সেই দৃশ্যের একেবারে গোড়া থেকেই সে তাকে দেখতে পেল, তখনকার পরিবেশটি যেন নতুন করে আবার ঘটল। কথাগুলির সঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রুর চোখে যে দীর্ঘ, বিষণ্ণ, কঠিন দৃষ্টি ফুটে উঠেছিল তাও তার মনে পড়ে গেল, সে দৃষ্টির তিরস্কার ও হতাশার অর্থও সে বুঝতে পারল।
নাতাশা নিজেকেই বলতে লাগল, স্বীকার করেছিলাম যে সে যদি কষ্ট পেয়েই চলতে থাকে তাহলে সেটা সত্যই ভয়ংকর ব্যাপার হবে। অবস্থাটা তার পক্ষে ভয়ংকর হবে জেনেই কথাটা বলেছিলাম, কিন্তু সে তার ভিন্ন অর্থ করল। ভাবল, ব্যাপারটা আমার দিক থেকে ভয়ংকর হবে। তখনো সে বাঁচতে চাইছে, মৃত্যুকে ভয় করছে। আর কি রকম বোকার মতো অদ্ভুতভাবে তাকে আমি কথাগুলি বললাম! যা আমার মনের কথা তা আমি বলতে পারিনি। ভেবেছিলাম সম্পূর্ণ অন্য রকম। মনের কথা যদি বলতে পারতাম তাহলে আমার বলা উচিত ছিল : সে যদি মুমূর্ষ অবস্থায়ই চলতে থাকে, আমার চোখের সামনেই যদি একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়, তাহলেও এখন আমি যে অবস্থায় আছি তার তুলনায় অধিকতর সুখীই হতাম। এখন তো কিছু নেই…কেউ নেই। সে কি তা জানত? না, সে জানত না, কোনো দিন জানবে না। আর সে ভুল শুধরে নেবার কোনো-কোনো সম্ভাবনাই এখন আর নেই। এখন আবার মনে হচ্ছে সেই একই কথাগুলি প্রিন্স আন্দ্রু আবার তাকে বলছে, আর নাতাশা কল্পনায় সম্পূর্ণ আলাদা উত্তর তাকে দিচ্ছে। তাকে থামিয়ে দিয়ে নাতাশা বলল : তোমার পক্ষে ভয়ংকর, কিন্তু আমার পক্ষে নয়। তুমি তো জান, তোমাকে ছাড়া আমার জীবনের কোনো অর্থ নেই, আর তোমার সঙ্গে কষ্ট ভোগ করাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখ। তার হাতটা ধরে নাতাশা তাতে চাপ দিল, প্রিন্স আন্দ্রুর মৃত্যুর চার দিন আগেকার সেই ভয়ংকর সন্ধ্যায় ঠিক যেভাবে তার হাতটাকে সে চেপে ধরেছিল। কল্পনায় সে মমতা ও ভালোবাসা মাখানো সেই কথাগুলি বলতে লাগল যা সে তখনো বলতে পারত, কিন্তু বলছে শুধু এখন : আমি তোমাকে ভালোবাসি।…তোমাকেই! আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি… গভীর আবেগে নিজের হাত চেপে ধরে আপ্রাণ চেষ্টায় দাঁতে দাঁত চেপে সে কথাগুলি বলল…
মধুর দুঃখ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল, দুচোখ জলে ভরে এল : পরক্ষণেই সহসা নিজেকেই প্রশ্ন করল, কাকে সে বলছে এসব কথা? আবার সবকিছুই একটা শুষ্ক, কঠোর বিমূঢ়তায় ঢেকে গেল, ভ্রুকুটি কুটীল চোখে আবার সে ফিরে তাকাল বর্তমান জগতের দিকে। আর এখন, এখন তার মনে হল, রহস্যের যবনিকাকে সে ভেদ করতে পেরেছে।…কিন্তু যে মুহূর্তে তার মনে হল যে ধারণার অতীত সত্য তার কাছে প্রকাশিত হতে চলেছে ঠিক তখনই দরজার হাতলের একটা খটাখট আওয়াজ তার কানে এসে বিধল।
দাসী দুনিয়াশা দ্রুত পায়ে আচমকা ঘরে ঢুকল। তার মুখে ভয়ার্ত দৃষ্টি।
অদ্ভুত উত্তেজিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল, দয়া করে এখনই আপনার বাবার কাছে চলুন। বড়ই দুর্ভাগ্য…পিতর ইলিনিচ…একটা চিঠি, ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে কথা শেষ করল।
.
অধ্যায়-২
সাধারণভাবে সকলের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতাবোধ ছাড়াও নিজের পরিবার থেকে একটা বিশেষ বিচ্ছিন্নতার বোধ নাতাশাকে পেয়ে বসেছে। বাবা, মা ও সোনিয়া–সকলেই তার এত ঘনিষ্ঠ; এত পরিচিত, এত সাধারণ যে তাদের সব কথা, সব মনোভাবই তার সাম্প্রতিক জীবনের প্রতি একটা বিদ্রূপস্বরূপ, তাদের সম্পর্কে সে যে উদাসীন তাই শুধু নয়, তাদের প্রতি সে একান্তই বিরূপ। তাই দুনিয়াশার মুখে পিতর ইলিনিচ ও দুর্ভাগ্য কথা দুটি শুনেও তার অর্থটা যেন ঠিক ধরতে পারল না।
কিসের দুর্ভাগ্য? তাদের কি দুর্ভাগ্য ঘটতে পারে? তারা তো নিজেদের পুরোনো, শান্ত, সাধারণ জীবনযাত্রাকেই চালিয়ে যাচ্ছে, নাতাশা ভাবল।
সে যখন নাচ-ঘরে ঢুকল তখন তার বাবা দ্রুত পায়ে তার মার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার গালে ভাঁজ পড়েছে, চোখের জলে ভিজে গেছে। কান্নায় গলা আটকে আসছিল বলে বাবা সে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসেছে। নাতাশাকে দেখে হতাশভাবে হাত নাড়তে নাড়তে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। গোল নরম মুখখানা কান্নায় বিকৃত হয়ে উঠল।
পে…পেতয়া…যাও, যাও, ও…ডাকছে… শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে বাবা দুর্বল পা ফেলে কোনোরকমে চেয়ারের কাছে গিয়ে দুহাতে মুখ ঢেকে ধপাস করে বসে পড়ল।
সহসা নাতাশার সারা শরীরের ভিতর দিয়ে যেন একটা বিদ্যুৎ-প্রবাহ বয়ে গেল। তীব্র ব্যথার আঘাতে আর্ত হৃদয়ে সে একটা ভয়ংকর বেদনা অনুভব করল, মনে হল, তার ভিতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে, সে যেন মরতে বসেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেই বেদনার পরিবর্তে দেখা দিল একটা মুক্তির অনুভূতি–যে বেদনাদায়ক সংযম তাকে জীবন থেকে সরিয়ে রেখেছিল তার হাত থেকে মুক্তি। বাবার এই দৃশ্য, দরজার ফাঁক দিয়ে ভেসে-আসা মার ভয়ংকর উন্মাদ চিৎকার-মুহূর্তের মধ্যে ভুলিয়ে দিল নিজেকে, তার সব দুঃখকে।
সে বাবার কাছে ছুটে গেল, কিন্তু বাবা দুর্বলভাবে হাত নেড়ে মার ঘরটা দেখিয়ে দিল। প্রিন্সেস মারি বেরিয়ে এল সে ঘর থেকে। তার মুখ বিবর্ণ, থুতনি কাঁপছে, নাতাশার হাত ধরে কি যেন বলল। নাতাশা তাকে দেখতে পেল না, তার কথাও শুনতে পেল না। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে মুহূর্তের জন্য দরজায় একটু থামল, বুঝি বা নিজের সঙ্গে লড়াই করল, তারপর ছুটে গেল মার কাছে।
