্যে একবারও এমন একটি কথা উচ্চারণ করেনি যা সমগ্র যুদ্ধকালে তার একমাত্র লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যবিহীন। স্পষ্টই বোঝা যায়, সংকটময় পরিস্থিতিতে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও সে বারবার নিজের মনের কথাকেও প্রকাশ করেছে, যদিও সে জানত যে তাকে কেউ ঠিক ঠিক বুঝবে না। যে বরোদিনের যুদ্ধে অন্য সকলের সঙ্গে তার মত-পার্থক্যের সূচনা সেখান থেকে আরম্ভ করে একমাত্র সেই বলেছে যে বরদিনোর যুদ্ধে তাদের জয় হয়েছে, আর মুখের কথায়, চিঠিপত্রে ও প্রতিবেদনে মৃত্যুকাল পর্যন্ত সেই একই কথা সে বারবার বলেছে। একমাত্র সেই বলেছে, মস্কোকে হারানো মানেই রাশিয়াকে হারানো নয়। লরিস্তনের শান্তি-প্রস্তাবের উত্তরে সে বলেছে, কোনো রকম সন্ধি হতে পারে না, কারণ সেটাই জনগণের ইচ্ছা। ফরাসিদের পশ্চাদপসরণের সময় একমাত্র সেই বলেছে, আমাদের সব রণকৌশল বৃথা, আমাদের আশাতিরিক্ত ভালোভাবেই আপনা থেকেই সবকিছু ঘটে চলেছে, শত্রুকে একটা সোনালি সেতু অবশ্যই দিতে হবে, তারুতিনো, বা ভিয়াজমা, বা ক্রাসনুর যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন নেই, সীমান্তে পৌঁছবার জন্য কিছু সৈন্য আমাদের সঙ্গে রাখতেই হবে, এবং দশজন ফরাসির বনিময়েও একজন রুশকে বলি দিতে সে রাজি নয়।
আর এই সভাসদটি–এইভাবেই তাকে বর্ণনা করা হয়েছে-সম্রাটকে খুশি করার জন্য আরাকচিভের কাছে মিথ্যা বললেও সেই সম্রাটের বিরূপতাকে মেনে নিয়ে ভিলনায় বলেছে, সীমান্তের ওপারে যুদ্ধকে চালিয়ে নেওয়া অর্থহীন ও ক্ষতিকর।
একমাত্র সেই যে ঘটনাবলির তাৎপর্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছিল তার প্রমাণ শুধু তার মুখের কথাই নয়। তিলমাত্র ব্যতিক্রমবিহীনভাবে তার সব কাজই পরিচালিত হয়েছিল একটিমাত্র ত্রিবিধ লক্ষ্যের দিকে–(১) ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করা। (২) তাদের পরাজিত করা, এবং (৩) আমাদের জনগণ ও আমাদের সৈন্যদের দুঃখ-কষ্টকে যথাসম্ভব কম রেখে শত্রুকে রাশিয়া থেকে বিতারিত করা।
