এই অবস্থা। কিন্তু তারা কি ধরনের সৈন্য আর তাদের সংখ্যাই বা কত সেসবই আমাদের অবশ্য জানতে হবে। সেখানে যাবার দরকার হবে। তারা সংখ্যায় কতজন আছে সেটা সঠিক না জেনে আমরা কাজ শুরু করতে পারি না। সুনির্দিষ্ট ও সঠিকভাবে কাজ করতে আমি ভালোবাসি। এখানে–এই দ্রমশায়দের কেউ একজন কি আমার সঙ্গে ফরাসি শিবিরে যেতে পারবেন? আমি একটা বাড়তি ইউনিফর্ম এনেছি।
আমি, আমি…আমি যাব আপনার সঙ্গে, পেতয়া বলল।
দলখভকে লক্ষ্য করে দেনিসভ বলল, আপনার সেখানে যাবার কোনোই দরকার নেই, আর ওকে তো আমি কিছুতেই যেতে দেব না…
এটা আমার পছন্দ! পেতয়া বলে উঠল। কেন আমি যেতে পাব না?
কারণ যাওয়াটা বৃথা।
দেখুন, মাফ করবেন, কারণ…কারণ…আমি যাব, বাস। আপনি আমাকে সঙ্গে নেবেন তো? দলখভের দিকে ফিরে সে বলল।
ফরাসি ঢাক-বাজিয়ে ছেলেটিকে ভালো করে লক্ষ্য করতে করতে দলখভ অন্যমনস্কভাবে বলল, কেন নেব না? দেনিসভকে শুধাল, এই বাচ্চাটা কি অনেকদিন আপনার সঙ্গে আছে?
ওকে আজই ধরা হয়েছে, কিন্তু কিছুই জানে না। ওকে আমার সঙ্গেই রেখে দিচ্ছি।
বেশ, আর অন্যদের কোথায় রেখেছেন? দলখভ জানতে চাইল।
কোথায়? তাদের পাঠিয়ে দিয়েছি, আর একটা রসিদ নিয়েছি, দেনিসভ মুখ লাল করে চেঁচিয়ে বলল। আর আমি সাহস করেই বলছি যে বিবেকের বিরুদ্ধে আমি একটা লোকেরও জীবন নেই। খোলাখুলিই বলছি, একজন সৈনিকের সম্মানকে কলংকিত করার পরিবর্তে ত্রিশ অথবা তিনশো লোককে কড়া পাহারায় শহরে পাঠিয়ে দেওয়া কি আপনার পক্ষে কঠিন কাজ হত।
নিরাসক্ত ব্যঙ্গের সুরে দলখভ বলল, এই মোল বছরের কাউন্টের মুখে এসব অমায়িক কথা মানায়, কিন্তু আপনি এসব কথা বন্ধ করুন।
পেতয়া সলজ্জ ভঙ্গিতে বলল, সে কি? আমি তো কিছু বলিনি! শুধু বলেছি, আপনার সঙ্গে অবশ্যই যাব।
দলখভ বলতে লাগল, দেখুন, আপনার আর আমার পক্ষে এ ধরনের কথা এখন বন্ধ করাই ভালো। আচ্ছা, এই ছেলেটাকে আপনার কাছে রেখেছেন কেন? ওর জন্য দুঃখ হচ্ছে বলে তো! আপনার এই রসিদের ব্যাপারটা কি আমরা জানি না? আপনি পাঠালেন একশো আর সেখানে পৌঁছল ত্রিশ। বাকিরা হয় না খেয়ে মরে, নয় তো তাদের মেরে ফেলা হয়। সুতরাং তাদের না পাঠানোটাও কি আসলে একই ব্যাপার নয়?
সঙ্গীটি তার হাল্কা রঙের চোখ দুটি কুঁচকে সমর্থনসূচক ঘাড় নাড়ল।
সেটা কথা নয়। ব্যাপারটা নিয়ে আমি আলোচনা করতে চাই না। আমি শুধু এটাকে আমার বিবেকের উপর চাপিয়ে দিতে চাই না। আপনি বলছেন তারা তো মরবেই। ঠিক আছে। কিন্তু আমি তো মারছি না!
দলখভ হাসতে লাগল।
বিশবার তো পার হয়ে গেল, কে তাদের বলেছিল আমাকে গ্রেপ্তার না করতে আমাকে ধরতে পারলে তো একটা অস্পেন গাছেই ঝুলিয়ে দিত, আর যত উদারতাই দেখান আপনারও সেই একই হাল হত। সে থামল। যাই হোক, আমাদের কাজ তো চালাতেই হবে। কসাককে আমার কিটটা আনতে বলুন। তাতে দুটো ফরাসি ইউনিফর্ম আছে। দেখ হে, তুমি আমার সঙ্গে যাচ্ছ তো? সে পেতয়াকে শুধাল।
আমি? হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়, প্রায় অশ্রুসজল চোখে দেনিসভের দিকে তাকিয়ে পেতয়া বলল।
দেনিসভের সব আপত্তির জবাবে পেতয়া শুধু বলল, যেন তেন প্রকারের বদলে সঠিকভাবে সব কাজ করতে সেও অভ্যস্ত, আর ব্যক্তিগত বিপদের কথা সে কখনো ভাবে না।
কারণ আপনি নিশ্চয় স্বীকার করবেন যে ওখানে তারা কতজন আছে সেটা যদি আমরা না জানতে পারি…তার উপর নির্ভর করছে শত শত জীবন, আর এদিকে আমরা মাত্র দুজন। তাছাড়া, আমার যাবার একান্ত ইচ্ছা, আমি যাবই, কাজেই আমাকে বাধা দেবেন না, সে বলল। তার ফল আরো বেশি খারাপ হবে…
.
অধ্যায়-৯
ফরাসি গ্রেটকোট ও শাকো গায়ে চড়িয়ে পেতয়া আর দলখভ ঘোড়ায় চেপে সেই ভোলা জায়গাটায় গেল যেখান থেকে দেনিসভ ফরাসি শিবিরটা দেখতে পেয়েছিল। তারপর গাঢ় অন্ধকারে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে খড়ি বেয়ে নামতে লাগল। নিচে পোঁছে দলখভ সঙ্গী কসাকদের সেখানেই অপেক্ষা করতে বলে রাস্তাটা ধরে সেতুর দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। উত্তেজনায় অধীর হয়ে পেতয়া চলল তার পাশে পাশে।
ফিসফিস করে বলল, যদি ধরা পড়ি আমাকে ওরা জীবন্ত গ্রেপ্তার করতে পারবে না। আমার সঙ্গে পিস্তল আছে।
অতি দ্রুত ফিসফিস করে দলখভ বলল, রুশ ভাষায় কথা বলল না, আর ঠিক সেইমুহূর্তে অন্ধকারের ভিতর থেকে তাদের কানে এল, Qui vive (কে যায়?) আর একটা বন্দুকের ধাতব শব্দ।
পেতয়ার মুখে রক্ত উঠে এল, পিস্তলটা চেপে ধরল।
দলখভ ফরাসিতে জবাব দিল, বর্শাধারী ষষ্ঠ রেজিমেন্ট। ঘোড়ার গতি সে কমালও না, বাড়ালও না।
সেতুর উপর শান্ত্রীর কালো মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে।
সংকেতবাক্য?
ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে দলখভ পায়ে হাঁটা গতিতে এগিয়ে চলল। প্রশ্ন করল, কর্নেল জেরার্দ এখানে আছে কি না বল?
কোনও জবাব না দিয়ে তার পথ আটকে শান্ত্রী আবার বলল, সংকেতবাক্য?
একজন অফিসার যখন রোদে বের হয় তখন শান্ত্রীরা তার কাছে সংকেতবাক্য শুনতে চায় না, দলখভ সহসা গর্জে শান্ত্রীকে লক্ষ্য করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। আমি জানতে চাইছি, কর্নেল এখানে আছে কি না?
শান্ত্রী একপাশে সরে দাঁড়াল, তার জবাবের জন্য অপেক্ষা না করে দলখভ ধীর গতিতে ঘোড় চালিয়ে দিল।
একটি অস্পষ্ট মনুষ্য মূর্তিকে রাস্তা পার হতে দেখে দলখভ তাকে থামিয়ে কমান্ডার ও অফিসাররা কোথায় আছে জানতে চাইল। বস্তা কাঁধে সেই সৈনিকটি থামল, দলখভের ঘোড়র কাছে এগিয়ে গেল, ঘোড়র গায়ে হাত দিয়ে দেখল, তারপর সহজভাবে বন্ধুর মতো বুঝিয়ে বলল যে কমান্ডার ও অফিসাররা পাহাড়ের আরো উঁচুতে ডান দিকের একটা গোলাবাড়ির উঠোন রয়েছে।
রাস্তার দুই পাশে শিবির-আগুনকে ঘিরে ফরাসিদের কথাবার্তা কানে এল। তার ভিতর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে দলখভ-সেই উঠোনের দিকে এগিয়ে গেল। ভিতরে ঢুকে ঘোড়া থেকে নেমে সে একটা বড় জ্বলজ্বলে শিবির আগুনের দিকে এগিয়ে গেল। আগুনটা ঘিরে কয়েকজন জোর গলায় কথা-বার্তা বলছে। আগুনের এক কোণে একটা ছোট গামলায় কি যেন সিদ্ধ হচ্ছে। খাড়া টুপি ও নীল ওভারকোট পরা একটি সৈনিক পাশে হাঁটু গেড়ে বসে একটা কাঠি দিয়ে তার ভিতরকার বস্তুটাকে নাড়ছে।
