.
অধ্যায়-১৭
মস্কো থেকে নিয়েমেন ফিরবার পথে রুশ ও ফরাসি বাহিনীর গতিবিধি ছিল অনেকটা কানা রুশোর কানামাছি খেলারই মতো। সেই খেলায় দুজন খেলুড়ের চোখ বেঁধে দেওয়া হয়, তাদের মধ্যে একজন মাঝে মাঝে একটা ছোট ঘন্টা বাজিয়ে নিজের অবস্থান জানিয়ে নেয়। প্রথমে সে ঘণ্টা বাজায় নির্ভয়ে, কিন্তু কোনো শক্ত কোণে আটকা পড়লে যথাসম্ভব নিঃশব্দে সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে চেষ্টা করে, আর প্রায়ই পালাতে গিয়ে সোজা প্রতিপক্ষের হাতের মধ্যে ধরা পড়ে যায়।
প্রথমে কালুগা রোড ধরে যাবার সময় নেপোলিয়নের সৈন্যরা সকলকে তাদের উপস্থিতি জানিয়েই চলতে লাগল, কিন্তু পরে মোলেনস্ক রোডে পৌঁছে তারা ঘণ্টার ঘুন্টিটা চেপে ধরে ছুটতে লাগল এবং পালাতে গিয়ে সোজা রুশদের খপ্পরে ধরা পড়ল।
একটা সেনাদল পালাচ্ছে, অপর সেনাদল তাদের পিছু নিয়েছে। স্মোলেনস্ক ছাড়িয়ে ফরাসিদের সামনে কয়েকটা ভিন্ন ভিন্ন পথ খোলা ছিল। সহজেই মনে করা যেতে পারে যে সেখানে চারদিন অবস্থানের সময় ফরাসি বাহিনী নিশ্চয় শত্রুপক্ষের উপস্থিতি জানতে পারত, আরো সুবিধাজনক কোনো ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে পারত, এবং নতুন কোনো পথের কথা ভাবতে পারত। কিন্তু চারদিন বিশ্রামের পরে কোনোরকম পরিকল্পনা বা কৌশল ছাড়াই তারা চিরাচরিত পথ ধরে ছুটতে আরম্ভ করল, বায়েও গেল না, ডাইনেও গেল না, সোজা এগিয়ে গেল ক্রাসনু ও ওর্শার ভিতর দিয়ে সব চাইতে খারাপ পুরোনো রাস্তাটা ধরে।
শত্রু সম্মুখ দিক থেকে আসবে না, আসবে পিছন থেকে–এই আশায় ফরাসিরা পালাবার পথে এত দূরে ছড়িয়ে পড়ল যে অনেক জায়গায় তাদের পরস্পরের দূরত্ব চব্বিশ ঘণ্টাকেও ছাড়িয়ে গেল। প্রথমে সম্রাট, পরে রাজন্যবর্গ, তারপরে ডিউকরা–তাদের সামনে সকলেই পালাচ্ছে। নীপার পেরিয়ে নেপোলিয়ন ডান দিকের রাস্তা ধরবে-সেটাই তার পক্ষে যুক্তিসঙ্গত কাজ হত–এই আশায় রুশ বাহিনী ডাইনে মোড় নিয়ে ক্রাসনুতে গিয়ে বড় রাস্তায় পড়ল। আর কানামাছি খেলার মতোই ফরাসিরা এসে আমাদের অগ্রবর্তী বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে পড়ল। অপ্রত্যাশিতভাবে শত্রুকে দেখতে পেয়ে ফরাসিরা হতভম্ব হয়ে গেল, আকস্মিক ভয়ে থমকে দাঁড়াল, কিন্তু তার পরেই পিছনের বন্ধুদের ফেলে রেখে নতুন করে পালাতে শুরু করল। তারপর তিনদিন ধরে ফরাসি বাহিনীর ভিন্ন ভিন্ন শাখা-প্রথমে মুরাতের দল, তারপর দাভুতের দল, এবং তারপর নে-র দল-সকলেই রুশ বাহিনীর মুঠোর মধ্যে পড়ে গেল। তারা পরস্পরকে ছেড়ে গেল, ভারি মালপত্র, কামান বন্দুক এবং অর্ধেক সৈন্য ফেলে রেখে ডান দিকে অর্ধবৃত্তাকারে রাতের অন্ধকারে রুশ বাহিনীর পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
সকলের শেষে এল নে, কারো পথে না পড়লেও সে স্মোলেনস্কের দেয়ালগুলো উড়িয়ে দিতে লাগল, কারণ ঐ দেয়ালের গায়ে ধাক্কা খেয়ে সে দেয়ালকেই শাস্তি দিতে চাইল। দশ হাজার সৈন্য ছিল নে-র অধীনে, কিন্তু ওর্শাতে সে নেপোলিয়নের কাছে পৌঁছল মাত্র এক হাজার সৈন্য নিয়ে, বাকি সব সৈন্য ও কামান-বন্দুক সে ফেলে এসেছে, একটা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে রাতের অন্ধকারে আত্মগোপন করে সে নিপার নদী পার হয়ে এসেছে।
ওর্শা থেকে ভিলনা রোড ধরে তারা আরো দূরে পালাতে লাগল, পশ্চাদ্ধাবনকারী সৈন্যদের সঙ্গে তখনো চলল তাদের কানামাছি খেলা। বেরিজিনাতে তারা আবার দলছুট হয়ে পড়ল, অনেকে নদীতে ডুবে মরল, অনেকে আত্মসমর্পণ করল, আর যারা নদী পার হতে পারল তারা পালিয়ে গেল আরো দূরে। তাদের সর্বাধিনায়ক লোমের কোট পরে স্নেজে চেপে একাই ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল, পিছনে রেখে গেল সঙ্গীসাথীদের। আরো যারা পারল তারাও চলে গেল, আর যারা পারল না তারা হয় আত্মসমর্পণ করল, নয় তো মরল।
.
অধ্যায়-১৮
এ অভিযান যেন ফরাসিদের পলায়নেরই বৃত্তান্ত, এতে তারা যেন যথাশক্তি আত্মহননেই মেতে উঠল। যেদিন তারা কালুগা রোড ধরল সেদিন থেকে তাদের নেতার সেনাবাহিনী থেকে পলায়নের দিন পর্যন্ত তাদের গতিবিধি ছিল একেবারেই অর্থহীন। সুতরাং লোকে একথা ভাবতে পারত, যে ইতিহাসকাররা মনে করে যে একটি মানুষের ইচ্ছাই জনতার কর্মধারাকে নিয়ন্ত্রিত করে তাদের পক্ষে এই সময়কার পশ্চাদপসরণের বাহিনীকে তাদের মতবাদের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। কিন্তু না! এই অভিযান সম্পর্কে ইতিহাসকাররা পাহাড়প্রমাণ বই লিখেছে, আর সর্বত্রই বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে নেপোলিয়নের সুব্যবস্থা, তার সমর-কৌশল, সৈন্যপরিচালনার সুষ্ঠু পরিকল্পনা, এবং তার মার্শালদের সামরিক প্রতিভার কথা।
একটি রসদ-সমৃদ্ধ অঞ্চলে যাবার রাস্তা খোলা ছিল, পরবর্তীকালে কুতুজভ যে রাস্তা বরাবর তার পশ্চাদ্ধাবন করেছিল সেই সমান্তরাল রাস্তাটাও ভোলা ছিল, তবু নেপোলিয়ন যে মালো-ইয়ারোস্লাভেৎস থেকে পশ্চাদপসরণের সময় অপ্রয়োজনে একটা বিধ্বস্ত রাস্তা ধরে পশ্চাদপসরণ করেছিল তার ব্যাখ্যাস্বরূপ আমাদের বলা হয়েছে যে গভীর বিচার-বিবেচনাই নাকি তার কারণ। তার সম্মালেনস্ক থেকে ওশা পর্যন্ত পশ্চাদপসরণের পক্ষেও সেই একই গভীর বিচার-বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। তারপর বর্ণনা করা হয়েছে ক্রাসনুতে তার বীরত্বের। বলা হয়েছে, সেখানে সে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুত ছিল, ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতেও রাজি ছিল, আর একটা বার্চের ডাল হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলেছিল :
