সম্রাট হিসেবে আমি দীর্ঘকাল কাজ করেছি, এবার সেনাপতি হিসেবে কাজ করার সময় এসেছে।তথাপি অবশিষ্ট বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত সৈন্যদের ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে পরক্ষণেই আবার সে পালিয়ে গিয়েছিল।
তারপর আমাদের বলা হয়েছে মার্শালদের অন্তরের মহত্ত্বের কথা–বিশেষ করে নে-র কথা–আ সে মহত্ত্বের তো এই স্বরূপ, বাহিনী-পতাকা, কামান-বন্দুক ও নয়-দশমাংশ সৈন্যকে ফেলে রেখে রাতের অন্ধকারে বনের আড়াল দিয়ে নিপার নদী পার হয়ে সে ওর্শাতে পালিয়ে গিয়েছিল।
এবং সবশেষে, বীরত্বপূর্ণ সেনাদলের কাছ থেকে মহান সম্রাটের চূড়ান্ত যাত্রাকে ইতিহাসকাররা বর্ণনা করেছে একটি মহৎ ও প্রতিভার স্মারক রূপে। এমন কি যে চূড়ান্ত পলায়নকে সাধারণ ভাষায় নিচতার সর্বনিম্ন ধাপ বলে বর্ণনা করা হয়, যা নিয়ে প্রতিটি শিশুকেও লজ্জা পেতে শেখানো হয়, তাকেও ইতিহাসকারদের ভাষায় সমর্থন জানানো হয়েছে।
ঐতিহাসিক যুক্তির সুতোকে যখন আর টানা যায় না, কোনো কাজ যখন মানুষ যাকে সঠিক, এমন কি ন্যায় বলে মনে করে তার সম্পূর্ণ বিরোধী হয়, তখনই ইতিহাসকাররা মহত্ত্ব নামক একটি আত্মরক্ষাকারী ধারণার আশ্রয় নিয়ে থাকে। মনে হয়, মহত্ত্ব বুঝি ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠির অতীত। মহাপুরুষের পক্ষে কিছুই অন্যায় নয়, এমন কোনো নৃশংসতা নেই যার জন্য একজন মহাপুরুষকে দোষী করা যায়।
গরম লোমের পোশাকে শরীর ঢেকে নেপোলিয়ন স্বদেশে পালিয়ে গেল, মৃত্যুর মুখে ফেলে রেখে গেল তাদের যারা শুধু তার সহকর্মী নয়, যাদের সে এখানে নিয়ে এসেছিল। সে ভাবল খুব ভালো কাজই করেছে, আর তাই ভেবে তার মনও শান্ত হল।
নেপোলিয়ন বলল, মহান থেকে হাস্যকরের ব্যবধান মাত্র একটি ধাপের। আর সারা বিশ্ব পঞ্চাশ বছর ধরে তারই পুনরাবৃত্তি করে গেল : মহান! মহিমময়! নেপোলিয়ন মহিমময়! মহান থেকে হাস্যকরের ব্যবধান মাত্র একটি ধাপের।
একথা কারো মনে হল না যে, ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ডের বিচারে যে মহত্ত্ব তুল্যমূল্য নয় তাকে স্বীকার করার অর্থই নিজের অন্তঃসারশূন্যতা ও অপরিমেয় নিচতাকে স্বীকার করা।
আমার কাছে, যেহেতু খৃস্টের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি ভালো ও মন্দের মানদণ্ড, মানুষের কোনো কাজই বিচারের ঊর্ধ্বে নয়। যেখানে সরলতা, সাধুতা ও সত্য অনুপস্থিত, সেখানে কোনো মহত্ত্ব থাকতে পারে না।
.
অধ্যায়-১৯
১৮১২ সালের অভিযানের শেষাংশের বিবরণ পড়ে কোন রুশ অধিবাসীর মনে দুঃখ, অসন্তোষ ও বিহ্বলতার একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি জাগেনি? আমাদের তিন তিনটি বাহিনী যখন যথেষ্ট সংখ্যাধিক্য নিয়ে ফরাসিদের ঘিরে ধরেছিল, ক্ষুধার্ত ও শীতার্ত বিশৃঙ্খল ফরাসিরা যখন দলে দলে আত্মসমর্পণ করছিল, যখন (ইতিহাসকারদের বিবরণ মতে) রুশদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ফরাসিদের প্রতিরোধ করা, তাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলা এবং সব্বাইকে গ্রেপ্তার করা,-তখন সব ফরাসিদের কেন গ্রেপ্তার বা ধ্বংস করা হয়নি, এ প্রশ্ন নিজের কাছে কে না করেছে।
এটা কি করে ঘটল যে, রুশ বাহিনী যখন সংখ্যায় ফরাসিদের তুলনায় দুর্বলতর ছিল তখন তারা বরদিনোতো লড়তে পারল, আর যখন তারা তিন দিক থেকে ফরাসিদের ঘিরে ফেলল, যখন তাদের গ্রেপ্তার করাই ছিল তাদের লক্ষ্য, তখন তারা সে উদ্দশ্যে সিদ্ধ করতে পারল না? ফরাসিরা কি আমাদের চাইতে এত বেশি উঁচুদরের যোদ্ধা যে অধিক সংখ্যক সৈন্য নিয়ে ঘিরে ফেলেও আমরা তাদের মারতে পারিনি? সেটা ঘটল কেমন করে?
এই সব প্রশ্নের উত্তরে ইতিহাস (অথবা ঐ নামে যাকে ডাকা হয়) বলে, এটা ঘটেছিল কারণ কুতুজভ এবং তর্মাস এবং চিচাগভ এবং অমুক লোক ও তমুক তোক অমুক-তমুক রণ-কৌশলকে কার্যে পরিণত করেনি…
কিন্তু কেন তারা তা করেনি? আর পূর্ব-ব্যবস্থা অনুযায়ী কোনো লক্ষ্যকে কার্যে পরিণত না করার অপরাধে যদি তারা অপরাধী হয়ে থাকে, তাহলে কেন তাদের বিচার হল না, শাস্তি হল না? কিন্তু একথা যদি স্বীকার করেও নেওয়া যায় যে কুতুজভ, চিচাগভ ও অন্যরাই রুশ ব্যর্থতার কারণ তাহলেও তো এটা দুর্বোধ্যই থেকে যায় যে ক্রাসনু ও বেরিজিনাতে (দু জায়গাতেই আমাদের সৈন্যসংখ্যা বেশি ছিল) রুশ বাহিনী সুবিধাজনক অবস্থাতে থেকেও কেন রুশদের লক্ষ্য অনুযায়ী মার্শালগণ, রাজন্যবর্গ ও সম্রাটসহ গোটা ফরাসি বাহিনীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
কুতুজভ আক্রমণের পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল এই কথা বলে রুশ সামরিক ইতিহাসকাররা এই অদ্ভুত ঘটনার যে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে সেটাও ভিত্তিহীন, কারণ আমরা জানি ভিয়াজমায় এবং তারুতিনোতে কুতুজভ সেনাদলকে আক্রমণ থেকে বিরত রাখতে পারেনি।
যে রুশ বাহিনী অনেক কম শক্তি নিয়ে বরদিনোতে পূর্ণ শক্তিতে শক্তিমান শত্রুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে পারল, কেন তারা ক্রাস ও বেরিজিনাতে অধিকতর শক্তিশালী পক্ষ হওয়া সত্ত্বেও বিশৃঙখল ফরাসিদের হাতে মার খেল?
শত্রুপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করে নেপোলিয়ন ও তার মার্শালদের গ্রেপ্তার করাই যদি রুশদের লক্ষ্য ছিল-সে লক্ষ্য যে ব্যর্থ হয়েছে তাই নয়, সে উদ্দেশ্য সাধনের প্রতিটি চেষ্টা অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে প্রতিহত হয়েছে–তাহলে তো অভিযানের এই শেষ পর্যায়কে ফরাসিরা যে তাদের জয়ের পর জয় বলে মনে করে সেটাই ঠিক, আর রুশ ইতিহাসকাররা যে সেটাকে আমাদের জয় বলে মনে করে সেটাই সম্পূর্ণ ভুল।
