পিটার্সবুর্গের কর্তৃপক্ষ এবং রুশ বাহিনীর জেনারেলরা সকলেই তখন চাইছিল ফরাসিদের পলায়ন। কুতুজভও ফরাসিদের পলায়নের পথে বিঘ্নসৃষ্টির চেষ্টা না করে তারুতিনো ও ভিয়াজমার মতোই এখানেও সেই একই লক্ষ্যে সাধ্যমতো সর্বশক্তি নিয়োগ করল এবং আমাদের বাহিনীর গতিকে যথাসম্ভব শ্লথ করে রাখল।
রুশ সৈন্যের মতো কুতুজভও মনে-প্রাণে বুঝল ও জানল-যুক্তি বা রণ-বিজ্ঞানের সাহায্যে নয়, সমগ্র রুশ সত্তা দিয়ে-যে ফরাসিরা পরাজিত হয়েছে, শত্রুরা পালাচ্ছে, তাদের তাড়িয়ে দিতেই হবে, কিন্তু সেইসঙ্গে বৎসরের এই সময়টাতে এরকম তুলনাবিহীন দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে চলার যে কত কষ্ট, কত দুঃখ সৈন্যদের মতোই সেটাও কুতুজভ ভালোই বুঝতে পারল।
কিন্তু যেসব জেনারেল–বিশেষ করে রুশ বাহিনীর বিদেশী জেনারেলরা–চাইল নিজেদের জন্য খ্যাতি অর্জন করতে, কাউকে তাক লাগিয়ে দিতে, এবং কোনো না কোনো কারণে রাজা ও ডিউককে গ্রেপ্তার করতে, তারা ভাবল যে যুদ্ধ করে বিজয়ী হবার এই তো সময়। তাই তারা যখন ছেঁড়া জুতো ও ছেঁড়া পোশাক পরা অর্ধভুক্ত সৈন্য নিয়েই একের পর এক যুদ্ধের প্রকল্প উপস্থিত করতে লাগল, কুতুজভ তখন শুধু বারবার দুকাঁধে ঝাঁকুনি দিতে লাগল।
রুশ বাহিনী যেখানেই ফরাসি বাহিনীর একেবারে ঘাড়ের উপর গিয়ে পড়ল, এইভাবে নিজেদের বিশিষ্ট করে তুলবার, রণ-কৌশল প্রয়োগ করবার, শত্রুকে পরাজিত ও তচনচ করে দেবার বাসনা সেখানেই বিশেষ করে প্রকট হতে লাগল।
সেটাই ঘটল ক্রাসনুতে, তারা আশা করেছিল তিনটি ফরাসি সেনাদলের একটির সঙ্গে সেখানেই তাদের মোলাকাত হবে, কিন্তু তার বদলে সেখানে তারা হাজির হল ষোলো হাজার সৈন্যসহ স্বয়ং নেপোলিয়নের মুখোমুখি। সেখানে একটি বিধ্বংসী সংঘর্ষকে পরিহার করে নিজের সৈন্যদের অক্ষত রাখতে কুতুজভের সর্বপ্রকার চেষ্টা সত্ত্বেও পথশ্রমে ক্লান্ত রুশদের হাতে বিশৃখল ফরাসি সৈন্যদের নিধনযজ্ঞ তিনদিন ধরে চলল ক্রাসনুর পথে-প্রান্তরে।
তোল একটা নির্দেশনামা লিখেছিল : প্রথম সেনাদল অমুক অমুক দিকে এগিয়ে যাবে ইত্যাদি। কিন্তু যথারীতি সে নির্দেশনামা মোতাবেক কিছুই ঘটল না। উতেমবের্গের প্রিন্স ইউজেন একটা পাহাড়ের উপর থেকে পলায়মান ফরাসিদের উপর গোলাবর্ষণ করতে লাগল। আরো সৈন্য সে চেয়ে পাঠাল, কিন্তু কেউ এল না। ফরাসিরা রুশদের দৃষ্টি এড়িয়ে পালাতে লাগল, রাতের আঁধারে জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে যথাসাধ্য ছুটতে লাগল।
মিলরাদভিচ তো নিজেই নিজেকে ভয় ও নিন্দার অতীত এক নাইট।ফরাসিদের সঙ্গে আলোচনা চালানো ছিল তার প্রিয় কাজ। ফরাসিদের কাছে দূত পাঠিয়ে সে তাদের আত্মসমর্পণ দাবি করল, অনেক সময় নষ্ট করল, কিন্তু তাকে যা করতে বলা হয়েছিল তার কিছুই করল না।
ঘোড়ায় চেপে অশ্বারোহী বাহিনীর সামনে হাজির হয়ে ফরাসিদের দেখিয়ে সে বলল, দেখ বাছারা, ওই সেনাদলটা তোমাদের দিয়ে দিলাম।
অশ্বারোহী সৈন্যরা তখন ঘোড়র পেটে কাঁটা মেরে তরবারি উঁচিয়ে অনেক কষ্টে সেই সেনাদলের সামনে, অর্থাৎ ঠাণ্ডায় জমে-যাওয়া তুষারপাতে আহত ও অভুক্ত একদল ফরাসির সামনে গিয়ে হাজির হল, তারাও সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করল, তারা তো অনেক আগে থেকে এইজন্যে অপেক্ষা করেই ছিল।
ক্রাসনুতে তারা ছাব্বিশ হাজার ফরাসিকে বন্দি করল, কয়েকশো কামান দখল করল, আর পেল মার্শালের দণ্ড নামক একটা লাঠি, কার কতখানি কৃতিত্ব তাই নিয়ে তর্ক করল, এবং নিজেদের সাফল্যে খুশিও হল, যদিও নেপোলিয়নকে, নিদেনপক্ষে কোনো মার্শাল বা নায়ককে পাকড়াও করতে না পারায় তারা দুঃখিত হল এবং সে অক্ষমতার জন্য পরস্পরকে, বিশেষ করে কুতুজভকে দায়ী করতে লাগল।
আবেগের তাড়নায় পরিচালিত এই লোকগুলি আসলে অনিবার্য নিয়মের হাতে অন্ধ যন্ত্রমাত্র হলেও তারা নিজেদের ভাবল এক একজন মহাবীর, মনে করল যে একটি মহান, সম্মানিত কাজ তারাই সম্পন্ন করেছে। সব দোষ তারা চাপাল কুতুজভের ঘাড়ে, বলল, অভিযানের গোড়া থেকেই সে নেপোলিয়নকে পরাজিত করার পথে বাধার সৃষ্টি করেছে, নিজের বাসনা পূরণ করা ছাড়া আর কিছুই সে ভাবেনি, কাপড়ের কলগুলিতে বেশ আরামে ছিল বলে সেখান থেকে এক পাও নড়তে চায়নি, ক্রাসনুতে সে রুশ বাহিনীর অগ্রগতিকে ঠেকিয়ে দিল কারণ সেখানে নেপোলিয়ন আছে শুনেই তার মুণ্ডু ঘুরে গিয়েছিল, এবং এটাও হতে পারে যে নেপোলিয়নের সঙ্গে তার একটা বোঝা-পড়া হয়ে গিয়েছিল, তাকে বেশ কিছু ঘুষ দেওয়া হয়েছিল, ইত্যাদি, ইত্যাদি।
শুধু যে সমসাময়িকরা আবেগের বশে এইসব কথা বলেছে তাই নয়, পরবর্তী যুগ এবং ইতিহাসও নেপোলিয়নকে মহান পুরুষ বলে প্রশংসা করেছে, তার কুতুজভকে বিদেশীরা বর্ণনা করেছে একজন ফন্দিবাজ, ইন্দ্রিয়পরায়ণ, দুর্বল বৃদ্ধ সভাসদরূপে, আর তার সম্পর্কে রুশদের বর্ণনা কিছুটা অস্পষ্ট–সে যেন এক ধরনের পুতুল, শুধু একটা রুশ নামের অধিকারী বলেই কিছুটা কাজের লোক।
.
অধ্যায়-৫
১৮১২ ও ১৮১৩ সালে কুতুজভের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ভুল কাজের অভিযোগ আনা হল। সম্রাট তার উপর অসন্তুষ্ট হল। এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সম্প্রতি লিখিত একখানি ইতিহাসের পুঁথিতে বলা হয়েছে, কুতুজভ ছিল একজন ধূর্ত, মিথ্যাবাদী সভাসদ, নেপোলিয়নের নাম শুনেই ভয়ে জড়সড়, ক্রাসনুতে ও ও বেরিজিনাতে তার ভুলের জন্যই রুশ বাহিনী ফরাসিদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত জয়লাভের গৌরব থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।
