চতুর্থ এবং প্রধান কথা, সেটা অসম্ভব এই কারণে যে, জগতের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ১৮১২ সালের মতো ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে কখনো কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি, ফরাসিদের পশ্চাদ্ধাবন করতে রুশ বাহিনীকে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হয়েছে, তার বেশি কিছু করতে গেলে সে নিজের ধ্বংসকেই ডেকে আনত।
তারুতিনো থেকে ক্রাসনু যাবার পথে রুশ বাহিনী রুগ্ন অথবা দলছুট হিসেবে পঞ্চাশ হাজার সৈন্যকে হারাল, অর্থাৎ সংখ্যাটা যে কোনো একটা বড় প্রাদেশিক শহরের জনসংখ্যার সমান। অর্ধেক সৈন্য মারা পড়ল বিনা যুদ্ধে।
অভিযানের এইরকম একটা পর্যায়ে–যখন সৈন্যদের ছিল না বুট, ছিল না ভেড়ার চামড়ার কোট, ছিল যথেষ্ট খাদ্য, ভদকা তো একেবারেই ছিল না, পনেরো ডিগ্রি তুষারপাতের মধ্যে মাসের পর মাস রাত কাটিয়েছে বাইরে তাঁবু খাঁটিয়ে, যখন দিনের আলো থাকত মাত্র সাত কি আট ঘণ্টা, আর বাকি রাতটাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা ছিল অসম্ভব, যখন কেবলমাত্র যুদ্ধের কয়েক ঘন্টা নয়, মাসের পর মাস সৈন্যদের এমন একটা মৃত্যুপুরীতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যেখানে শৃঙখলা ভেঙে পড়তে বাধ্য, যখন প্রতিটি মুহূর্তে তারা যুদ্ধ করেছে ক্ষুধা ও শীতের আক্রমণে মৃত্যুর বিরুদ্ধে, যখন মাত্র একটি মাসে অর্ধেক সৈন্য ধ্বংস হয়ে গেল–অভিযানের সেই পর্যায় সম্পর্কে ইতিহাসকাররা আমাদের শোনালেন মিলোরদভিচের কোন পথে কোথায় সৈন্য পরিচালনা করা উচিত ছিল, তর্মাসভের কোন নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়া উচিত ছিল, হাঁটু পর্যন্ত বরফের ভিতর নিয়ে নদী পেরিয়ে চিচাগভের যাওয়া উচিত ছিল অন্য কোনখানে, এবং যেন তেন প্রকারেণ ফরাসি বাহিনীকে বিচ্ছিন্ন করা ও পরাস্ত করা উচিত ছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি।
অর্ধেক সৈন্য মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়লেও জাতির যোগ্য লক্ষ্য পূরণে যা কিছু করা সম্ভব এবং যা কিছু করা উচিত রুশ সৈন্যরা সেসবই করেছে, রাশিয়ার অন্য একদল মানুষ বৈঠকখানায় আরামে বসে তাদের অসম্ভব কিছু করতে বলেছে বলেই রুশ সৈন্যদের কোনোরকম দোষ দেওয়া উচিত নয়।
প্রকৃত সত্য ও ঐতিহাসিক বিবরণের মধ্যে বিচিত্র স্ববিরোধকে আজ বোঝা শক্ত তার কারণই হল, ইতিহাসকাররা লিখেছে সুন্দর সুন্দর কথা দিয়ে বিভিন্ন জেনারেলের মনোভাবের ইতিহাস, প্রকৃত ঘটনার ইতিহাস নয়।
তাদের আগ্রহ মিলোরাদভিচের কথায়, আর অমুক বা তমুক জেনারেল যেসব পুরস্কার পেয়েছে, তার প্রতি, কিন্তু যে পঞ্চাশ হাজার মানুষ হাসপাতালে অথবা কবরের নিচে পড়ে রইল তাদের কথা সেই ইতিহাসকারদের মনকে টানেনি, কারণ সেটা তাদের অনুসন্ধানের আওতার মধ্যে পড়ে না।
অথচ কেউ যদি প্রতিবেদন ও সাধারণ পরিকল্পনাগুলি বাতিল করে দিয়ে যে লাখ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে সেইসব ঘটনায় অংশ নিয়েছিল তাদের কথা আলোচনা করে তাহলেই যেসব সমস্যাকে সমাধানের অতীত বলে মনে হয়েছে সে সবকিছুরই অত্যন্ত সহজ ও সরল সমাধানের সূত্র সে সঙ্গে সঙ্গেই পেয়ে যাবে।
নেপোলিয়ন ও তার সেনাদলকে বিচ্ছিন্ন করার চিন্তা এক ডজন মানুষের কল্পনায় ছাড়া আর কোথাও কোনোকালে ছিল না। থাকতে পারে না, কারণ সে চিন্তাই অর্থহীন ও অবাস্তব।
জনসাধারণের মনে ছিল একটি লক্ষ্য : দেশকে আক্রমণের হাত থেকে মুক্ত করা। প্রথমত, ফরাসিরা যখন নিজে থেকেই পালাতে শুরু করল তখনই সে লক্ষ্য সিদ্ধ হয়ে গেল, কাজেই তাদের পলায়ন না থামানোটাই তখন একমাত্র কাজ। দ্বিতীয়ত, যে গেরিলাযুদ্ধে ফরাসিরা ধ্বংস হচ্ছিল তাতেই সে লক্ষ্য সিদ্ধ হয়েছে, তৃতীয়ত, রুশ বাহিনীর একটা বড় অংশ তখন ফরাসিদের পিছনে ধাওয়া করে চলেছে, তারা থামলেই সবশক্তি নিয়ে ফরাসিদের আক্রমণ করতে তারা প্রস্তুতই ছিল।
রুশ বাহিনীকে তখন কাজ করতে হয়েছিল ধাবমান জন্তুর পিঠে চাবুকের মতো। আর অভিজ্ঞ কোয়ানমাত্রই জানে যে ধাবমান জন্তুটার মাথায় চাবুকের ঘা বসানোর চাইতে ভয়-দেখানো ভঙ্গিতে চাবুকটাকে উদ্যত রাখাটাই শ্রেয়তর।
১৫. প্রিন্স আন্দ্রুর মৃত্যুর পরে
পঞ্চদশ পর্ব – অধ্যায়-১
একটি মুমূর্ষ জন্তুকে দেখলে মানুষের মনে আতংক জাগে : চোখের সামনে তারই অনুরূপ একটি জীব মরতে বসেছে। কিন্তু যখন কোনো প্রিয় ঘনিষ্ঠ মানুষের মৃত্যু ঘটে তখন জীবন অবসানের এই ত্রাস ছাড়াও দেখা দেয় একটা কাটা ঘা, একটা আত্মিক ক্ষত, দৈহিক ক্ষতের মতোই সে ক্ষত কখনো মারাত্মক হয়, কখনো শুকিয়ে যায়, কিন্তু বাইরে থেকে যে কোনোরকম খোঁচা লাগলেই ব্যথা লাগে, কুঁকড়ে ওঠে।
প্রিন্স আন্দ্রুর মৃত্যুর পরে নাতাশা ও প্রিন্সেস মারিরও সেই অবস্থা হল। মৃত্যুর যে ভীতিপ্রদ মেঘ ছায়া ফেলেছে তাদের উপর তার মুখোমুখি হয়ে বিষণ্ণ মনে তারা চোখ বুজে রইল, জীবনের দিকে চোখ মেলে তাকাবার সাহস তাদের নেই। যে কোনোরকম বেদনাদায়ক স্পর্শ থেকে ক্ষতস্থানকে তারা সযত্নে রক্ষা করে চলল। রাস্তায় দ্রুত ধাবমান একটা গাড়ি, ডিনারে যোগ দেবার ডাক, কি পোশাক পরে বের হবে সে সম্পর্কে দাসীর প্রশ্ন, অথবা কোনোরকম আন্তরিকতাবিহীন বা দুর্বল সহানুভূতি : এ সবকিছুই তাদের কাছে অপমান বলে মনে হয়, ক্ষতস্থান বেদনায় নতুন করে টাটিয়ে ওঠে, যে কঠোর ভয়ংকর সঙ্গীত কল্পনায় এখনো তাদের কানে প্রতিধ্বনিত হয়, তাকে ভালো করে শুনবার জন্য যে প্রশান্তি প্রয়োজন হয় তাও বিঘ্নিত হয়, মুহূর্তের জন্য যে রহস্যময় সীমাহীন দৃশ্য তাদের সামনে খুলে গিয়েছিল সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা আর হয়ে ওঠে না।
