কসাক ও হুজারদের জড়িয়ে ধরে বুড়ো সৈন্যরা কেবলই কাঁদছে আর বলছে, ভাইরা আমার প্রিয়জন আমার! আদরের মানিক আমার!
হুজার ও কসাকরা বন্দিদের চারপাশে ভিড় করে দাঁড়াল। কেউ তাদের পোশাক দিল, কেউ বুট দিল, কেউ বা দিল রুটি। তাদের মাঝখানে বসে পিয়েরও ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল, একটা কথাও বলতে পারল না। প্রথম যে সৈনিকটি তার কাছে এগিয়ে এল তাকেই বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে চুমো খেতে লাগল।
বিধ্বস্ত বাড়িটার ফটকে দাঁড়িয়ে আছে দলখভ। নিরস্ত্র ফরাসিরা ভিড় করে চলে যাচ্ছে তার সামনে দিয়ে। উত্তেজিত ফরাসিরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু দলখভের চোখের দিকে তাকিয়ে তারা চুপ করে গেল। বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে আছে তার কসাক, বন্দিদের গুণছে, আর প্রতি একশো জন গোণা হয়ে গেলে খড়ি দিয়ে ফটকে একটা করে দাগ দিচ্ছে।
দলখভ কসাককে শুধাল, কতজন হল?
দ্বিতীয় শত হল, কসাক জবাব দিল।
দলখভ অনবরত বলছে, ফাইলেজ, ফাইলেজ! (এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও!) কথাটা সে ফরাসিদের কাছ থেকে শিখেছে। বন্দিদের চোখে চোখ পড়তেই তার দুচোখ একটা নিষ্ঠুর আলো ঝিলিক দিয়ে উঠছে।
বাগানে একটা গর্ত খোঁড়া হয়েছে। কসাকরা পেতয়া রশুভের মৃতদেহটা সেখানে বয়ে নিয়ে চলেছে। খালি মাথায়, বিষণ্ণ মুখে দেনিসভ চলেছে তাদের পিছনে পিছনে।
.
অধ্যায়-১৬
২৮ অক্টোবরের পরে প্রথম বরফ পড়তে আরম্ভ হলে ফরাসিদের পলায়ন আরো শোচনীয় আকার ধারণ করল। লোকগুলো বরফে জমে যেতে লাগল, অনেকে শিবির-আগুনে ঝলসেই মারা পড়ল। ওদিকে লোমের পোশাক পরা লোকদের নিয়ে গাড়ির পর গাড়ি চলতে লাগল। সম্রাট, রাজন্যবর্গ, ডিউকবৃন্দ যে যা চুরি করেছিল সব গেল সেইসব গাড়িতে, কিন্তু ফরাসি বাহিনীর পলায়ন ও ভাঙন আগের মতোই চলতে লাগল।
রক্ষীবাহিনীকে না ধরেই (গোটা যুদ্ধের সময় তারা লুটতরাজ ছাড়া আর কিছুই করেনি) ফরাসি বাহিনীর মোট সৈন্যসংখ্যা ছিল তিয়াত্তর হাজার। মস্কো থেকে ভিয়াজমা যেতেই সে সৈন্যসংখ্যা কমে দাঁড়াল ছত্রিশ হাজার, যদিও যুদ্ধে মারা পড়েছে অনধিক পাঁচ হাজার মাত্র। এইভাবে শুরু করে পরবর্তীকালে সৈন্যসংখ্যা হ্রাসের হারটা গণিতিক নিয়মেই নির্ধারণ করা যেতে পারে। শীতের তীব্রতার হ্রাস-বৃদ্ধি, পশ্চাদঅনুসরণ, পথের প্রতিবন্ধকতা, বা অন্য বিশেষ কারণগুলি ছাড়াই মস্কো থেকে ভিয়াজমা, ভিয়াজমা থেকে ঘোলেন, স্মোলেনস্ক থেকে বেরিজিনা এবং বেরিজিনা থেকে ভিলনা-সর্বস্তরে ফরাসি বাহিনী একই হারে মরে গেল, ধ্বংস হয়ে গেল। ভিয়াজমার পর থেকে ফরাসি বাহিনী তিন সারির পরিবর্তে এক সারিতে ভিড় করতে লাগল এবং শেষপর্যন্ত সেইভাবেই চলল। বের্থিয়ের তার অবস্থা বর্ণনা করতে সম্রাটকে এই রকম লিখল (এখন আমরা জেনেছি একটি সেনাবাহিনীর অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে একজন অধিনায়ক অফিসার সত্য থেকে কতদূরে সরে যেতে পারে) :
গত দু-তিন দিনের যাত্রাপথের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন সেনাদলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তাদের অবস্থা সম্পর্কে সম্রাটের কাছে একটা প্রতিবেদন পাঠানো আমি আমার কর্তব্য বলে মনে করি। তারা প্রায় দলছুট হয়ে পড়েছে। সৈন্যদের এক-চতুর্থাংশও তাদের রেজিমেন্টের পতাকাতলে সমবেত আছে কি না সন্দেহ, বাকিরা যার যেদিকে খুশি চলেছে, নিয়ম-শৃঙ্খলার হাত এড়িয়ে খাদ্য-সম্প্রহের আশাতেই তারা ছুটছে। সাধারণভাবে তারা মনে করে যে স্নোলেনই একমাত্র স্থান যেখানে তাদের অবস্থার উন্নতি হবার আশা আছে। গত কয়েক দিনে দেখা গেছে, অনেক সৈন্য তাদের কার্তুজ ও অস্ত্রশস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, আপনার চূড়ান্ত পরিকল্পনা যাই হোক না কেন, ইয়োর ম্যাজেস্ট্রির সেবার স্বার্থেই এটা জরুরি যে গোটা বাহিনীকে মোলেনকে সমবেত করা হোক, এবং যেসব অশ্ববিহীন অশ্বারোহী সৈন্য, অপ্রয়োজনীয় মালপত্র ও গোলন্দাজ বাহিনীর মালপত্র এখন আর সৈন্যসংখ্যার সমানুপাতিক নয় সেইসব অকার্যকর বোঝার হাত থেকে সেনাবাহিনীকে মুক্ত করা হোক। সৈন্যরা ক্ষুধায় ও ক্লান্তিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নতুন করে খাদ্য সরবরাহ ও কয়েক দিনের বিশ্রাম তাদের দরকার। এই কয়দিনে রাস্তায় অথবা সাময়িক আস্তানায় অনেকে মারা গেছে। পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে, ভয় হয় জরুরি প্রতিকারের ব্যবস্থা না হলে নতুন করে যুদ্ধ বাধলে সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না।
৯ নভেম্বর : স্মোলেনস্ক থেকে ত্রিশ ভার্স্ট দূরে।
স্খলিত পায়ে কোনোরকমে স্মোলেনস্কের স্বর্গরাজ্যে পৌঁছে খাদ্যের সন্ধানে বিফলমনোরথ হয়ে ফরাসিরা পরস্পরকে খুন করল, নিজেদের খাদ্য লুট করল, এবং সবকিছু লুট করা শেষ হবার পরে আরো দূরে পালিয়ে গেল।
কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কিছুই জানে না। প্রতিভাধর নেপোলিয়ন জানত আরো কম, কারণ তার কাছে কেউ কোনো নির্দেশ পাঠায়নি। তথাপি সে নিজে এবং তার আশপাশের লোকরা তাদের পুরনো অভ্যাসমতোই চলতে লাগল : হুকুম জারি করল, চিঠি লিখল, প্রতিবেদন পাঠাল, দৈনিক নির্দেশও ঘোষণা করল, একে অন্যকে Sire, mon, prince d Eckmul, roi de Naples ইত্যাদি বলে সম্বোধনও করল। কিন্তু এইসব হুকুম ও প্রতিবেদন শুধু কাগজেই রইল, তার কিছুই কার্যে পরিণত করা হল না, কারণ কার্যে পরিণত করা সম্ভব ছিল না। যদিও একে অন্যকে ম্যাজেস্ট্রি, হাইনেস, বা কাজিন বলে ডাকত, তবু তারা সকলেই জানত যে তারা অতি শোচনীয় জীব, অনেক অন্যায় তারা করেছে, আর এখন তার জন্য মাশুল গুণতে হচ্ছে। সেনাবাহিনীর প্রতি দরদ দেখাবার ভান করলেও আসলে প্রত্যেকেই ভাবছে শুধু নিজের কথা, ভাবছে কত শীঘ্র এখান থেকে পালিয়ে নিজেকে বাঁচাবে।
