পেতয়ার চোখ দুটি বুজে এল, সে একটু ঢুলতে লাগল।
গাছ থেকে জল পড়ছে। চুপি-চুপি কথা শোনা যাচ্ছে। ঘোড়াগুলো হেষারব করে পরস্পর ঠেলাঠেলি করছে। একজন নাক ডাকাচ্ছে।
ও ঝেগ-ঝেগ, ও ঝেগ-ঝেগ… শান-পাথরে তরবারি ঘষার শব্দ হচ্ছে। হঠাৎ পেতয়া শুনতে পেল, সম্মিলিত অর্কেস্ট্রায় একটা অজানা, মধুর, গম্ভীর মন্ত্র বাজছে। পেতয়ার সুর-জ্ঞান নাতাশার মতোই, যদিও নিকলাসের চাইতে বেশি, কিন্তু সে কখনো গান শেখেনি বা তা নিয়ে ভাবেওনি। তাই অপ্রত্যাশিতভাবে যে সুর তার কানে এল তাই তার কাছে তাজা ও আকর্ষণীয় বলে মনে হল। সুরটা ক্রমেই স্পষ্টতর হচ্ছে, এক যন্ত্র থেকে অপর যন্ত্রে সঞ্চারিত হচ্ছে। যে সুরটা বাজানো হচ্ছে সেটা ফুগ (পর্যায়ক্রমিক সঙ্গীত)-যদিও ফুগ কাকেবলে পেতয়া তা জানে না। যন্ত্রগুলিকে কখনো মনে হচ্ছে বেহালা, কখনো বা শিঙা, কিন্তু ঐ দুটোর চাইতেই অনেক ভালো ও অনেক স্পষ্ট। সেগুলি পর্যায়ক্রমে বাজতে বাজতে একসঙ্গে মিশে গেল, আবার আলাদা হয়ে গেল, আবার মিশে গেল। কখনো বেজে উঠল গির্জার গম্ভীর সঙ্গীত, কখনো বা আশ্চর্য এক জয়গান।
সামনে তাকিয়ে পেতয়া ভাবল, আরে–আমি কি স্বপ্ন দেখেছি! কানের মধ্যে বাজছে। হয় তো এ সঙ্গীত আমারই নিজস্ব। ঠিক আছে, বাজো আমার সঙ্গীত! এবার!…
সে চোখ বুজল, আর অমনি চারদিক থেকে ভেসে এল সুর, মিশে গেল, আলাদা হল, মিশে গেল, তারপর সব সুর মিলে মিশে একটি মধুর গম্ভীর যন্ত্র হয়ে উঠল। পেতয়া নিজের মনেই বলল, আহা, কী আনন্দময়! ঠিক আমার মনের মতন! প্রকাণ্ড অর্কেস্ট্রাটাকে পরিচালিত করার ইচ্ছা জাগল তার মনে।
এবার ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাও! শব্দগুলি তার কথা শুনল। এবার পূর্ণতর, আরো আনন্দময়। আরো–আরো আনন্দময়! অমনি কোনো অজ্ঞাত গভীরতা থেকে উঠল বর্ধিত শব্দরাশি। এবার সব স্বর এক হয়ে যাও! পেতয়া হুকুম দিল। আর অনেকদূর থেকে সে শুনতে পেল প্রথমে পুরুষের কণ্ঠস্বর, তারপর নারীদের। সে শব্দ সম্মিলিত বিজয়-গর্বে ক্রমেই বেড়ে চলল, আর পেতয়া ভয়ে ও আনন্দে কান পেতে তাদের অপার সৌন্দর্য শুনতে লাগল।
একটা গম্ভীর জয়যাত্রার সঙ্গীত, গাছের জলপড়ার শব্দ ও তরবারির হিসহিস একত্রে মিশে ধ্বনি উঠল ও ঝেগ-ঝেগ-ঝেগ…।
সে ধ্বনি কতক্ষণ ছিল পেতয়া জানে না : সে আনন্দে মজে গেল, নিজের আনন্দে নিজেই অবাক হল, আর মনে মনে দুঃখ পেল যে এ আনন্দের কেউ অংশীদার নেই। লিখাচিভের ডাকে তার স্বপ্ন ভেঙে গেল।
এটা হয়ে গেছে ইয়োর অনার, এটা দিয়ে একটা ফরাসিকে কেটে দুটুকরো করতে পারবেন।
পেতয়া জেগে উঠল।
আলো ফুটেছে, সত্যি আলো ফুটেছে, সে চেঁচিয়ে উঠল।
যে ঘোড়াগুলোকে আগে দেখা যাচ্ছিল না এখন সেগুলির লেজ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, পাতাঝরা ডালের ফাঁকে ফকে বৃষ্টি-ভেজা আলো দেখা যাচ্ছে। শরীরটাকে নাড়া দিয়ে পেতয়া লাফ দিয়ে উঠল, পকেট থেকে একটা রুবল বের করে লিখাচিভকে দিল, তারপর তরবারিটা ঘুরিয়ে ধার পরীক্ষা করে, খাপে ভরে নিল। কত্সকরা ঘোড়া খুলে দিয়ে কসে জিন আঁটতে লাগল।
লিখাচিভ বলল, এই তো কমান্ডার এসে গেছেন। দেনিসভ পাহারাদারের ঘর থেকে বেরিয়ে এল, পেতয়াকে ডেকে নিয়ে সকলকে তৈরি হবার হুকুম দিল।
.
অধ্যায়-১১
আধো অন্ধকারে লোজনরা ঘোড়া খুঁজে নিয়ে, জিন পরিয়ে, একত্র হল। দেনিসভ পাহারাদারের কুটিরের পাশে দাঁড়িয়ে শেষ নির্দেশাদি দিতে লাগল। দলের পদাতিক বাহিনী পথে নামল। শত শত পায়ে কাদা ছিটিয়ে প্রথম উষার কুয়াশার ভিতর দিয়ে তারা জঙ্গলের মধ্যে অতি দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল। সঙ্গীটিও তার দলের লোকদের কিছু হুকুম দিল। ঘোড়ার রাশ হাতে নিয়ে সওয়ার হবার হুকুমের অপেক্ষায় পেতয়া অধৈর্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠাণ্ডা জলে স্নান করায় তার মুখটা জ্বলজ্বল করছে, চোখ দুটো খুব ঝকঝকে দেখাচ্ছে। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নামছে, সারা শরীরের ধমনিগুলো তালে তালে চলছে।
দেনিসভ শুধাল, সবকিছু তৈরি? এবার ঘোড়া আন।
ঘোড়া আনা হল। জিনটা ঢিলে থাকায় দেনিসভ কসাকটির উপর রাগ করল, তাকে বকুনি দিল, তারপর সওয়ার হয়ে বসল। পেতয়া রেকাবে পা দিল। পিছন ফিরে একবার হুজারদের দেখে নিয়ে দেনিসভের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
বলল, ভাসিলি দিমিত্রিচ, আমাকে একটা কাজের ভার দিন। দয়া করে..ঈশ্বরের দোহাই…!
দেনিসভ বোধ হয় পেতয়ার অস্তিত্বই ভুলে গিয়েছিল। মুখটা ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল।
কঠোর কণ্ঠে বলল, তোমার কাছে আমার একটাই কথা। আমাকে মেনে চলবে, কোথাও নিজের থেকে নাক গলাবে না।
পেতয়াকে সে আর একটি কথাও বলল না, সারা পথ নিঃশব্দে ঘোড়া চালাল। যখন বনের প্রান্তে পৌঁছল তখন মাঠের উপর পরিষ্কার আলো ছড়িয়ে পড়েছে। দেনিসভ ফিসফিস করে সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলছে, কসাকরা পেতয়া ও দেনিসভকে পাশ কাটিয় চলে গেল। সকলে চলে গেলে দেনিসভ ঘোড়ার পিঠে হাত রেখে পাহাড়ের উৎরাই বেয়ে নামতে শুরু করল। ঘোড়াগুলো আরোহীসমেত খাড়িতে নেমে গেল। পেতয়া দেনিসভের পাশেই আছে, তার নাড়ির গতি ক্রমাগত বাড়ছে। ক্রমেই আলো বাড়ছে, কিন্তু দূরের জিনিস তখনো কুয়াশায় ঢাকা। উপত্যকায় পৌঁছে দেনিসভ পিছনে তাকাল, ইশারায় একটি কসাককে কাছে ডাকল।
