সে ভাবতে লাগল, প্রিন্সেস মারি কি তার মতো দেখতে? হ্যাঁ, তার মতোই, তবু তার মতো নয়। কিন্তু এও তো আমার কাছে নতুন, বিচিত্র, অজ্ঞাত। এও আমাকে ভালোবাসে। কি আছে এর অন্তরে? যা কিছু ভালো সব। কিন্তু কেমন করে? এর মনটি কার মতো আমার সম্পর্কে এর ধারণা? সত্যি, প্রিন্সেস মারি চমৎকার মানুষ!
প্রিন্সেস মারির হাতটা টেনে নিয়ে নাতাশা ভীরু গলায় বলল, মারি তুমি আমাকে খারাপ ভেবো না। ভাববে না তো? প্রিয় মারি, তোমাকে আমি কত ভালোবাসি! এস আমরা বন্ধু হই, খুব বন্ধু।
তাকে জড়িয়ে ধরে নাতাশা তার মুখে ও হাতে চুমো খেল, তাতে প্রিন্সেস মারি লজ্জা পেল, আবার সুখীও হল।
সেদিন থেকেই প্রিন্সেস মারি ও নাতাশার মধ্যে দু-সখীর মতো একটা ভীরু উচ্ছ্বসিত বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। তারা সবসময় পরস্পরকে চুমো খায়, ভালো ভালো কথা বলে, অধিকাংশ সময় একসঙ্গে কাটায়। যখন তারা একা থাকে তার তুলনায় তারা পরস্পরের মধ্যে গভীরতর মিল অনুভব করে যখন তারা একত্রে কাটায়। তাদের মধ্যে গড়ে উঠল বন্ধুত্বের চাইতেও অধিকতর শক্তিশালী একটা অনুভূতি, একে অন্যের উপস্থিতিতে পায় যেন জীবনের এক নতুন অনুভূতি।
কখনো তারা ঘণ্টার পর ঘন্টা চুপ করে থাকে, কখনো বিছানায় শুয়ে কথা বলতে বলতে রাত ভোর করে দেয়। বেশির ভাগ সময় বলে দূর অতীতের কথা। প্রিন্সেস মারি বলে তার শৈশবের কথা, মার কথা, বাবার কথা, তার দিবাস্বপ্নের কথা। আর নাতাশাও প্রিন্সেস মারির প্রতি ভালোবাসায় তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের অতীতকেও ভালোবাসতে শিখেছে, জীবনের যেদিকটা তার কাছে দুরধিগম্য ছিল তাকেও বুঝতে শিখেছে। ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দুজনেই জীবনকে দেখতে শিখেছে নতুন দৃষ্টিতে, নতুন বিশ্বাসে–জীবনের প্রতি, তার আনন্দের প্রতি বিশ্বাসে।
আগের মতোই কখনো তারা প্রিন্স আন্দ্রুর কথা বলে না, কথা বলে নিজেদের মনের মহৎ ভাবনাকে তারা ছোট করতে চায় না, কিন্তু তার সম্পর্কে তাদের এই নীরবতার ফলে ক্রমেই তারা নিজেদের অজ্ঞাতেই তাকে ভুলে যেতে লাগল।
নাতাশা এতই শীর্ণ, বিবর্ণ ও দুর্বল হয়ে পড়েছে যে সকলেই তার স্বাস্থ্যের কথা বলে, আর তাতে সেও খুশি হয়। কিন্তু মাঝে মাঝে হঠাৎ একটা ভয় তাকে চেপে ধরে-শুধু মৃত্যুর ভয় নয়, রোগ, দুর্বলতা ও খারাপ দেখাবার ভয়, অনিচ্ছা সত্ত্বেও খোলা হাতটাকে সে ভালো করে লক্ষ্য করে, তার শীর্ণতায় বিস্মিত হয়, আর সকালে উঠেই নিজের করুণ মুখখানি আয়নায় দেখে। সে বুঝতে পারে এইরকম হওয়াই স্বাভাবিক, তবু তার মনটা ভয়ানক খারাপ হয়ে যায়।
একদিন তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে তার হাঁপ ধরে গেল। কিছু না বুঝেই তক্ষুনি নিচে নেমে গেল এবং নিজের শক্তি পরীক্ষা করার জন্য আবার দৌড়ে উপরে উঠে গেল।
অন্য এক সময় দুনিয়াশাকে ডাকতে গিয়ে গলাটা কেঁপে ওঠায় আবার তাকে ডাকল–আর ডাকল সেই বুকের ভিতর থেকে আসা গলায় যে গলায় সে গান করত, তারপর কান পেতে নিজেই নিজের গলা শুনতে লাগল।
সে জানত না, একথা বিশ্বাসও করত না, কিন্তু যে চটচটে কাদায় ঢাকা পড়ার জন্য তার আত্মা দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছিল তার কাছে, সেই কাদার স্তরের নিচ থেকে নরম ঘাসের অংকুরগুলি এর মধ্যেই মাথা তুলতে শুরু করেছে, মাটিকে শিকড় গজিয়ে তাদের জীবন্ত সবুজের আভায় সেই অংকুরগুলি তার সব দুঃখকে এমনভাবে ঢেকে দেবে যে অচিরেই তাকে আর দেখা যাবে না। তার মনের ক্ষত ভিতর থেকে সেরে উঠতে শুরু করেছে।
জানুয়ারির শেষ দিকে প্রিন্সেস মারি মস্কো যাত্রা করল, নাতাশা যাতে তার সঙ্গে গিয়ে ডাক্তার দেখায় সেজন্য কাউন্ট পীড়াপীড়ি করতে লাগল।
.
অধ্যায়-৪
ভিয়াজমাতে শত্রুপক্ষকে পরাভূত করে তচনচ করে দিতে অতি-উৎসাহী সৈন্যদলকে কুতুজভ সংযত করে রাখতে পারেনি। সেই সংঘর্ষের পর থেকে পলায়মান ফরাসিদের এবং তাদের পশ্চাদ্ধাবনকারী রুশদের অগ্রগতি ক্রাসনু পর্যন্ত বিনা যুদ্ধেই চলতে থাকল। পলায়ন ছিল এতই দ্রুতগতি যে পশ্চাদ্ধাবনকারী রুশ বাহিনী ফরাসিদের সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি। অশ্বারোহী ও গোলন্দাজ বাহিনীর ঘোড়াগুলি ক্লান্ত হয়ে পড়ল, আর ফরাসিদের গতিবিধির যেসব খবর পাওয়া গেল তাও কোনো ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ্য নয়।
দৈনিক সাতাশ মাইল হারে একটানা পথ চলার ফলে রুশ বাহিনীর সৈন্যরা এতই শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়ল যে আরো দ্রুত চলা তাদের পক্ষে সম্ভব হল না।
রুশ বাহিনী যে কতখানি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল সেটা বুঝতে হলে শুধু এই সত্যটাই জানা প্রয়োজন যে তারুতিনোর পরে পাঁচ হাজারের মতো নিহত ও আহত করে এবং শতাধিক বন্দিকে হারিয়ে যে রুশ বাহিনী। এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে তারুতিনো ছেড়ে এসেছিল তারা ক্রাসনুতে পৌঁছল মাত্র পঞ্চাশ হাজার সৈন্য নিয়ে।
ফরাসিদের পলায়ন যেমন তাদের বাহিনীর ধ্বংস সাধন করেছিল, ঠিক তেমনই রুশদের পশ্চাদ্ধাবনের দ্রুতগতিও হয়েছিল আমাদের বাহিনীর পক্ষে ধ্বংসাত্মক। দুইয়ের মধ্যে একমাত্র তফাৎ হল-রুশ বাহিনীর গতি ছিল স্বেচ্ছাপ্রণোদিত, ফরাসিদের মতো তাদের মাথার উপর ধ্বংসের খ ঝুলছিল না, আর যেখানে রুগ্ন ফরাসিদের ফেলে যেতে হল শত্রুর হাতে, রুগ্ন রুশদের ফেলে যাওয়া হল তাদের নিজেদেরই লোকের হাতে। নেপোলিয়নের বাহিনীর ক্ষয়-ক্ষতির প্রধান কারণ তাদের চলার দ্রুতগতি, আর রুশ বাহিনীর তুলনামূলক সৈন্য-সংখ্যার হ্রাসই তার চূড়ান্ত প্রমাণ।
