পেতয়া বলল, কিন্তু…না, আমি এখনই ঘুমতে চাই না। তাছাড়া, আমি জানি ঘুমিয়ে পড়লেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। তাই যুদ্ধের আগে না ঘুমনোটা আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।
কুটিরের ভিতরে বসে খুশি মনে সে অভিযানের খুঁটিনাটি বিষয়গুলির কথা ভাবতে লাগল, পরদিন যা ঘটবে তাও কল্পনা করতে লাগল। যখন দেখল দেনিসভ ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বাইরে তখনো বেশ অন্ধকার। বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু গাছ থেকে তখনো ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে। কুটিরের কাছেই কসাকদের ঝুপড়ি ও ঘোড়াগুলোর কালো কালো চেহারা চোখে পড়ছে। কুটিরের পিছনে দুটো মালগাড়ি ও ঘোড়র কালো কালো ছায়া এবং খাড়ির মধ্যে নিভে-আসা আগুনের লাল আভা দেখা যাচ্ছে। সব কসাক ও হুজাররা ঘুমিয়ে পড়েনি, এখানে-ওখানে জল পড়া ও ঘোড়ার চিবনোর শব্দের ফাঁকে ফকে নিচু গলার ফিসফিস শব্দ কানে আসছে।
বাইরে এসে পেতয়া অন্ধকারের দিকে তাকাল, মালগাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। গাড়ির নিচে একজনের নাক ডাকছে, চারদিকে ঘোড়াগুলো যই চিবচ্ছে। অন্ধকারে নিজের ঘোড়াটাকে চিনতে পেরে পেতয়া সেই দিকে এগিয়ে গেল। ইউক্রেনিয় জাতের ঘোড়া হলেও পেতয়া ঘোড়াটাকে করবাখ বলে ডাকে।
ঘোড়াকে চুমো খেয়ে পেতয়া বলল, দেখ করবাখ! কাল কিছু কাজের কাজ হবে।
যে কসাকটি গাড়ির নিচে বসেছিল সে বলল, আপনি এখনো ঘুমোননি স্যার?
না, আরে…লিখাচিভ-এটাই তো তোমার না? তুমি কি জান এইমাত্র আমি ফিরেছি। আমরা ফরাসি শিবিরে ঢুকেছিলাম।
পেতয়া সমুদয় বিবরণ তাকে জানাল।
কসাক বলল, এখন আপনার একটু ঘুমিয়ে নেওয়া উচিত।
এ আমার অভ্যাস আছে, পেতয়া বলল। বলি কি, তোমাদের পিস্তলের পাথরগুলো কি ক্ষয়ে গেছে? আমার সঙ্গে কিছু পাথর আছে। তোমার কি দরকার আছে? কয়েকটা নিতে পার।
কসাকটি গাড়ির নিচ থেকেই মুখ বাড়িয়ে পেতয়াকে ভালো করে দেখল।
পেতয়া বলল, সবকিছু সঠিকভাবে করাই আমার অভ্যাস। অনেকেই কোনোরকমে কাজ সারে, আর পরে সেজন্য পস্তায়। সেটা আমি পছন্দ করি না।
ঠিক কথা, কসাক বলল।
হ্যাঁ, আর একটা কথা! দেখ ভাই, দয়া করে আমার তরবারিটা একটু শান দিয়ে দিতে পার? পারবে কি?
নিশ্চয় পারব।
লিখাচিভ উঠে এল। থলিটা হাতড়ে কি সব বের করল, অচিরেই শান-পাথরে ইস্পাত ঘষার একটা যুদ্ধের মতো শব্দ পেতয়ার কানে এল। গাড়ির উপর উঠে সে এক কোণে বসল। কসাকটি মালগাড়ির নিচে বসেই তরবারিতে শান দিতে লাগল।
বলছি কি! বাছারা সবাই কি ঘুমিয়ে পড়েছে? পেতয়া শুধাল।
কতক ঘুমিয়েছে, কতক ঘুমোয়নি-যেমন আমরা।
আচ্ছা, সেই ছেলেটা?
ভেসেন্নি? আরে, সে তো ওখানে বারান্দাতেই শুয়ে পড়েছে। ভয় পাবার পরে এখন ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেছে।
পেতয়া অনেকক্ষণ চুপ করে নানান শব্দ শুনতে লাগল। অন্ধকারে পায়ের শব্দ শুনতে পেল। একটা কালো মূর্তি এগিয়ে এল।
গাড়ির কাছে এসে শুধাল, কি ধার দিচ্ছ?
কেন, এই ভদ্রলোকের তরবারি।
ঠিক আছে, লোকটি বলল, পেতয়ার ধারণা সে একজন হুজার। কাপটা কি এখানে ফেলে গেছি।
ওখানে, চাকাটার পাশে।
হুজার কাপটা তুলে নিল।
শীঘ্রই ভোর হবে, হাই তুলে কথাটা বলে সে চলে গেল।
পেতয়া অবশ্যই জানে যে রাস্তা থেকে এক ভা দূরে জঙ্গলের মধ্যে দেনিসভের গেরিলাদের দলে সে আছে, ফরাসিদের কাছ থেকে আটক-করা একটা মালগাড়ির উপর সে বসে আছে, পাশে ঘোড়াগুলো এক দিগড়িতে বাঁধা রয়েছে, মালগাড়ির নিচে বসে লিমাচিভ তারই তরবারিতে শান দিচ্ছে, ডান দিকের বড় কালো ছায়াটা পাহারাদারের ঘর, বাঁ দিকে নিচে লাল আলোটা শিবিরের নিভে-আসা আগুন, যে লোকটা কাপ নিতে এসেছিল সে একটা হুজার। এসবই তার জানবার কথা, কিন্তু এই মুহূর্তে এসবকিছুই সে জানে না, জানতে চায়ও না। সে এখন রূপকথার রাজ্যে বাস করছে, সেখানে কোনো কিছুই বাস্তবের অনুরূপ নয়। বড় কালো ছায়াটা আসলে পাহারাদারের কুটির হলেও সেটা পৃথিবীর নিচে একেবারে অতলে যাবার একটা গহ্বরও হতে পারে। লাল আলোটা হয় তো একটা আগুন, আবার ওটা তো একটা প্রকাণ্ড দানবের চোখও হতে পারে। হয় তো সত্যি সত্যি সে বসে আছে একটা মালগাড়ির উপর, কিন্তু এও তো হতে পারে যে মালগাড়ি না হয়ে ওটা একটা ভয়ংকর উঁচু মিনার যেখান থেকে পড়ে গেলে সে হয় তো সারাদিন, বা সারা মাস ধরেই পড়তে থাকবে, অথবা শুধু পড়তেই থাকবে, কোনোদিন আর নিচে পৌঁছবে না। হয় তো কসাক লিখাচিভই মালগাড়ির নিচে বসে আছে, কিন্তু সে তো এমন একটি পরম দয়ালু, পরম সাহসী, পরম আশ্চর্য ও পরম চমৎকার মানুষ হতে পারে যার কথা পৃথিবীর কেউ জানে না। হয় তো একটি হুজারই জল নিতে এসে ফিরে গেছে, কিন্তু আসলে হয় তো সে উধাও হয়েছে–একেবারে অদৃশ্য হয়ে মহাশূন্যে মিলিয়ে গেছে।
এখন পেতয়া যাই দেখুক কিছুতেই বিস্মিত হবে না। সে এখন রূপকথার রাজ্যে বাস করছে, সেখানে সবই সম্ভব।
আকাশের দিকে তাকাল। আকাশটাও যেন পৃথিবীর মতোই রূপকথার দেশ। আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে, গাছের উপর দিয়ে মেঘেরা ভেসে যাচ্ছে, যেন তারাদের মুখের ঘোমটা খুলে দিচ্ছে। অনেক সময় মনে হচ্ছে যেন মেঘেরা সরে যাচ্ছে আর পরিষ্কার কালো আকাশ বেরিয়ে আসছে। কখনো মনে হচ্ছে আকাশটা উপরে উঠে যাচ্ছে, একেবারে মাথার উপরে অনেক উঁচুতে, আমার মনে হচ্ছে সেটা এত নিচে নেমে এসেছে যেন হাত দিয়ে ছোঁয়া যাবে।
