যে ফরাসি বাহিনী এতদিন তিন সারিতে অগ্রসর হচ্ছিল, ভিয়াজমা থেকে তারা চলেছে এক সারিতে। মস্কো ছেড়ে আসার পরে প্রথম বিশ্রামঘাঁটিতে পিয়ের বিশৃঙ্খলার যে লক্ষণগুলি দেখতে পেয়েছিল তা এখন চরমে উঠেছে।
যে রাস্তা ধরে তারা চলেছে তার দুই পাশে পড়ে আছে যত মরা ঘোড়া, ছেঁড়া পোশাক পরা যেসব সৈনিক বিভিন্ন রেজিমেন্ট থেকে পিছিয়ে পড়েছিল তারা অনবরত দল বদল করে চলেছে, কখনো একটা চলতি দলে যোগ দিচ্ছে, আবার পিছিয়ে পড়ছে।
চলতে চলতে বারকয়েক ভুল করে বিপদ-সংকেত দেওয়ার ফলে পাহারাদার সৈন্যরা বন্দুক থেকে গুলি ছুঁড়ে ছুটে পালাতে শুরু করে, ফলে নিজেরাই ধাক্কাধাক্কি করে মরে, আর পরে আবার একত্র হলে অকারণ ত্রাসের জন্য একে-অন্যকে গালাগালি করতে থাকে।
অশ্বারোহী বাহিনীর ভাণ্ডার, বন্দিদের পাহারা-দল ও জুনোতের মালবাহী গাড়ি–তিনটে দল একসঙ্গে চললেও তারা যেন একই সঙ্গে আলাদা ও এক, যদিও প্রতিটি দলের লোকজনই অতি দ্রুত কমে যাচ্ছে।
গোলন্দাজ বাহিনীর মালপত্রবাহী গাড়ির সংখ্যা একশো কুড়ি, এখন অবশিষ্ট আছে ষাটের মতো, বাকিগুলো হয় বেদখল হয়েছে, নয়তো পিছিয়ে পড়েছে। জুনোতের মালগাড়িরও কতকগুলি বেদখল হয়েছে অথবা পরিত্যক্ত হয়েছে। তিনটে মালগাড়ি আক্রমণ করে লুট করেছে দাভুতের সেনাদলের দলছাড়া সৈন্যরা। জার্মানদের কথাবার্তা থেকে পিয়ের জানতে পেরেছে যে বন্দিদের তুলনায় মালবাহী গাড়িগুলোর জন্য একটা বড় রকমের রক্ষীবাহিনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে, মার্শালের নিজের হুকুমেই তাদেরই সহকর্মী একজন জার্মানকে গুলি করে মারা হয়েছে, কারণ মার্শালের নিজস্ব একটা রুপোর চামচ তার কাছে পাওয়া গিয়েছিল।
বন্দিদের দলগুলি প্রায় সবই বরফে জমাট বেঁধে গেছে। যে একশো ত্রিশ জন মস্কো থেকে যাত্রা করেছিল তাদের মধ্যে এখনো অবশিষ্ট আছে একশো জনেরও কম। অশ্বারোহী বাহিনীর জিন অথবা জুনোতের মালপত্রের চাইতেও পাহারাদারদের কাছে বন্দিরাই বড় বোঝ। তারা জানে, জিনগুলো এবং জুনোৎ-এর চামচগুলো তবু কিছু কাজে লাগতে পারে, কিন্তু একদল শীতার্ত ক্ষুধিত সৈন্য সমপরিমাণে শীতার্ত ও ক্ষুধিত রুশদের পাহারা দিতেই থাকবে (তাদের অনেকেই ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে পিছিয়ে পড়েছে এবং এ অবস্থায় তাদের গুলি করে মারার হুকুম আছে)-এটা শুধু দুর্বোধ্যই নয়, একান্ত আপত্তিকরও বটে। নিজেদের কষ্টকর অবস্থায় বন্দিদের প্রতি কোনোরূপ করুণা দেখাতেও যেন তারা ভয় পেল এবং তাদের প্রতি রূঢ় ও কঠোর ব্যবহার করতে লাগল।
দরগবুঝে পাহারাদার সৈন্যরা বন্দিদের একটা আস্তাবলে তালাবন্ধ করে রেখে নিজেদের ভাড়ারই নিজেরা লুট করতে চলে গেলে কয়েকজন সৈনিক-বন্দি দেয়ালের নিচ দিয়ে সুরঙ্গ কেটে পালিয়ে গেল। কিন্তু ফরাসিরা আবার তাদের গ্রেপ্তার করে গুলি করে মেরে ফেলল।
যাত্রার মুখে অফিসার-বন্দিদের অন্য বন্দিদের থেকে আলাদা করে রাখার যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেটা অনেকদিন উঠে গেছে। যারা হাঁটতে পারল তারাই একসঙ্গে চলতে লাগল, তৃতীয় ঘাটির পরেই পিয়ের কারাতায়েভ ও তার নীল-ধূসর বাকা-ঠ্যাং কুকুরটার দলে যোগ দিল।
মস্কো ছেড়ে আসার পরে তৃতীয় দিনে কারাতায়েভ আবার সেই জ্বরে পড়ল মস্কোর হাসপাতালে থাকতে যে জ্বরে সে ভুগেছিল। সে ক্রমে যতই দুর্বল হয়ে পড়ল পিয়ের ততই তার কাছ থেকে সরে যেতে লাগল। কেন তা পিয়ের জানে না, কিন্তু যেদিন থেকে কারাতায়েভ দুর্বল হতে লাগল সেদিন থেকেই পিয়ের যেন কিছুটা অনিচ্ছাতেই তার কাছে যেত। কাছে গেলেই করাতায়েভের চাপা গোঙানি কানে আসে, তার শরীরের দুর্গন্ধ ক্রমেই বেশি করে নাকে আসে, আর পিয়ের ততই তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়, তার কথা ভাবেও না।
চালাঘরে বন্দি থাকার সময় পিয়ের জেনেছিল–বুদ্ধি দিয়ে নয়, সমস্ত সত্তা দিয়ে, জীবন দিয়ে জেনেছিল যে, মানুষের সৃষ্টি হয়েছে সুখের জন্য, সুখ আছে তার অন্তরে, আছে মানুষের সহজ, সরল প্রয়োজনের পরিপূর্তিতে, দুঃখের উদ্ভব হয় অভাব থেকে নয়, প্রয়োজনাতিরিক্ত জিনিসের প্রতি আসক্তি থেকে। আর এখন এই তিন সপ্তাহের ভ্রমণ-কালে আর একটি সান্তনাদায়ক নতুন সত্যকে সে জেনেছে–এই পৃথিবীতে ভয়ংকর বলে কিছু নেই। জেনেছে, যন্ত্রণা ও মুক্তিরও সীমা আছে, আর সে সীমা পরস্পরের খুব কাছাকাছি, গোলাপের বিছানায় শুয়ে একটি কুঁচকানো পাপড়ির জন্য মানুষ ঠিক ততখানি কষ্টই পায় যেটা সে ভোগ করছে সঁতসেঁতে খালি মেঝের উপর ঘুমিয়ে, যখন শরীরের একদিক গরম হতে না হতেই অপর দিকটা ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছে, আঁটো নাচের জুতো পরলে যতখানি কষ্ট পেত, এখন ঘা-ভর্তি খালি পায়ে হাঁটতেও সেইরকম কষ্টই পাচ্ছে। নতুন করে আবিষ্কার করেছে, রাতের বেলা আস্তাবলে তালাবন্ধ অবস্থায় সে যতটা স্বাধীন আছে, স্ত্রীকে স্বেচ্ছায় বিয়ে করার সময় তার চাইতে বেশি স্বাধীন ছিল না। এখন তার কাছে সবচাইতে যন্ত্রণাদায়ক তার ঘা-ভর্তি খালি পা দুটো। (ঘোড়ার মাংস ক্ষুধাবর্ধক ও পুষ্টিকর, নুনের বদলে যে বারুদ তারা ব্যবহার করে তার যবক্ষার-স্বাদও এখনো ভালোই লাগে, ঠাণ্ডাও খুব বেশি নয়, দিনের বেলা হাঁটতে বেশ গরমই লাগে, আর রাতের জন্য আছে শিবির-আগুন, যেসব উকুন শরীরটাকে কুরে কুরে খায় তারাই এখন শরীরটাকে গরম রাখে।) প্রথমেই যে জিনিসটা অসহ্য মনে হল সেটা তার পা দুটো।
