রুশ সামরিক ইতিহাসকাররা যদি যুক্তির দাবি মেনে চলে তাহলে তাদের স্বীকার করতেই হবে যে রুশ বাহিনীর শৌর্য, দেশসেবা প্রভৃতি সম্পর্কে যত উচ্ছ্বসিত কাব্য তারা রচনা করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে মস্কো থেকে ফরাসিদের পশ্চাদপসরণ নেপোলিয়নের জয়ের পর জয় এবং কুতুজভের পরাজয়ের পর পরাজয়েরই স্বাক্ষর বহন করে।
কিন্তু জাতীয় গর্ববোধের ব্যাপারটাকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রেখেও যে কোনো মানুষেরই মনে হবে যে এধরনের সিদ্ধান্ত স্ববিরোধী, কারণ ফরাসিদের উপর্যুপরি জয় তাদের এনে দিয়েছিল পরিপূর্ণ ধ্বংস, আর রুশদের উপযুপরি পরাজয়ের ফল হল শত্রুপক্ষের সার্বিক বিনষ্টি এবং তাদের দেশের মুক্তি।
এই স্ববিরোধের উৎস খুঁজতে হবে একটিমাত্র ঘটনার মধ্যে : ইতিহাসকাররা সম্রাট ও জেনারেলদের চিঠিপত্র, স্মৃতিকথা, প্রতিবেদন, প্রকল্প ইত্যাদি থেকে তাদের রচনার উপাদান সংগ্রহ করতে গিয়ে ১৮১২ সালের অভিযানের শেষ পর্যায়ে এমন একটি লক্ষ্যের কথা বলেছে–অর্থাৎ মার্শালবর্গ ও সেনাবাহিনীসহ নেপোলিয়নকে ছিন্নভিন্ন করে গ্রেপ্তার করা–কোনোকালেই যার কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
এরকম কোনো লক্ষ্য কখনো ছিল না বা থাকতে পারে না, কারণ সেটা একান্তই অর্থহীন এবং তাকে কার্যে পরিণত করা একেবারেই অসম্ভব।
সেটা যে অর্থহীন তার প্রথম কারণ, নেপোলিয়নের ছত্রভঙ্গ বাহিনী তখন যথাসম্ভব দ্রুতগতিতে রাশিয়া থেকে পালাচ্ছিল, আর প্রতিটি রুশ তখন সেটাই চাইছিল। কাজেই ফরাসিরা যখন প্রাণপণ শক্তিতে পালিয়েই যাচ্ছে তখন অকারণ যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রয়োজনটা কোথায়?
দ্বিতীয়, যে সৈন্যরা পালিয়ে যেতেই সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে তাদের পথ আটকে দেবার তো কোনোই অর্থ হয় না।
তৃতীয়, যে ফরাসি বাহিনী বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেকে নিজেই এমনভাবে ধ্বংস করে চলছিল যেপথে কোনোরকম বাধার সম্মুখীন না হয়েও মূল বাহিনীর একশো ভাগের এক ভাগের বেশি সৈন্য নিয়েও সীমান্ত পার হতে পারেনি, তাকে ধ্বংস করার জন্য নিজেদের সৈন্য নষ্ট করা হত একান্তই অর্থহীন।
চতুর্থ, সম্রাট, রাজন্যবর্গ এবং ডিউকবৃন্দকে গ্রেপ্তারের বাসনাটাই অর্থহীন হত,তাদের গ্রেপ্তার করা হলে সেটা যে রুশদের পক্ষে খুবই বেশিরকমের হতবুদ্ধিকর হত সেকথা তো সেসময়কার সবচাইতে নিপুণ কূটনীতিবিদরাই (জোসেফ দ্য মেইস্তার প্রভৃতিরা) স্বীকার করেছে। ফরাসি সৈন্যদের গ্রেপ্তার করার বাসনা আরো বেশি অর্থহীন হত, কারণ ক্ৰাসনুতে পৌঁছবার আগেই আমাদের সৈন্যসংখ্যা কমতে কমতে অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছিল, যখন আমাদের নিজেদের সৈন্যরাই পুরো রেশন পাচ্ছিল না, আর যাদের ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারাই ক্ষুধায় মরতে বসেছে, সেই পরিস্থিতিতে একটা গোটা সৈন্যদলকে বন্দি করে পাহারা দিয়ে নিতে যেতে একটা গোটা ডিভিশন সৈন্যেরই দরকার হয়ে পড়ত।
নেপোলিয়ন ও তার বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে গ্রেপ্তার করার গুরুগম্ভীর পরিকল্পনাগুলি সেই বাজার-মালির পরিকল্পনারই মতো যে বাগানে ঢুকে গাছের চারা মাড়িয়ে দেওয়ার জন্য গরুটাকে তাড়িয়ে দিতে ফটক পর্যন্ত ছুটে গিয়ে তার মাথায়ই মারল লাঠির ঘা। তার স্বপক্ষে একটিমাত্র কথাই বলা যায় যে সে খুব রেগে গিয়েছিল। কিন্তু এইসব প্রকল্প যারা রচনা করেছিল তাদের স্বপক্ষে একথাও বলা যাবে না, কারণ ফুলের কেয়ারি মাড়িয়ে দেবার ফলে তাদের অন্তত কোনো ক্ষতি হয়নি।
নেপোলিয়নকে তার সেনাদল থেকে বিচ্ছিন্ন করা যে অর্থহীন তাই শুধু নয়, সেটা অসম্ভবও বটে।
সেটা যে অসম্ভব তার প্রথম কারণ, অভিজ্ঞতা থেকেই জানা যায় যে রণক্ষেত্রে তিন মাইল দীর্ঘ সেনা সমাবেশ কখনো পরিকল্পনামাফিক চলতে পারে না, চিচাগভ, কুতুজভ ও উইগেনস্তিন যথাসময়ে একটা নির্দিষ্ট স্থানে মিলিত হবে–তার সম্ভাবনা এতই সুদূর যে সেটা প্রায় অসম্ভবের পর্যায়েই পড়ে। বস্তুত, পরিকল্পনাটা হাতে পেয়ে কুতুজভ তো বলেইছিল যে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত কোনো পরিকল্পনা বাঞ্ছিত ফল এনে দিতে পারে না।
দ্বিতীয়, সেটা অসম্ভব এই কারণে যে, যে দুর্বার গতিতে নেপোলিয়নের সৈন্যরা পালাচ্ছিল তাকে স্তব্ধ করে দিতে হলে রুশদের তৎকালীন সৈন্যশক্তি অপেক্ষা আরো বহুগুণ সৈন্যের প্রয়োজন হত।
তৃতীয়, সেটা অসম্ভব এই কারণে যে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া এই সামরিক কথাটাই অর্থহীন। একটুকরো রুটিকে কেটে বিচ্ছিন্ন করা যায়, কিন্তু একটা সেনাদলকে তা করা যায় না। একটা সেনাদলকে বিচ্ছিন্ন করা-তার পথ আটকে দেওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব, কারণ গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলবার প্রচুর পথ সব সময়ই ভোলা থাকে, তাছাড়া আছে রাতে যখন কিছুই চোখে দেখা যায় না, সমর-বিজ্ঞানীরা তো ক্ৰাসনু ও বেরিজিনার দৃষ্টান্ত থেকেই সেটা ভালোভাবে বুঝতে পারে। যারা বন্দি হতে চায় একমাত্র তাদেরই বন্দি করা যায়, যেমন যে পাখি হাতে এসে বসে তাকেই শুধু ধরা সম্ভব। সৈন্যরা যখন জার্মানদের মতো রণ-কৌশল হিসেবে আত্মসমর্পণ করে একমাত্র তখনই তাদের বন্দি করা যায়। কিন্তু ফরাসি সৈন্যরা সে কৌশলকে গ্রহণীয় বলে মনে করেনি, কারণ কি পলায়নে কি বন্দি জীবনে ক্ষুধায় এবং শীতে মৃত্যু তাদের অনিবার্য নিয়তি।
