আগুনের অপর দিকে ছায়ায় উপবিষ্ট একজন অফিসার বলল, আর, সে লোকটা বড় কঠিন ঠাঁই!
আর একজন হেসে বলল, লোকগুলোকে সে বিপদে ফেলবে।
দলখভ ও পেয়ার ঘোড়ার শব্দ কানে আসতে তারা অন্ধকারে তাকিয়ে চুপ করে গেল।
দলখভ সানন্দে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল, বজু, মঁসিয়!
অন্ধকারে উপবিষ্ট অফিসারদের মধ্যে একটা আলোড়ন দেখা দিল, দীর্ঘস্কন্ধ দীর্ঘকায় একটি অফিসার আগুনটা ঘুরে দলখভের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
বলল, আরে, ক্লিমেন্ট না কি? কোথায় হাওয়া হয়ে… নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে থেমে গেল, বুরু কুঁচকে অপরিচিত জনের মতো দলখভকে স্বাগত জানিয়ে তার জন্যে কি করতে পারে তা জানতে চাইল।
দলখভ বলল, সে ও তার সঙ্গী অনেকক্ষণ থেকেই তাদের রেজিমেন্টটাকে ধরতে চেষ্টা করছে, তারপর সাধারণভাবে সকলকে উদ্দেশ করেই জানতে চাইল, তারা ষষ্ঠ রেজিমেন্টের কোনো খবর রাখে কি না। তারা কেউ কিছু জানে না, পেতয়ার মনে হল তার ও দলখভের দিকে তারা শত্রুতাপূর্ণ সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করেছে। কয়েক সেকেন্ড সকলেই চুপচাপ।
পিছন থেকে একজন চাপা হাসির সঙ্গে বলে উঠল, সন্ধ্যাবেলাকার ঝোলের আশা করে যদি এসে থাক তাহলে বড়ই দেরি করে ফেলেছ।
দলখভ জবাব দিল, তারা ক্ষুধার্ত নয়, আর সেই রাতেই তাদের আরো এগিয়ে যেতেই হবে।
যে সৈনিকটি পাত্রটাকে নাড়ছিল তার হাতে ঘোড়া দুটোকে ছেড়ে দিয়ে সে দীর্ঘস্কন্ধ অফিসারটির পাশে বসে পড়ল। সে অফিসারটি কিন্তু দলখভের উপর থেকে চোখ না সরিয়ে পুনরায় জানতে চাই, সে কোন রেজিমেন্টের লোক। প্রশ্নটা যেন শুনতেই পায়নি এমনি ভাব দেখিয়ে দলখভ কোনো জবাব দিল না, পকেট থেকে একটা বেঁটে ফরাসি পাইপ বের করে আগুন ধরাল, তারপর জিজ্ঞাসা করল, তাদের সামনের রাস্তাটা কতদূর পর্যন্ত কসাকদের হাত থেকে নিরাপদ।
আগুনের পিছন থেকে একজন অফিসার জবাব দিল, সে দস্যুরা তো সর্বত্র রয়েছে।
দলখভ বলল, তার সঙ্গী ও তার মতো দলছাড়াদের পক্ষেই কসাকরা বিপজ্জনক, কিন্তু তারা হয়তো বড় কোনো দলকে আক্রমণ করতে সাহস করবে না, কি বলেন? কেউ কোনো জবাব দিল না।
শিবির-আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতি মুহূর্তে পেতয়া ভাবছে, এবার উনি চলে আসবেন।
কিন্তু দলখভ আবার সেই আলোচনাই নতুন করে শুরু করল এবং সরাসরি প্রশ্ন করতে লাগল, প্রতিটি ব্যাটেলিয়নে কত সৈন্য আছে, কতগুলি ব্যাটেলিয়ন আছে, আর বন্দিই বা কতজন আছে। সেই দলের সঙ্গের রুশ বন্দিদের কথা জানতে গিয়ে দলখভ বলল :
এই মরা মানুষগুলোকে টেনে নিয়ে চলা একটা ভয়ংকর কাজ! এসব ছোটলোককে গুলি করে মেরে ফেলাই ভালো। বলেই সে এমন অদ্ভুতভাবে হো-হো করে হেসে উঠল যে পেতয়ার মনে হল ফরাসিরা অবিলম্বেই তাদের ছদ্মবেশ ধরে ফেলবে। নিজের অজ্ঞাতেই সে আগুনের কাছ থেকে এক পা পিছিয়ে গেল।
দলখভের হাসির জবাবেও কেউ কিছু বলল না। জনৈক ফরাসি অফিসার গ্রেটকোটটা মুড়ি দিয়ে শুয়েছিল বলে তারা তাকে দেখতে পায়নি। এবার সে উঠে একজন সঙ্গীর কানে কানে কি যেন বলল। দলখভ উঠে পড়ল! যে সৈনিকটি ঘোড়া দুটিকে ধরে রেখেছিল তাকে ডাকল।
আপনা থেকেই দলখভের আরো কাছে সরে গিয়ে পেতয়া ভাবল, ওরা কি ঘোড়া দুটো এনে দেবে?
ঘোড়া দুটো আনা হল। শুভ সন্ধ্যা মশায়রা, দলখভ বলল।
পেতয়ারও ইচ্ছা হল বলে শুভ রাত্রি, কিন্তু একটা কথাও তার মুখে এল না। অফিসাররা তখন পরস্পর ফিসফিস করছে। দলখভের ঘোড়ায় চাপতে বেশ দেরি হল, কারণ ঘোড়াটা কিছুতেই স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছিল না। তারপর সে হাঁটা-গতিতে উঠোনটা পেরিয়ে গেল। পেতয়াও চলতে লাগল তার পাশে পাশে, মুখ ফিরিয়ে দেখার সাধ হল ফরাসিরা তাদের পিছনে ছুটে আসছে কি না, কিন্তু সাহসে কুলোল না।
রাস্তায় পড়ে দলখভ আর ভোলা মাঠ পেরিয়ে ঘোড়া ছোটাল না, চলল গ্রামের ভিতর দিয়ে। একটা জায়গায় থেমে সে কান পাতল। শুধাল, শুনতে পাচ্ছ? পেতয়া রুশ গলার শব্দ চিনতে পারল, দেখল শিবির আগুনকে ঘিরে বসে আছে রুশ বন্দিদের কালো কালো মূর্তি। সেতুর কাছে নেমে এসে পেতয়া ও দলখভ শান্ত্রীকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল সে বেচারি একটিও কথা না বলে বিষণ্ণ মনে পায়চারি করে চলেছে। তারপর তারা সেই খাড়িতে নেমে গেল যেখানে কসাকরা তাদের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে।
আচ্ছা, এবার বিদায়। দেনিসভকে বলে দিও দিনের আলো ফুটতেই প্রথম গুলি সঙ্গে সঙ্গে, এই কথা বলেই দলখভ ঘোড়া ছুটিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু পেতয়া তাকে জড়িয়ে ধরল।
চেঁচিয়ে বলল, সত্যি! আপনি কত বড় বীর। আঃ, কী সুন্দর, কী চমৎকার! আপনাকে আমি কত ভালোবাসি!
ঠিক আছে, ঠিক আছে! দলখভ বলল। কিন্তু পেতয়া তাকে ছেড়ে দিল না। সেই অস্পষ্ট আলোয় দলখভ দেখল, পেতয়া তার উপর নুয়ে পড়েছে, তাকে চুমো খেতে চাইছে। দলখভ তাকে চুমো খেল, হাসল, তারপর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
.
অধ্যায়-১০
পাহারাদারের কুটিরে পৌঁছে পেতয়া বারান্দাতেই দেনিসভের দেখা পেল। পেতয়াকে যেতে দিয়ে দেনিসভ তার ফিরে আসার প্রতীক্ষায় উত্তেজনা, উদ্বেগ ও আত্ম-তিরস্কারের ভিতর দিয়ে সময় কাটাচ্ছিল।
সে বলে উঠল, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! হ্যাঁ, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! কিন্তু তুমি কি জান, তোমার জন্য আমি ঘুমতে পারিনি! যাহোক, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। এখন শুয়ে পড়। সকাল হবার আগে এখনো একটু চোখ বুজে নিতে পারব।
