আরে, প্রিয় বন্ধু; আমাদের স্বর্গীয় ত্রাণকর্তা ও তাঁর পরম পবিত্র জননী তাঁদের পবিত্র ও সর্বক্ষম যন্ত্র দিয়ে তোমাকে ঘিয়ে রাখুন!-মারি।
আরে, তুমি একটা চিঠি পাঠাচ্ছ প্রিন্সেস? আমার চিঠি আগেই পাঠিয়ে দিয়েছি। চিঠিটা মাকে লিখেছি, হাস্যময়ী মাদময়জেল বুরিয়ে দ্রুতলয়ে কথাগুলি বলে গেল। প্রিন্সেস মারির প্রচণ্ড শোক ও বিষণ্ণতা ভরা জগতে সে যেন নিয়ে এল একটা সম্পূর্ণ নতুন হাওয়া নিশ্চিন্ত, হাল্কা ও আত্মতুষ্ট।
গলা নামিয়ে সে আবার বলল, তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি প্রিন্সেস, প্রিন্স কিন্তু মাইকেল আইভানভিচকে বকছেন। তার মেজাজ কিন্তু খুব খারাপ। তৈরি থেকো।
প্রিন্সেস মারি বলল, দেখ বন্ধু, তোমাকে তো বলেছি আমার বাবার মেজাজ নিয়ে তুমি কখনো আমাকে সাবধান করে দেবে না। আমি নিজে কখনো তার বিচার করি না, আর অন্য কেউ করুক তাও চাই না।
প্রিন্সেস ঘড়ি দেখল; ক্ল্যাভিকর্ড নিয়ে অনুশীলন শুরু করতে পাঁচ মিনিট দেরি হয়ে গেছে দেখে ভয়ে ভয়ে সে বসবার ঘরে ঢুকল। বারোটা থেকে দুটো পর্যন্ত প্রিন্স বিশ্রাম নেয়, আর প্রিন্সেস ক্ল্যাভিকর্ড বাজায়।
*
অধ্যায়-২৬
বড় পড়ার ঘরটাতে প্রিন্স নাক ডাকাচ্ছিল। পাকা-চুল খানসামাটি বসে ঝিমুতে ঝিমুতে সেই নাসিকা-ধ্বনি শুনছিল। বাড়ির একেবারে অন্য প্রান্ত থেকে বন্ধ দরজার ভিতর দিয়ে ভেসে আসছে দুসেকের একটা গতের কতকগুলি শক্ত অংশের বার বার আবৃত্তির শব্দ।
ঠিক সেই সময় একখানা ঢাকা গাড়ি ও একখানা খোলা গাড়ি এসে উঠোনে ঢুকল। প্রিন্সে আন্দ্রু গাড়ি থেকে নেমে তার স্ত্রীকে নামতে সাহায্য করল এবং নিজের আগেই তাকে বাড়ির ভিতরে যাবার ব্যবস্থা করে দিল। বুড়ো তিখন মাথায় পরচুলা এঁটে দরজার ফাঁক দিয়ে মাথাটা বের করে ফিসফিস করে জানিয়ে দিল যে প্রিন্স তখনো ঘুমুচ্ছে; তারপরই তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করে দিল। তিখন জানে, ছেলেই আসুক আর কোনো অসাধারণ ঘটনাই ঘটুক, কিছুতেই নির্দিষ্ট দৈনন্দিন কর্মসূচীর কোনো বিঘ্ন ঘটানো চলবে না। তিখনের মতোই প্রিন্স আন্দ্রুও সে কথা জানে। তাই সে এখান থেকে চলে যাবার পরে তার বাবার অভ্যাসগুলোর কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা সেটা বুঝবার জন্য ঘড়িটা একবার দেখল; যখন বুঝল যে পরিবর্তন কিছু ঘটে নি তখন সে স্ত্রীর দিকে মুখ ফেরাল।
বলল, বাবা কুড়ি মিনিটের মধ্যেই উঠে পড়বেন। আমরা বরং মারির ঘরেই যাই।
ছোট প্রিন্সেস এতদিনে একটু শক্ত-পোক্ত হয়েছে; কিন্তু সে যখন আগেকার মতোই খুশি-খুশিভাবে কথা বলতে শুরু করল তখন তার চোখ দুটো আর হাসি-হাসি ঠোঁটটা উল্টো গেল।
চারদিক তাকিয়ে স্বামীকে বলল, আরে, এ যে রাজপ্রাসাদ গো! চল, তাড়াতাড়ি চল! চারদিকে দেখে নিয়ে সে একবার তিখনের দিকে, একবার স্বামীর দিকে, ও পরে পরিচারকের দিকে তাকিয়ে হাসল।
ঐ তো মারি বাজনা বাজাচ্ছে না? চল, চুপি চুপি গিয়ে ওকে অবাক করে দেই।
মুখে একটা ভদ্র অথচ বিষণ্ণ ভাব ফুটিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু তাকে অনুসরণ করল।
তিখন এগিয়ে এসে তার হাতে চুমো খেল। প্রিন্স বলল, তুমি অনেক বুড়ো হয়ে গেছ তিখন।
যে ঘর থেকে ক্ল্যাভিকর্ডের শব্দ আসছিল তারা সে ঘরে পৌঁছবার আগেই ফরাসি সুন্দরী মাদময়জেল বুরিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুটে এল।
চেঁচিয়ে বলল, প্রিন্সেসের কি আনন্দের দিন! শেষপর্যন্ত! ওকে এখনই খবর দিচ্ছি।
তাকে চুমো খেয়ে ঘোট প্রিন্সেস বলল, না, না, দয়া করে বলো না।…তুমি তো মাদময়জেল বুরিয়ে। তোমার সঙ্গে আমার ননদের বন্ধুত্বের সূত্রে তোমাকে আমি আগেই চিনেছি। আমরা আসব সে কি জানে না?
যে ঘর থেকে সোনাতার একই অংশ বারবার বাজাবার শব্দ আসছিল, সকলে সেই ঘরের দরজায় উপস্থিত হল। যেন অপ্রীতিকর কিছুর আশংকায় প্রিন্স আন্দ্রু মুখটা বেঁকিয়ে থেমে গেল।
ছোট প্রিন্সেস ঘরে ঢুকল। মাঝপথে বাজনা থেমে গেল, একটা আনন্দের চিৎকার শোনা গেল। তারপরই প্রিন্সেস মারির ভারী পায়ের শব্দ ও চুমো খাবার আওয়াজ। প্রিন্স আন্দ্রু ঘরে ঢুকল। তার বিয়ের সময় মাত্র অল্প দিনের জন্য এই দুই প্রিন্সেসের দেখা হয়েছিল! তবু এখন তারা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে যে যেখানে পারছে অনবরত চুমো খাচ্ছে। মাদময়জেল বুরিয়ে বুকের উপর হাত চেপে দাঁড়িয়ে আছে; মুখে অপার্থিব হাসি; দেখে মনে হয় যে কোনো সময়ে সে কেঁদে ফেলবে বা হেসে উঠবে। ভুল বাজনা শুনলে সঙ্গীত রসিকতা যেমন করে থাকে, প্রিন্স আন্দ্রুও সেই ভাবে ঘাড় ঝাঁকুনি দিয়ে ভুরু কুঁচকাল। প্রিন্সেসরা পরস্পরকে ছেড়ে দিল। তারপর বুঝি বা দেরি হয়ে গেছে এই আশংকায় দুজনই দুজনের হাত চেপে ধরে চুমো খেয়ে হাত ছেড়ে দিল; আবার পরক্ষণেই পরস্পরের মুখে চুমো খেয়ে প্রিন্স আন্দ্রুকে অবাক করে দিয়ে দুজনই কাঁদতে লাগল ও চুমো খেতে লাগল। মাদময়জেল বুরিয়েও কাঁদতে লাগল। প্রিন্স আন্দ্রু খুবই অস্বস্তি বোধ করল। কিন্তু প্রিন্সেস দুজনের কাছে এই কান্নাটাই একান্ত স্বাভাবিক বলে মনে হল; তাদের এই সাক্ষাতের সময় তাদের ব্যবহার যে অন্যরকম হতে পারে এটা তাদের মাথায়ই এল না।
আঃ! সোনা আমার! আঃ! মারি!… কথাগুলি বলতে বলতে তারা হো-হো করে হেসে উঠল। কাল রাতেই আমি স্বপ্ন দেখেছি…–তুমি কি আমাদের আশা কর নি?…–আঃ! মারি! তুমি শুকিয়ে গেছ!…–আর তুমি খুব মুটিয়েছ!…।
