তোমার চিঠি আসার আগেই কাউন্ট বেজুখভের মৃত্যু-সংবাদ আমরা পেয়েছি; বাবা তাতে খুবই বিচলিত হয়েছেন। তিনি বলেছেন, কাউন্ট ছিলেন একট মহান শতাব্দীর একজন ব্যথীত শেষ প্রতিনিধি; এবার তার পালা, কিন্তু সে পালা যাতে যথাসম্ভব দেরিতে আসে সে জন্য তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন। সেই ভয়ংকর দুর্ভাগ্যের হাত থেকে ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন!
পিয়ের সম্পর্কে তোমার সঙ্গে আমি একমত হতে পারছি না; শিশুকাল থেকে তাকে আমি চিনি। চিরকালই আমার মনে হয়েছে যে সে একটি মহৎ হৃদয়ের অধিকারী, আর মানুষের এই গুণটিকেই আমি সবচাইতে বেশি মূল্য দিয়ে থাকি। তার উত্তরাধিকার এবং প্রিন্স ভাসিলির ভূমিকা সম্পর্কে বলি, দুজনের পক্ষেই ব্যাপারটা দুঃখের। হায় প্রিয় বন্ধু, আমাদের স্বর্গীয় উদ্ধারকর্তার সেই বাণী–একটি উট যদি বা ছুঁচের ছিদ্রের ভিতর দিয়ে যেতে পারে, কোনো ধনী কদাপি ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করতে পারে না–যা ভয়ংকরভাবে সত্য। প্রিন্স ভাসিলির জন্য আমার দুঃখ হয়, কিন্তু ততোধিক দুঃখ হয় পিয়েরের জন্য। এত অল্প বয়স আর এত সম্পদের ভার-কত না প্রলোভন তার সামনে হারি হবে! আমাকে যদি কেউ শুধায়, পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি করে আমি কি চাই তো আমি চাইব-দরিদ্রতম ভিক্ষুকের চাইতেও দরিদ্রতর হতে। প্রিয় বন্ধু, মস্কোতে এত সাফলমণ্ডিত যে বইখানি তুমি আমাকে পাঠিয়েছ তার জন্য হাজার ধন্যবাদ। তথাপি যেহেতু তুমি লিখেছ যে অনেক ভালো কথার মধ্যে বইটিতে এমন সব কথা আছে, আমাদের দুর্বল মানবিক বুদ্ধি যার নাগাল পায় না, সেইহেতু আমার মনে হয়, যা দুর্বোধ্য এবং সে কারণে ফলপ্রসূ হতে পারে না তা পড়ে সময় নষ্ট করা বৃথা। মরমীয়াবাদ সংক্রান্ত বইগুলি মানুষের মনকে শুধু সন্দেহগ্রস্ত করে তোলে, তাদের কল্পনাকে উত্তেজিত করে; ফলে খৃস্টিয় সরলতার পরিবর্তে তাদের মনে সবকিছুকে বাড়িয়ে দেখবার একটা প্রবণতা জন্মে। এইভাবে কিছু লোক কেন যে তাদের চিন্তাশক্তিকে গুলিয়ে ফেলতে ভালোবাসে আমি তা বুঝতে পারি না। তার চাইতে আমরা কেন পত্রাবলি ও সুভাষিতাবলি পড়ি না। তাদের মধ্যে রহস্যময় যা কিছু আছে তার মধ্যে প্রবেশের চেষ্টা যেন আমরা না করি; আমরা তো শোচনীয় পাপীর দল; যে রক্ত-মাংসের দেহ আমাদের ও চিরশাশ্বতের মধ্যে একটা দুর্ভেদ্য যবনিকা রচনা করে আছে যতদিন আমরা তার মধ্যে বাস করছি ততদিন ঈশ্বরের সব ভয়ংকর ও পবিত্র গোপন কথাকে আমরা কেমন করে জানব? তার চাইতে এই মরজগতে আমাদের পথ দেখাবার জন্য স্বর্গীয় পরিত্রাতা যে সব মহৎ বিধান আমাদের জন্য রেখে গেছেন তার পঠন-পাঠনের মধ্যে নিজেদের সীমিত রাখাই তো আমাদের পক্ষে বাঞ্ছনীয়। আমাদের চেষ্টা করতে হবে সেই সব বিধান মেনে তাকে অনুসরণ করে চলতে; আমাদের বুঝতে হবে যে মানুষের দুর্বল মনের সুতোকে আমরা যত অল্প ছাড়ব ততই আমরা ঈশ্বরকে খুশি করতে পারব। যে জ্ঞান ঈশ্বর থেকে আগত নয় তাকে তিনি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেন। আর যে রহস্যকে তিনি কৃপা করে আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছেন তাকে পরিমাণ করতে আমরা যত অল্প চেষ্টা করব ততই তিনি তাঁর ঐশ্বরীয় আবির্ভাবের ভিতর দিয়ে সেই রহস্যকে উন্মোচন করবেন।
আমার বাবা কোনো বরের কথা আমাকে বলেন নি, তবে এ কথা বলেছেন যে প্রিন্স ভালিসির চিঠি তিনি পেয়েছেন এবং আশা করছেন যে প্রিন্স এখানে আসবেন। আমার বিয়ের এই প্রস্তাব সম্পর্কে তোমাকে বলতে চাই যে বিয়েকে আমি এমন একটি ঐশ্বরিক অনুষ্ঠান বলে মনে করি যাকে মেনে চলা কর্তব্য। সর্বশক্তিমান যদি স্ত্রী ও মা হবার কর্তব্য আমার উপর চাপিয়ে দেন তাহলে আমার পক্ষে যত দুঃখদায়কই হোক না কেন সে কর্তব্যকে যথাযথভাবে পালন করতেই আমি চেষ্টা করব; স্বামী হিসেবে তিনি যাকেই আমার কাছে পাঠাবেন তার প্রতি আমার মনোভাবের কথা বিচার করে নিজেকে বিচলিত করে তুলব না।
ভাইয়ের কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছি; লিখেছে, শিগগিরই বৌকে নিয়ে বন্ড হিলসে আসবে। অবশ্য এ আনন্দ খুবই অল্প দিনের, কারণ এই দুঃখের যুদ্ধে অংশ নিতে সে আবার চলে যাবে। এ যুদ্ধে যে কীভাবে । আর কি কারণে আমরা জড়িয়ে পড়েছি তা ঈশ্বরই জানেন। যে কর্মব্যস্ত জগতের একেবারে মাঝখানে তোমরা রয়েছ শুধু যে সেখানেই যুদ্ধের কথা চলছে তাই নয়, এখানে, এই ক্ষেত-খামারের কাজ ও শান্ত প্রকৃতির মধ্যে-শহরের লোকরা যাকে দেশের মূল বৈশিষ্ট্য বলে মনে করে সেখানেও যুদ্ধের গুজব ছড়াচ্ছে আর আমরা তা মর্মে মর্মে বুঝছি। বাবা তো শুধু অভিযান আর পাল্টা অভিযানের কথাই বলেন; আমি তার কিছুই বুঝি না। গতকালের আগের দিন গ্রামের পথে দৈনন্দিন ভ্রমণের সময় একটা মর্মভেদী দৃশ্য দেখেছি…আমাদের অঞ্চল থেকে বলপূর্বক সংগৃহীত একদল সৈনিক চলেছে যুদ্ধে যোগ দিতে। যারা যাচ্ছে তাদের মা, বৌ ও ছেলেমেয়েদের অবস্থা যদি দেখতে, তাদের ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কান্না যদি শুনতে! মনে হল, যে স্বর্গীয় ত্রাণকর্তা প্রেম ও ক্ষমার বাণী প্রচার করেছেন তাঁর বিধান বুঝি মানুষ ভুলে গেছে পরস্পরের হানাহানির কৌশলকে দিচ্ছে সর্বাধিক মূল্য।
বিদায়, প্রিয় বন্ধু; আমাদের স্বর্গীয় ত্রাণকর্তা ও তাঁর পরম পবিত্র জননী তাঁদের পবিত্র ও সর্বক্ষম যন্ত্র দিয়ে তোমাকে ঘিরে রাখুন!-মারি।
