কারাতায়েভ থামল, স্মিত হেসে আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল, দুটো পা জুড়ে নিল।
আর বুড়ো মানুষটা বলল, ঈশ্বর তোমাকে ক্ষমা করবেন, তার চোখে আমরা সকলেই পাপী। আমার নিজের পাপের ফলই আমি ভোগ করছি, এইবলে সে খুব কাঁদতে লাগল। আচ্ছা, তোমার কি মনে কর বন্ধুরা? কারাতায়েভ প্রশ্ন করল, উচ্ছ্বসিত হাসিতে তার মুখটা আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন এখন সে যা বলল তার মধ্যেই রয়েছে এই গল্পের প্রধান আকর্ষণ ও পুরো অর্থ। তোমরা কি মনে কর প্রিয় বন্ধুরা? সেই খুনী কর্তৃপক্ষের কাছে দোষ স্বীকার করল। বলল, আমি ছজনের প্রাণ নিয়েছি, (লোকটা মহাপাপী) কিন্তু আমি সব চাইতে বেশি দুঃখিত এই বুড়ো মানুষটির জন্য। তাকে আর কষ্ট দেবেন না। এইভাবে সে নিজের দোষ স্বীকার করল, সব লিখে দেওয়া হল, যথাসময়ে কাগজপত্র পাঠানো হল। জায়গাটা অনেক দূরে, নানা প্রশ্ন নিয়ে বিচার-বিবেচনা চলতে লাগল, যথারীতি কাগজ ভরে গেল, এদিকে সময় পার হতে লাগল। সমস্ত ব্যাপারটা জারের কাছে গেল। কিছুদিন পরে জারের নির্দেশ এল : বণিককে মুক্তি দেওয়া হোক এবং ঘোষণানুযায়ী ক্ষতিপূরণও দেওয়া হোক। কাগজপত্র এলে তারা বুড়ো মানুষটিকে খুঁজতে লাগল। যে নির্দোষ বুড়ো মানুষটি অকারণে কষ্টভোগ করছিল সে কোথায়? জারের কাছ থেকে একখানা কাগজ এসেছে। তারা লোকটিকে খুঁজতে লাগল। এইখানে কারায়েভের নিচের চোয়ালটা কাঁপতে লাগল। কিন্তু ইতিমধ্যেই সে ঈশ্বরের ক্ষমা পেয়ে গেছে–লোকটি মারা গেছে। এই হল ব্যাপার! কথা শেষ করে কারাতায়েভ স্মিত হেসে নীরবে বহুক্ষণ সামনের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর পিয়েরের অন্তর অস্পষ্টভাবে কিন্ত আনন্দের সঙ্গে ভরে উঠল গল্পের জন্য নয়, তার রহস্যময় তাৎপর্যের জন্য : বলতে বলতে কারায়েভের মুখখানি যে উচ্ছ্বসিত আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে এবং সেই আনন্দের যে অতীন্দ্রিয় তাৎপর্য আছে তাতেই ভরে উঠল তার অন্তর।
.
অধ্যায়–১৪
যার যার জায়গায়! হঠাৎ একটা উচ্চ কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
পাহারাদার সেনাদল ও বন্দিদের মধ্যে উত্তেজনার একটা মধুর অনুভূতি এবং আনন্দময় গম্ভীর কোনো কিছুর প্রত্যাশা দেখা দিল। চারদিক থেকে ভেসে এল সামরিক নির্দেশ, সুবেশধারী একদল অশ্বারোহী ভালো ঘোড়ায় চেপে বাঁ দিক থেকে এসে বন্দিদের পাশ দিয়ে চলে গেল। কর্তৃপক্ষ স্থানীয় লোকের আবির্ভাব আসন্ন হলে যে উৎকণ্ঠা জাগে তারই স্পষ্ট প্রকাশ সকলের মুখে। বন্দিরা এক জায়গায় ভিড় করল, তাদের রাস্তা থেকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হল। পাহারাদাররা সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সম্রাট! সম্রাট! মার্শাল! ডিউক! ঝকঝকে অশ্বারোহী দলটি চলে যেতে না যেতেই ছটি ধূসর ঘোড়ায় টানা একটা গাড়ি সশব্দে চলে গেল। পিয়ের মুহূর্তের জন্য তিনকোণা টুপি মাথায় একটি লোককে দেখতে পেল, তার ফোলা ফোলা সুদর্শন শাদা মুখে প্রসন্ন দৃষ্টি। পিয়েরের দশাসই দর্শনীয় চেহারার উপর তার চোখ পড়ল, যেরকম ভ্রুকুটি করে লোকটি পিয়েরের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল তা দেখে তার মনে হল, লোকটির মনে তার প্রতি সহানুভূতি জাগলেও সে সহানুভূতিকে চেপে রাখতেই সে চায়।
ভাণ্ডারের ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ভীত রক্তিম মুখে চর্মসার ঘোড়াটার পিঠে চাবুক কমতে কমতে গাড়ির পিছনে ছুটে গেল। সৈন্যরা কয়েকজন অফিসারের একটা দলকে ঘিরে দাঁড়াল। সকলের মুখেই উত্তেজনা ও দুশ্চিন্তার আভাস।
পিয়ের শুনতে পেল সকলেই জিজ্ঞাসা করছে, তিনি কি বললেন? তিনি কি বললেন?
মার্শাল যখন চলে গেল, আর বন্দিরা একত্রে ভিড় করল, তখন পিয়ের কারাতায়েভকে দেখতে পেল। সকাল থেকে তার দেখা মেলেনি। ছোট ওভারকোটটা পরে সে একটা বার্চ গাছে হেলান দিয়ে বসে আছে। গতকাল গল্প বলার সময় যে সানন্দ অনুভূতি ফুটে উঠেছিল তার মুখে, তা ছাড়াও একটা শান্ত গাম্ভীর্যের আভাস এখন সেখানে ছড়িয়ে পড়েছে।
অশ্রুভরা সদয় গোল গোল দুটি চোখ মেলে কারাতায়েভ পিয়েরের দিকে তাকাল, সে যেন চাইছে পিয়ের তার কাছে যাক যাতে সে কিছু বলতে পারে। কিন্তু পিয়ের তখনো মনস্থির করতে পারেনি। সে এমন ভাব। দেখাল যেন কারায়েভের দৃষ্টি তার নজরে পড়েনি। তাড়াতাড়ি সে সেখান থেকে সরে গেল।
বন্দিরা এগিয়ে গেলে পিয়ের আবার ঘুরে তাকাল। কারাতায়েভ তখনো রাস্তার পাশে বার্চ গাছের নিচে বসে আছে, তার মাথার উপর ঝুঁকে দুটি ফরাসি সৈনিক কি যেন বলছে। পিয়ের আবার ফিরে তাকাল। খুঁড়িয়ে খুড়িয়ে পাহাড় বেয়ে উঠতে লাগল।
কারাতায়েভ যেখানে বসেছিল তার পিছন থেকে একটা গুলির শব্দ এল। পিয়ের সেটা পরিষ্কার শুনতে পেল, কিন্তু সেইমুহূর্তে তার মনে হল স্মোলেন পোঁছতে আর কয়টা ঘাটি বাকি আছে সে হিসেবটা এখনো শেষ করা হয়নি। আবার সে হিসাব করতে শুরু করল। দুটি ফরাসি সৈনিক তার পাশ দিয়ে চলে গেল, একজনের হাতে একটা ধূমায়মান বন্দুক নিচু করে ধরা। দুজনেরই মুখ বিবর্ণ। একজন ভীরু চোখে পিয়েরকে দেখছে। তাদের চোখে-মুখে ঠিক সেই ভাব যা পিয়ের দেখছিল মৃত্যুদণ্ড পাবার মুহূর্তে সেই তরুণ সৈনিকটির মুখে। তার দিকে তাকিয়ে পিয়েরের মনে পড়ে গেল যে দুদিন আগে এই লোকটিই আগুনে শুকোতে গিয়ে তার শার্টটা পুড়িয়ে ফেলেছিল এবং তার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল।
