কারাতায়েভ যেখানে বসেছিল তার পিছনে কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করছে। পিয়ের ভাবল, জানোয়ারটা কী বোকা! এরকম ঘেউ ঘেউ করছে কেন?
যেখানে গুলিটা ছোঁড়া হয়েছে এবং ককুরটা ডাকছে, পিয়েরের বন্ধু কয়েদি-সৈনিকরা কিন্তু পিয়েরের মতো সেদিকে মোটেই তাকাল না, কিন্তু তাদের সকলের দৃষ্টিই তখন কঠিন হয়ে উঠেছে।
.
অধ্যায়-১৫
ভাণ্ডার, বন্দি ও মার্শালের মালপত্রবাহী গাড়ি সবই শামশোভা গ্রামে থামল। সকলেই শিবির-আগুন ঘিরে বসে পড়ল। পিয়ের আগুনের কাছে গিয়ে খানিকটা ঝলসানো শূকর মাংস খেল, তারপর আগুনের দিকে পিঠ দিয়ে শোয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়ল। বরদিনোর যুদ্ধের পরে মোঝায়েস্কের মতোই এখানেও সে আবার ঘুম দিল।
আবারও সত্য ও কল্পনা একাকার হয়ে গেল, আবারও সে অন্য কেউ তার চিন্তাকে ভাষা দিল, হয় তো বা সেই একই চিন্তা যা ভাষা পেয়েছিল মোঝয়েকে তার স্বপ্নের ভিতর দিয়ে।
জীবনই সব। জীবনই ঈশ্বর। সবকিছু বদলায়, এগিয়ে চলে আর সেই এগিয়ে চলাই ঈশ্বর। যতক্ষণ জীবন আছে ততক্ষণই আনন্দ আছে ঈশ্বর-চেতনার মধ্যে। জীবনকে ভালোবাসাই ঈশ্বরকে ভালোবাসা। যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে, নির্দোষ যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে এই জীবনকে ভালোবাসাই তো অন্য সবকিছু অপেক্ষা কঠিন ও পবিত্র।
কারাতায়েভ! পিয়েরের মনে পড়ে গেল।
হঠাৎ সে যেন চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পেল সেই দীর্ঘবিস্মৃত সদয় বৃদ্ধটিকে যে তাকে সুইজারল্যান্ডে ভূগোল শিখিয়েছিল। একটু সবুর কর, বলে বুড়ো মানুষটি তাকে একটা ভূ-গোলক দেখাল। এই ভূ গোলকটি জীবন্ত–কোনো নির্দিষ্ট আয়তনবিহীন একটি স্পন্দনশীল গোলক। অনেকগুলি বিন্দুকে পর পর চেপে তার পরিধি গড়ে তোলা হয়েছে, সেই বিন্দুগুলি পরিবর্তিত হয় ও স্থান পরিবর্তন করে, কখনো কয়েকটি মিলে একটি হয়ে যায়, আবার কখনো একটি ভেঙে অনেকগুলি হয়ে যায়। প্রতিটি বিন্দু ছড়িয়ে পড়ে যত বেশি সম্ভব স্থান দখল করতে চেষ্টা করে, কিন্তু ঐ একই কাজ করতে গিয়ে অন্য বিন্দুগুলি সেটাকে চেপে ধরে, অনেক সময় সেটাকে ধ্বংস করে ফেলে, আবার অনেক সময় সেটার সঙ্গে মিশে যায়।
এই তো জীবন, বুড়ো শিক্ষক বলল।
পিয়ের ভাবল, কথাটা কত সরল ও পরিষ্কার। আগে কেন যে এটা বুঝিনি?
ঈশ্বর আছেন কেন্দ্রে, প্রতিটি বিন্দু এমনভাবে প্রসারিত হতে চায় যাতে তাঁকে যথাসম্ভব বেশি করে প্রতিবিম্বিত করা যায়। প্রতিটি বিন্দু বড় হয়, মিশে যায়, উপর থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়, অতলে তলিয়ে যায়, আবার ভেসে ওঠে। ঐ তো ওখানে, কারাতায়েত নিজেকে প্রসারিত করে অদৃশ্য হয়ে গেছে। বুঝতে পারছ বাবা? শিক্ষক বলল।
বুঝতে পারছ হে গাড়োল? কে যেন চিৎকার করে উঠল, পিয়েরের ঘুম ভেঙে গেল।
সে উঠে বসল। একটি ফরাসি এইমাত্র একজন রুশ সৈন্যকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে আগুনের পাশে বসে পড়ে একটা শিকের সাহায্যে একটুকরো মাংস ঝলসাচ্ছে। তার আস্তিন গোটানো, পেশীবহুল লোমশ লাল হাতের বেঁটে আঙুল দিয়ে বেশ সুকৌশলে শিকটাকে ঘোরাচ্ছে। পোড়া কয়লার আভায় তার বাদামি বিষণ্ণ মুখ ও ভ্রুকুটিকুটিল ভুরু দুটো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
যে সৈন্যটি তার পিছনে দাঁড়িয়েছিল তার দিকে ফিরে বিড়বিড় করে বলল, ওর পক্ষে সবই সমান। ডাকাত কোথাকার! পালাও!
শিকটা ঘোরাতে ঘোরাতে সে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে পিয়েরের দিকে তাকাল। পিয়েরর মুখ ঘুরিয়ে অন্ধকারের দিকে চোখ ফেলল। ফরাসিটি যে রুশ সৈন্যটিকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে সে আগুনের কাছে বসে হাত দিয়ে যেন কার গায়ে চাপড় মারছে। আরো ভালো করে পিয়ের নীল-ধূসর কুকুরটাকে চিনতে পারল, সৈন্যটির পাশে বসে সে লেজ নাড়ছে।
আহা, ও কি এসে গেছে। কিন্তু প্লাতন– বলতে গিয়েও সে কথাটা শেষ করতে পারল না।
সহসা একযোগে অনেক স্মৃতি কল্পনায় তার মনের মধ্যে ভিড় করে এলগাছের নিচে বসে প্লাতন যেভাবে তার দিকে তাকিয়েছিল, সেখান থেকে আসা যে গুলির শব্দ সে শুনেছিল, কুকুরটার ঘেউ-ঘেউ, তাকে পাশ কাটিয়ে ছুটে যাওয়া দুটি ফরাসি সৈনিকের অপরাধী মুখ, নিচে নামানো ধূমায়মান বন্দুক, এখানে কারায়েভের অনুপস্থিতিসে যেন প্রায় বুঝে ফেলেছে যে কারাতায়েভকে মেরে ফেরেছে, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, কেন তা সে জানে না, পিয়েরের মনে পড়ে গেল আর একটি গ্রীষ্ম-সন্ধ্যার স্মৃতি যেদিনটা সে তার কিয়েভের বাড়ির বারান্দায় একটি সুন্দরী পুলিশ মহিলার সঙ্গে কাটিয়েছিল। দিনের ঘটনাগুলিকে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা না করে, অথবা তার থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না টেনে পিয়ের চোখ বুঝল, গ্রীষ্মকালীন পল্লীর একটা দৃশ্য তার চোখের সামনে ভেসে উঠল, তার সঙ্গে মিশল জলে নেমে স্নানের স্মৃতি, একটি স্পন্দনশীল ভূ গোলকের স্মৃতি, আর সঙ্গে সঙ্গে সে এমনভাবে ডুবে গেল যেন জলস্রোত এসে তার মাথার উপর দিয়ে বয়ে গেল।
সূর্যোদয়ের আগেই চিৎকার-চেঁচামেচি ও ঘন ঘন বন্দুকের শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। ফরাসি সৈন্যরা ছুটে পালাচ্ছে।
তাদের একজন চেঁচিয়ে বলল, কসাকরা এসেছে! মুহূর্তকাল পরে একদল রুশ পিয়েরকে ঘিরে দাঁড়াল।
কি যে ঘটে যাচ্ছে অনেকক্ষণ পর্যন্ত সে তা বুঝতেই পারল না। শুধু শুনতে পেল, চারদিকে তার বন্ধুরা আনন্দে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
