অদ্ভুত ভঙ্গিতে কাউন্টেস হাতল-চেয়ারে শুয়ে আছে। শরীরটা টান-টান করে দেয়ালে মাথা ঠুকছে। সোনিয়া ও দাসী তার দুহাত ধরে আছে।
কাউন্টেস চিৎকার করছে, নাতাশা! নাতাশা! এ সত্য নয়…এ সত্য নয়…ও মিথ্যা কথা বলছে…নাতাশা! সকলকে ঠেলে দিয়ে সে আর্তনাদ করে উঠল, তোমরা চলে যাও। একথা সত্য নয়! মারা গেছে!…হা, হা, হা!…এ কথা সত্য নয়।
হাতল-চেয়ারে এক হাঁটু রেখে নাতাশা মার উপর ঝুঁকে দাঁড়াল, অপ্রত্যাশিত শক্তিতে তাসে তুলে ধরে তার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল, তারপর মাকে জড়িয়ে ধরল।
মামণি!…লক্ষ্মী সোনা!…এই তো আমি এসেছি সোনামণি!
নাতাশা ফিসফিস করে অবিশ্রাম কথা বলতে লাগল।
কিছুতেই মাকে ছাড়ল না, গভীর মমতায় তাকে জড়িয়ে ধরে রইল, একটা বালিশ ও গরম জল আনতে বলল, বোতাম খুলে মার পোশাকটা ছিঁড়ে খুলে ফেলল। লক্ষ্মী সোনা মা…মামণি, মানিক আমার!…সারা মাথায়, হাতে, মুখে বার বার চুমো খেয়ে সে বলতে লাগল, আর তার নিজের অবারণ চোখের জল নাক ও গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল।
কাউন্টেস মেয়ের হাত চেপে ধরে চোখ বুজল, মুহূর্তের জন্য শান্ত হল। সহসা অনভ্যস্ত দ্রুতগতিতে উঠে বসল, ফাঁকা চাউনিতে চারদিকে তাকাল, আর নাতাশাকে দেখতে পেয়ে সর্বশক্তি দিয়ে তার মাথাটা চেপে ধরল, মেয়ের বেদনাদীর্ণ মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
অস্পষ্ট নিম্নস্বরে বলল, নাতাশা, তুমি তো আমাকে ভালোবাস? নাতাশা, তুমি তো আমাকে ঠকাবে না? সব সত্য আমাকে খুলে বলবে তো?
জল-ভরা চোখ মেলে নাতাশা মার দিকে তাকাল, সে চোখে ভালোবাসা ও ক্ষমার মিনতি ছাড়া আর কিছু নেই।
যে প্রচণ্ড দুঃখ তার মাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে তার কিছুটা ভার নিজের উপর নেবার আপ্রাণ চেষ্টায় নাতাশা বারবার বলতে লাগল, লক্ষ্মী মামণি আমার!
কিন্তু জীবনে ফুটে ওঠার কালে তার বড় আদরের ছেলেটি নিহত হয়েছে আর সে নিজে এখনো বেঁচে আছে–এ-কথা মা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। তাই তো বাস্তব সত্যের সঙ্গে সংগ্রামে বিফল হয়ে আবার সে ফিরে গেল বিকারের জগতে।
সেদিনটা, সেরাতটা এবং তার পরের দিন ও রাত যে কীভাবে কাটল তা নাতাশার মনে পড়ে না। সে একটুও ঘুমল না, মাকে ছেড়ে কোথাও গেল না। ধৈর্যশীল ভালবাসা দিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত মাকে ঘিরে রাখল। কোনো কথা নয়, সান্ত্বনা নয়, শুধু তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনার অক্লান্ত প্রয়াস।
তৃতীয় রাতে কয়েক মিনিটের জন্য কাউন্টেস একেবারে চুপচাপ হয়ে গেল। চেয়ারের হাতলে মাথা রেখে নাতাশা চোখ বুজল, কিন্তু বিছানার ক্যাচ-কাঁচ শব্দে আবার চোখ মেলল। বিছানায় উঠে বসে কাউন্টেস মৃদুস্বরে কথা বলছে।
তুমি আসায় কত খুশি হয়েছি। তুমি ক্লান্ত। একটু চা খাবে না? নাতাশা তার কাছে এগিয়ে গেল। মেয়ের হাতখানি ধরে কাউন্টেস বলেই চলল, তুমি দেখতে কত ভালো হয়েছ, আরো মানুষের মতো হয়ে উঠেছ।
মামণি! কী বলছ তুমি?
নাতাশা, সে নেই, সে নেই!
মেয়েকে জড়িয়ে ধরে এই প্রথম কাউন্টেস কেঁদে উঠল।
.
অধ্যায়-৩
প্রিন্সেস মারি তার যাত্রা স্থগিত রাখল। সোনিয়া ও কাউন্ট নাতাশার কাজগুলি করতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। তারা বুঝল, একমাত্র নাতাশাই তার মার অকারণ হতাশাকে সংযত রাখতে পারে। তিনটি সপ্তাহ নাতাশা মার পাশে সর্বক্ষণ রইল, তার ঘরেই একটু লাউঞ্জ-চেয়ারে ঘুমোয়, তাকে খাওয়া-দাওয়ায়, অনবরত তার সঙ্গে কথা বলে, কারণ একমাত্র তার মুখের মমতামাখা কথাগুলি কানে গেলেই তার মা শান্ত থাকে।
কিন্তু মার আহত মন সুস্থ হল না। পেতয়ার মৃত্যু তার জীবনের অর্ধেকটা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। পেতয়ার মৃত্যু-সংবাদ যখন এল তখন সে ছিল পঞ্চাশ বছরের একটি তাজা উৎসাহে ভরা নারী, আর একমাস পরে সে যখন ঘর থেকে বের হল তখন সে জীবনে সম্পূর্ণ বীতশূহ একটি নিরাসক্ত বৃদ্ধা। কিন্তু যে আঘাত কাউন্টেসকে ঠেলে দিল প্রায় মৃত্যুর মুখে, সেই দ্বিতীয় আঘাত নাতাশাকে ফিরিয়ে আনল নবজীবনের মধ্যে।
নাতাশা ভেবেছিল তার জীবন শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু মার প্রতি ভালোবাসা তাকে অপ্রত্যাশিতভাবে বুঝিয়ে দিল, যে ভালোবাসা জীবনের মূল কথা তা এখনো তার মধ্যে সক্রিয়। ভালোবাসা জেগে উঠেছে, আর সেই সঙ্গে জীবনও জেগেছে।
প্রিন্স আন্দ্রুর শেষ দিনগুলি প্রিন্সেস মারি ও নাতাশার জীবনকে একসূত্রে বেঁধে দিয়েছে, এই নতুন দুঃখ তাদের দুজনকে আরো ঘনিষ্ঠ করে তুলল। প্রিন্সেস মারি তার যাত্রা স্থগিত রাখল, তিনটি সপ্তাহ ধরে রুগ্ন শিশুর মতো নাতাশার পরিচর্যা করল। মার শয়নকক্ষে কাটানো শেষের সপ্তাহ কয়টি নাতাশার দৈহিক শক্তিকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল।
একদিন বিকেলে নাতাশাকে জ্বরে কাঁপতে দেখে প্রিন্সেস মারি তাকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। নাতাশা শুয়ে পড়ল, কিন্তু পর্দাগুলো নামিয়ে দিয়ে প্রিন্সেস মারি যখন চলে যাচ্ছিল তখন সে তাকে ডাকল।
আমার ঘুমতে ইচ্ছা করছে না মারি, আমার কাছে একটু বস।
তুমি ক্লান্ত-ঘুমতে চেষ্টা কর।
না, না। কেন আমাকে এখানে নিয়ে এলে? মা আমার খোঁজ করবে।
মা এখন ভালো আছে। আজ সে বেশ ভালোভাবে কথা বলেছে। প্রিন্সেস মারি বলল। নাতাশা বিছানায় শুয়ে ঘরের আধা-অন্ধকারে প্রিন্সেস মারির মুখটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
