দ্বিতীয় দিন পথ চলার পরে শিবির-আগুনে পা দুটো পরীক্ষা করে পিয়ের ভাবল, সে পা নিয়ে হাঁটা অসম্ভব। কিন্তু যখন সকলে উঠে পড়ল তখন সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে হাঁটতে লাগল, শরীর একটু গরম হলে হাঁটতে আর কোন কষ্ট হল না, কিন্তু রাতে পা দুটো আগের চাইতে ভয়ংকর দেখানো। কিন্তু সেদিকে না তাকিয়ে সে অন্য কথা ভাবতে লাগল।
এতদিনে পিয়ের মানব জীবনের পরিপূর্ণ শক্তিকে উপলব্ধি করতে পেরেছে, উপলব্ধি করেছে মানুষের সেই আত্মরক্ষাকারী শক্তিকে যার সাহায্যে মনকে এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে নিবিষ্ট করা যায়, এ যেন বয়লারের সেই সেফটি-ভালভটি যার সাহায্যে তাপ একটা নির্দিষ্ট সীমাকে ছাড়িয়ে ফেলেই বাড়তি তাপটাকে বের করে দেওয়া হয়।
যে বন্দিরা পিছিয়ে পড়েছিল তাদের ওরা কীভাবে গুলি করে মেরেছিল তা পিয়ের চোখে দেখেনি, কানেও শোনেনি, যদিও একশোর বেশি বন্দি সেই পথেই মৃত্যুবরণ করেছে। কারায়েভের কথা সে ভাবে না, সেও প্রতিদিন আরো দুর্বল হয়ে পড়ছে, অচিরেই তারও সেই দশা হবে। পিয়ের নিজের কথা আরো কম ভাবে। অবস্থা যতই কঠিনতর হয়ে উঠছে, ভবিষ্যৎ হয়ে উঠছে আরো ভয়ংকর, ততই সান্ত্বনাদায়ক আনন্দময় চিন্তা, স্মৃতি ও কল্পনারা তার বর্তমান অবস্থাকে ছাড়িয়ে উঠতে লাগল।
.
অধ্যায়-১৩
২২ অক্টোবর দুপুরে কর্দমাক্ত পিছল পথে চড়াই বেয়ে উঠতে উঠতে পিয়ের একবার তার পায়ের দিকে একবার উঁচু-নিচু রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে। মাঝে মাঝে চারদিকে পরিচিত ভিড়ের দিকে তাকিয়ে আবার তার পায়ের দিকে দৃষ্টি ফেরাচ্ছে। দুইই তার কাছে সমান পরিচিত, সমান নিজস্ব। নীল-ধূসর খোঁড়া কুকুরটা মনের খুশিতে রাস্তার পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে। কখনো পিছনের একটা পা তুলে তিন পায়ে লাফাচ্ছে। আবার ছুটছে চার পায়ে, মরা জন্তুর উপর বসে-থাকা কাকগুলোর দিকে ছুটে যাচ্ছে ঘেউ-ঘেউ করে। মস্কোর চাইতে এখন কুকুরটা আরো খুশি ও চকচকে হয়েছে। চারদিকে মানুষ থেকে ঘোড়া পর্যন্ত নানা জন্তুর পচা মাংস পড়ে আছে, লোকজনের যাতায়াতের ফলে নেকড়েগুলো আসতে পারছে না, ফলে কুকুরটা যথেচ্ছভাবে মাংস খেতে পারছে।
সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। মনে হয়েছিল যেকোন সময় বৃষ্টিটা থামতে পারে, এবং আকাশ পরিষ্কার হতে পারে, কিন্তু একটু থেমেই আবার জোর বৃষ্টি নামল। জলে-ভেজা রাস্তাটা আর জল শুষে নিতে পারল না, ফলে গাড়ির চাকার দাগ বেয়ে জলের স্রোত বয়ে চলল।
দুই দিকে তাকাতে তাকাতে পিয়ের হাঁটছে। তিনটে করে পা আঙুলে গুণছে। বৃষ্টিকে উদ্দেশ করে সে বলে উঠল, এইবার, আবার, চালিয়ে যাও! জোরসে ঢালো!
মনে হল সে কিছুই ভাবছে না, কিন্তু অন্তরের গভীরতম তলে একটা গুরুত্বপূর্ণ, সান্ত্বনাদায়ক বিষয় নিয়ে তার মন মেতে আছে। আগের দিন কারায়েভের সঙ্গে তার যে কথা হয়েছে তা থেকে অনুমিত একটি সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক সিদ্ধান্তই সেই বিষয়।
গতকালের বিশ্রাম-ঘাঁটিতে শিবির-আগুনটা নিভে যাওয়ায় পিয়ের উঠে পার্শ্ববর্তী জ্বলন্ত আগুনটার দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে একটা গ্রেটকোটে আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে বসে প্লাতন কারাতায়েভ সৈন্যদের একটা গল্প বলছে। মাঝ রাত পার হয়ে গেছে। এসময় সাধারণত কারায়েভের জ্বরটা ছেড়ে যায়, সে বেশ সুস্থ বোধ করে। তবু কারায়েভের রোগজীর্ণ কণ্ঠস্বর শুনে এবং আগুনের আভায় উজ্জ্বল করুণ মুখটা দেখে পিয়েরের বুকটা ব্যথায় টনটন করে উঠল। লোকটির প্রতি এই করুণার উদ্রেক হওয়ায় পিয়ের ভয় পেয়ে গেল, সেখান থেকে চলে যেতে চাইল, কিন্তু আর কোনো আগুন না থাকায় প্লাতনের দিকে না তাকিয়ে চেষ্টা করে সেখানেই বসে পড়ল।
আরে, কেমন আছ? শুধাল।
কেমন আছি? রোগ নিয়ে গজগজ করলে তো ঈশ্বর মৃত্যুই দেবেন, এই জবাব দিয়ে প্লাতন আবার গল্পটা বলতে শুরু করল।
বিবর্ণ শীর্ণ মুখে ঈষৎ হাসি ফুটিয়ে আর দুই চোখে খুশির ঝিলিক তুলে বলতে লাগল, তারপর, শোন রে ভাই…
পিয়ের গল্পটা অনেকদিন শুনেছে। কারাতায়েভ খুশিতে ডগমগ হয়ে তাকেই অন্তত ছয়বার গল্পটা শুনিয়েছে। কিন্তু ভালোভাবে জানা হলেও পিয়ের এমনভাবে গল্পটা শুনতে লাগল যেন এই নতুন শুনেছে, শুনতে শুনতে কারায়েভের শান্ত উচ্ছ্বাস যেন তার মধ্যেও সঞ্চারিত হল। জনৈক বুড়ো বণিককে নিয়েই গল্প। সপরিবারে সে সৎ ও ধর্মভীরু জীবন যাপন করত। একদা একজন ধনী বণিকের সঙ্গে সে গিয়েছিল নিঝনি মেলায়।
একটা সরাইখানায় উঠে রাতে দুইজনই শুতে গেল, সকালে দেখা গেল সঙ্গীটির সর্বস্ব লুঠ হয়েছে, আর গলাকাটা আস্থায় পড়ে আছে। একটা রক্তমাখা ছোরা পাওয়া গেল বণিকের বালিশের তলায়। তার বিচার হল, তাকে চাবুক মারা হল, তারপর দুই নাক ফুটো করে কঠোর শাস্তিভোগের জন্য সাইবেরিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হল।
তারপর, ভাইরে, এইভাবে দশটা বছর বা তারও বেশি সময় কেটে গেল। বুড়ো মানুষটা অনুগতভাবে কয়েদির জীবন যাপন করতে লাগল। কখনো কোনো অন্যায় করে না। শুধু মৃত্যুর জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে। একদিন আমাদের মতোই বুড়ো মানুষটাকে নিয়ে কয়েদিরা জমা হল। সকলেই যার যার শাস্তির কারণ ও ঈশ্বরের প্রতি পাপের কথা বলতে লাগল। একজন বলল সে একটি লোককে খুন করে এসেছে, আর একজন বলল দুটি, তৃতীয় জন ঘরে আগুন জ্বালিয়ে এসেছে, অপর একজন ছিল নেহাৎই ভবঘুরে। কোনো অন্যায় কাজ করেনি। এইভাবে তারা বুড়োকে শুধাল, তোমার কি জন্য শাস্তি হয়েছে বাবা?–সে বলল, আমি ভোগ করছি নিজের ও অপরের পাপের শাস্তি। কিন্তু আমি কাউকে খুন করিনি, যা আমার নয় তাতে কখনো হাত দেইনি, শুধু যারা আমার চাইতেও গরীব তাদের সাহায্য করেছি। প্রিয় ভাইসব, আমি ছিলাম একজন বণিক, বিষয়-সম্পত্তিও প্রচুর ছিল। তারপর সে পরপর সব কথা খুলে বলল। নিজের জন্য আমি দুঃখ করি না। মনে হয় ঈশ্বর আমাকে শুদ্ধ করেছেন। শুধু দুঃখ হয় আমার বুড়ি বৌটা আর ছেলেমেয়েদের জন্য। এই বলে বুড়ো কাঁদতে লাগল। ঘটনাচক্রে যে লোকটা অপর বণিকটিকে খুন করেছিল সেও ছিল সেই কয়েদিদের দলে। সে বলল, ঘটনাটা কোথায় ঘটেছিল বাবা? কখন, কোন মাসে সব কথা শুনবার পরে তার বুকটা টনটন করে উঠল। তখন সে বুড়ো লোকটির কাছে এইভাবে এসে তার পায়ের উপর পড়ল। বলল, আমার জন্যই তুমি মরতে চলেছ বাবা। সত্যি বলছি বাছারা, অকারণেই এই নির্দোষ লোকটি কষ্ট ভোগ কছে। সেকাজটা করেছিলাম আমি, আর আমিই তোমার ঘুমের মধ্যে তোমার মাথার নিচে ছুরিটা রেখে দিয়েছিলাম। খ্রিস্টের দোহাই, তুমি আমাকে ক্ষমা কর বাবা!
