বলল, সংকেত!
কসাকটি হাত তুলল, একটা গুলি সশব্দে ছুটে গেল। মুহূর্তের মধ্যে ঘোড়ার জোর কদমে ছোটার শব্দ শোনা গেল, বিভিন্ন দিক থেকে চিৎকার উঠল, আরো গুলি ছোঁড়ার আওয়াজ হল।
ঘোড়র ক্ষুরের ও চিৎকারের প্রথম শব্দ শুনেই পেতয়া ঘোড়ার পিঠে চাবুক কসাল, রাশ আলগা করে দিয়ে সামনে ছুটে গেল, দেনিসভের কোনো কথা কানেই নিল না। পেতয়ার মনে হল, প্রথম গুলিটা ছোঁড়ার মুহূর্তেই সহসা যেন দুপুরের আলো দেখা দিল। ঘোড়া ছুটিয়ে সে সেতুর দিকে চলল। কাকরা চলেছে তার আগে আগে। সেতুর উপর জনৈক কসাকের সঙ্গে তার ধাক্কা লাগল, সে পিছিয়ে পড়েছিল, জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল। তার সামনে সৈন্যরা সম্ভবত ফরাসি সৈন্যরা রাস্তা পার হবার জন্য ডান থেকে বাঁ দিকে ছুটছে। তাদের একজন পেতয়ার ঘোড়র পায়ের নিচে কাদার মধ্যে পড়ে গেল।
একটা কুটিরে চারপাশে কসাকরা ভিড় করেছে, তারা একটা কিছু নিয়ে ব্যস্ত। ভিড়ের ভিতর থেকে ভয়ংকর আর্তনাদ শোনা গেল। ঘোড়া ছুটিয়ে এসে হাজির হল পেতয়া। প্রথমেই তার চোখে পড়ল, একটি ফরাসি সৈনিক তাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়বার জন্য বর্শার হাতলটা ধরে আছে, তার মুখ বিবর্ণ, চোয়াল কাঁপছে।
হুররা।…বাছারা!…আমাদের! পেতয়া চেঁচিয়ে বলল। তারপর উত্তেজিত ঘোড়ার রাশ ঢিল দিয়ে গ্রাম্য পথ ধরে ছুটে গেল।
সামনের দিকে গুলির শব্দ শোনা গেল। কাকরা, হুজাররা, ছেঁড়া পোশাকপরা রুশ বন্দিরা রাস্তার দুপাশ থেকে ছুটে এসে জোর গলায় অসংলগ্নভাবে চিৎকার করে কি যেন বলছে। বেশ সাহসী দেখতে একজন ফরাসি হুজারদের দিকে হাতের ব্যেয়নেট উদ্যত করে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে। তার পরনে নীল ওভারকোট, মাথায় টুপি নেই, লাল মুখটা ভ্রুকুটিকুটিল। পেতয়া যখন ঘোড়া ছুটিয়ে সেখানে গেল ততক্ষণে লোকটি ধরাশায়ী হয়েছে। আবার বড় বেশি দেরি হয়ে গেল! কথাটা বিদ্যুৎগতিতে পেতয়ার মনে উদয় হল, ঘোড়া ছুটিয়ে সে আবার সেইদিক পানে গেল যেখান থেকে বারবার গুলির শব্দ আসছে। আগের দিন রাতে দলখভের সঙ্গে সে যে বাড়ির উঠোনে গিয়েছিল সেখান থেকেই গুলি আসছে। ঘন ঝোঁপঝাড়ের ভিতরকার বাঁশের বেড়ার আড়ালে ঘাঁটি গেড়ে ফরাসিরা ফটকে সমবেত কসাকদের উপর গুলি চালাচ্ছে। ফটকের কাছে এগিয়ে পেতয়া ধোয়ার ভিতর দিয়ে দলখভকে দেখতে পেল, বিবর্ণ মুখে সে লোকজনদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলছে, ঘুরে যাও! পদাতিক বাহিনীর জন্য অপেক্ষা কর! ততক্ষণে পেতয়া তার কাছে পৌঁছে গেল।
অপেক্ষা?…হুররা–আ-আ! পেতয়া চিৎকার করে উঠল। এক মুহূর্তও না থেমে যেখান থেকে গুলির শব্দ আসছে, যেখানে ধোয়া সব চাইতে ঘন সেইদিকে ছুটে গেল।
গুলিবর্ষণের শব্দ হল, কিছু বুলেট হিস-হিস করে পাশ দিয়ে চলে গেল, কিছুটা গিয়ে ছিটকে পড়ল কোনো কিছুর উপর। কসাকরা ও দলখভ পেতয়াকে অনুসরণ করে ফটকের দিকে ঘোড়া চালিয়ে দিল। ঘন ধোয়ার মধ্যে কিছু ফরাসি অস্ত্র ফেলে দিয়ে ঝোঁপ থেকে ছুটে বেরিয়ে এল কসাকদের সামনে, অন্যরা পাহাড় বেয়ে পুকুরের দিকে নেমে গেল। ওদিকে পেতয়া উঠোনের পাশ দিয়ে ঘোড়া ছোটাতে ছোটাতে রাশটা হাতে না ধরে দুই হাতই অদ্ভুতভাবে ঘোরাতে লাগল, আর ক্রমেই জিন থেকে সরে যেতে লাগল। জোর কদমে ছুটতে ছুটতে একটা নিভন্ত আগুনের কাছে পৌঁছে ঘোড়াটা হঠাৎ থেমে গেল, আর পেতয়া ধপাস করে ভেজা মাটিতে পড়ে গেল। কসাকরা দেখল, তার মাথাটা নিশ্চল থাকলেও হাত-পাগুলো খুব তাড়াতাড়ি নড়ছে। একটা বুলেট তার খুলির মধ্যে ঢুকে গেছে।
এদিকে ঊর্ধ্বতন ফরাসি অফিসারটি তরবারির মাথায় শাদা রুমাল বেঁধে বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে ঘোষণা করল যে তারা আত্মসমর্পণ করছে। তার সঙ্গে কথাবার্তা বলে দলখভ ঘোড়া থেকে নেমে পেতয়ার কাছে গেল। সে তখন হাত ছড়িয়ে নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে।
শেষ! ভুরু কুঁচকে কথাটা বলে দলখভ ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। দেনিসভ ঘোড়া ছুটিয়ে তার দিকেই আসছে।
মৃত্যুর অভ্রান্ত লক্ষণ তার কাছে খুবই পরিচিত। দূর থেকে পেতয়ার দেহটাকে সেইভাবে পড়ে থাকতে দেখে দেনিসভ চিৎকার করে বলল, মেরে ফেলেছে।
সব শেষ। দলখভ পুনরায় কথাটা বলল, বলে যেন খুশি হল। তারপর তাড়াতাড়ি বন্দিদের দিকে এগিয়ে গেল। কসাকরা এসে তাদের ঘিরে ফেলেছে। সে দেনিসভকে উদ্দেশ্য করে বলল, আমরা ওদের নিয়ে যাব না!
দেনিসভ জবাব দিল না, পেতয়ার কাছে এগিয়ে গিয়ে ঘোড়া থেকে নামল, তারপর কম্পিত হাতে পেতয়া রক্তমাখা কর্দমাক্ত মুখখানাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ধরল। মুখটা এর মধ্যেই শাদা হয়ে গেছে।
পেতয়ার কথাগুলি তার মনে পড়ে গেল : মিষ্টি কিছু খাওয়া আমার অত্যাস। কিসমিসগুলি খুব ভাললা…সব নিন! কুকুরের মতো আর্তনাদ করে দেনিসভ ঘুরে দাঁড়াল। সে শব্দ শুনে কত্সকরা সবিস্ময়ে তার দিকে তাকাল। দেনিসভ হাঁটতে হাঁটতে বাঁশের বেড়াটার কাছে গিয়ে সেটাকে চেপে ধরল।
দেনিসভ ও দলখভ যে রুশ বন্দিদের উদ্ধার করল তাদের মধ্যেই ছিল পিয়ের বেজুখভ।
.
অধ্যায়-১২
মস্কো থেকে পথ চলার পুরো সময়-কালের মধ্যে বন্দিদের সম্পর্কে ফরাসি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কোনো নতুন আদেশ জারি করা হয়নি। সেই বন্দিদের দলে পিয়েরও ছিল। মস্কো ছাড়বার সময় বন্দিরা যে সেনাদল ও মালবাহী গাড়ির সঙ্গে ছিল, ২২শে অক্টোবর তারা আর সে দলের সঙ্গে ছিল না। যাত্রার প্রথম দিকে গজাল ভর্তি যে গাড়িগুলো তাদের সঙ্গে চলছিল তাদের অর্ধেক দখল করে নিয়েছে কসাকরা, আর বাকি অর্ধেক সামনে এগিয়ে গেছে। অশ্বহীন যে অশ্বারোহী সৈন্যরা বন্দিদের আগে আগে চলছিল তাদের একজনও নেই, সকলেই উধাও হয়ে গেছে। প্রথম দিকে বন্দিরা তাদের যে কামান-শ্রেণী দেখতে পেয়েছিল, এখন তার জায়গায় এসেছে মার্শাল জুনোৎ-এর মস্তবড় মালবাহী গাড়ি, ওয়েস্টফেলিয় সৈন্যরা সেটাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে চলেছে। বন্দিদের পিছন পিছন আসছে অশ্বারোহী বাহিনীর একটা মালবাহী গাড়ি।
