একমাত্র যখন তারা দুজন একত্র থাকে তখনই এই সব অপমান ও বেদনা থেকে তারা মুক্তি পায়। নিজেদের মধ্যেও তারা খুব কম কথা বলে, আর যখন বলে তাও অতি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়েই বলে।
ভবিষ্যতের আলোচনাকে দুজনই এড়িয়ে চলে। ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে স্বীকার করাটাই তাদের কাছে প্রিন্স আন্দ্রুর স্মৃতিকে অসম্মান দেখানোর সামিল। যে মারা গেছে তার সম্পর্কিত সবকিছুকেই তারা সযত্নে এড়িয়ে চলে। তাদের মনে হয়, যে জীবনকে তারা পার হয়ে এসেছে তার অভিজ্ঞতাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, প্রিন্স আন্দ্রুর জীবনের যে কোনো ঘটনার উল্লেখ করলেই তাদের চোখের সামনে যে রহস্য রূপায়িত হত, তার মহত্ত্ব ও পবিত্রতা বিঘ্নিত হবে।
একাদিক্রমে কথা বলা থেকে বিরত থাকা এবং সে বিষয় সম্পর্কিত সবকিছুকে অনবরত এড়িয়ে চলার ফলে তাদের মনের অনুভূতির অধিকতর পবিত্রতা ও স্পষ্টতা নিয়ে তাদের মনের সামনে ভেসে ওঠে।
কিন্তু নির্ভেজাল পরিপূর্ণ সুখের মতোই নির্ভেজাল পরিপূর্ণ দুঃখও অসম্ভব। প্রিন্সেস মারি এখন তার নিজের ভাগ্যের একমাত্র স্বাধীন বিধাতা, সে তার ভাইপোটিরও অভিভাবিকা ও শিক্ষয়িত্রী, কাজেই প্রথম পক্ষকাল যে দুঃখের রাজ্যে সে বাস করেছে সর্বপ্রথম তাকেই সেখান থেকে বাস্তব জীবনে ফিরে আসতে হয়েছে। আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে চিঠি এলে তার জবাব দেয়, যে ঘোট ঘরটায় ছোট নিকলাস থাকে সেটা স্যাঁতসেঁতে, আর তাই তার কাশি হয়েছে, আলপাতিচই তো স্লাভল থেকে সেখানকার অবস্থার কথা জানিয়ে প্রস্তাব ও পরামর্শ দিয়েছে যে মস্কোতে ভজদভিজেংকা স্ট্রীটের বাড়িতে ফিরে যাওয়াই তাদের উচিত, সে বাড়িটা অক্ষতই আছে, সামান্য মেরামত করে দিলেই চলবে। জীবন তো কোথাও থেমে থাকে না, কাজেই বাঁচতে তো হবেই। প্রিন্স আন্দ্রুর মৃত্যুর পর থেকে প্রিন্সেস মারি যে নির্জন ধ্যানের রাজ্যে ডুবে ছিল সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে যত কষ্টই হোক, নাতাশাকে একলা ফেলে যেতে তার যত দুঃখ ও লজ্জাই হোক, তবু জীবনের নানা চিন্তার দাবিই বড় হয়ে দেখা দিল, অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে দাবির কাছে সে নতিস্বীকার করল। আলপাতিচের সঙ্গে বসে হিসাবপত্র দেখল, ভাইপোর ব্যাপারে দেসালেসের সঙ্গে আলোচনা করল, এবং মস্কো ফিরে যাবার হুকুম দিয়ে সেজন্য তোড়জোড় শুরু করে দিল।
নাতাশা একা পড়ে গেল, প্রিন্সেস মারি যবে থেকে যাত্রার আয়োজন করতে লাগল তখন থেকে তার কাছ থেকেও সে সরে গেল।
প্রিন্সেস মারি কাউন্টেসকে বলল, নাতাশাকেও তাদের সঙ্গে মস্কো যেতে দেওয়া হোক, বাবা-মা সানন্দে সে প্রস্তাব গ্রহণ করল, কারণ তারা দেখছে তাদের মেয়েটি দিনের পর দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে, আর স্থান পরিবর্তন ও মস্কোর ডাক্তারদের পরামর্শের ফল তার পক্ষে ভালোই হবে।
সে প্রস্তাব করা হলে নাতাশা বলল, আমি কোথাও যাচ্ছি না। দয়া করে আমাকে একা থাকতে দাও! অনেক কষ্টে দুঃখের চাইতে বিরক্তির চোখের জল চেপে সেখান থেকে ছুটে চলে গেল।
সে বুঝল, প্রিন্সেস মারি তাকে ছেড়ে যাচ্ছে, তার দুঃখ তাকে একাই সইতে হবে। বেশির ভাগ সময় সে নিজের ঘরে একাই কাটায়। এই নির্জনতা তাকে ক্লান্ত করে তোলে, যন্ত্রণা দেয়, তবু সেটা তার পক্ষে একান্ত প্রয়োজন। কেউ ঘরে ঢুকলেই সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়, মুখের ভাব বদলে জায়গা বদল করে, একটা বই বা সেলাই হাতে নেয়, অনধিকার প্রবেশকারী কতক্ষণে চলে যাবে তার জন্য অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করে।
সারাক্ষণই তার মনে হয়, যার দিকে তার অন্তরের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে যে কোনো মুহূর্তেই তার ভিতরে সে প্রবেশ করতে পারবে।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে একদিন শীর্ণ, বিবর্ণ শরীর কালো পশমি গাউনে ঢেকে, চুলে কোনোরকমে একটা গিট বেঁধে, সোফার উপর গুঁড়িসুড়ি মেরে বসে, ওড়নার একটা কোণ পালিশ করতে করতে নাতাশা দরজাটার এক কোণের দিকে তাকিয়েছিল।
সে তাকিয়ে আছে সেই দিকে যেদিক দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু চলে গিয়েছে–জীবনের ওপারে। জীবনের সেই পরপারের কথা নাতাশা আগে কখনো ভাবেনি, সেটা তার কাছে মনে হত বহুদূরের এক দুর্গম স্থান, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অনেক কাছের, অনেক ঘনিষ্ঠ এবং অনেক বেশি বোধগম্য, বরং এখন জীবনের এপারটাই শূন্যতা ও নির্জনতায় ভরা, যন্ত্রণা ও অমর্যাদায় আকীর্ণ।
প্রিন্স আন্দ্রু এখন যেখানে আছে বলে সে জানে সেইদিকেই সে তাকিয়ে আছে, কিন্তু এখানে সে যে রূপে ছিল তা থেকে কোনো ভিন্নতর রূপে সে তাকে কল্পনাই করতে পারে না। এখনো সে তাকে সেইভাবেই দেখছে যেভাবে দেখেছিল মিতিশচিতে, এয়স্তায় এবং ইয়ারোস্লাভলে।
সে প্রিন্স আন্দ্রুর মুখ দেখতে পেল, তার কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, তার ও নিজের কথাগুলির পুনরাবৃত্তি করল, আর মাঝে মাঝে এমন সব সংলাপ বানিয়ে বলল যা তারা বলতে পারত।
ওই তো শীর্ণ বিবর্ণ হাতের উপর মাথাটা রেখে ভেলভেটের জোব্বা পরে সে হাতল-চেয়ারটায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। বুকটা ভয়ংকরভাবে বসে গেছে, কাঁধ দুটো ঠেলে উঠেছে। দুটি ঠোঁট দৃঢ়বদ্ধ, দুচোখে আলোর ঝিলিক, বিবর্ণ কপালে কখনো ভাঁজ পড়ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। একটা পা দ্রুতগতিতে ঈষৎ কাঁপছে। নাতাশা জানে সে ভয়ংকর ব্যথার সঙ্গে লড়ছে। সে ব্যথাটা কেমন ধারা? কেন এ ব্যথা তার হল? তার কেমন লাগছে? ব্যথাটা তাকে কীভাবে কষ্ট দিচ্ছে নাতাশা ভাবতে লাগল। সে যে তাকে দেখছে সেটা লক্ষ্য করে প্রিন্স আন্দ্রু চোখ তুলে বলতে লাগল : একটি যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষের সঙ্গে চিরদিনের মতো নিজেকে বেঁধে ফেলা–সে বড় ভয়ংকর। সে যে নিয়ত যন্ত্রণা। সেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নাতাশার দিকে তাকাল। কি বলবে বুঝবার আগেই নাতাশা যথারীতি জবাব দিয়ে বসল : এরকম চলতে পারে না–চলবে না। তোমাকে সেরে উঠতেই হবে সম্পূর্ণ সেরে উঠতে হবে।
