মুখ লাল করে পেতয়া বলল, দয়া করে ওটা রেখে দিন। আমার ওরকম আরো আছে। হঠাৎ সে চেঁচিয়ে বলল, হা ঈশ্বর! আমি তো একেবারেই ভুলে গেছি। আমার কাছে কিছু কিসমিস আছে, খুব ভালো জিনিস, একেবারে বিচি নেই। আমাদের সঙ্গে একজন নতুন দোকানি এসেছে, সে খুব ভালো ভালো জিনিস রাখে। আমি দশ পাউন্ড কিনে নিয়েছি। মিষ্টি কিছু খাওয়াটা আমার অভ্যাস। আপনাদেরও চাই তো?…পেতয়া ছুটে বারান্দায় বেরিয়ে গেল এবং কয়েকটা থলে ভর্তি প্রায় পাঁচ পাউন্ড কিসমিস নিয়ে ফিরে এল। আপনারা কিছু নিন, কিছু, নিন!
সঙ্গীটিকে জিজ্ঞাসা করল, আপনার একটি কফি-পাত্র চাই, তাই না? দোকানির কাছ থেকে আমি একটা চমৎকার কফি-পাত্র কিনেছি। তার জিনিসপত্রগুলোই চমৎকার। আর লোকটি খুব সৎ, সেটাই বড় কথা। আপনাকে একটা পাঠিয়ে দেব। আর আপনার চকমকি পাথরগুলো বোধ হয় অকেজো হয়ে গেছে, বা ক্ষয় হয়ে গেছে–মাঝে মাঝে ওরকম হয়। আমার সঙ্গেই কিছু পাথর আছে, এই দেখুন না-একটা থলে দেখাল-একশো পাথর আছে। খুব সস্তায় কিনেছি। যতগুলি চান নিয়ে নিন, দরকার হলে সবগুলিও…।
পরক্ষণেই বড় বেশি কথা বলে ফেলছে ভেবে সে হঠাৎ চুপ করে গেল। মনে করতে চেষ্টা করল, এই রকম বোকামির কাজ আর কিছু করেছে কি না। সারাদিনের ঘটনার কথা ভাবতে গিয়ে ঢাক-বাজিয়ে ছোকরাটার কথা মনে পড়ে গেল। এখানে আমরা তো তোফা আছি, কিন্তু তার কি হল? এরা তাকে কোথায় রেখেছে? তাকে খেতে দিয়েছে তো? তার মনে আঘাত দেয়নি তো? চকমকি পাথর নিয়ে অনেক কথা বলে ফেলায় এখন আর তার কথা বলতে সাহস হল না।
ভাবল, তার কথা যদি জিজ্ঞাসা করি তো বলবে : ও নিজে ছেলেমানুষ, তাই ছোট ছেলের প্রতি করুণা দেখাচ্ছে। কাল দেখিয়ে দেব আমি ছেলেমানুষ কি না। আহা, ছেলেটার কথা জিজ্ঞাসা করলে কি খারাপ শোনাবে? ঠিক আছে, যা হয় হবে।
সে শুধাল, যে ছেলেটিকে বন্দি করা হয়েছে তাকে ডেকে এনে কিছু খেতে দিতে পারি কি?…হয় তো…
দেনিসভ বলল, সত্যি, ছেলেটা বেচারি। তাকে ডেকে আন। তার নাম ভিনসেন্ট বোসে। তাকে ডেকে পাঠাও।
আমিই ডেকে আনছি, পেতয়া বলল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ডাকো। বেচারি, দেনিসভ কথাটা আর একবার বলল।
পেতয়া তখন দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল। অফিসারদের ফাঁক দিয়ে গলে সে দেনিসভের কাছে এসে বলল, আপনাকে একবার চুমো খেতে দিন। আঃ, আপনি কত ভালো, কত চমৎকার!
দেনিসভকে চুমো খেয়ে সে দৌড়ে কুটির থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজার বাইরে থেকে চেঁচিয়ে ডাকল, বোসে! ভিনসেন্ট।
অন্ধকারে কে যেন শুধাল, কাকে চান স্যার?
পেতয়া জবাব দিল, যে ফরাসি ছেলেটিকে সেদিনই গ্রেপ্তার করা হয়েছে সে তাকেই খুঁজছে।
ওঃ, ভেসেন্নি? একজন কসাক বলল।
ছেলেটির নাম ভিনসেন্ট। ইতিমধ্যেই কসাকরা তাকে ভেসেন্নি এবং চাষী ও সৈনিকরা ভেসনিয়া বানিয়ে ফেলেছে। দুটো নামকরণেই বসন্ত (ভেসনা) কথাটার ইঙ্গিত রয়েছে, ছেলেটি সকলের মনে বসন্তের আমেজই এনে দিয়েছে।
ওখানে আগুনের পাশে বসে শরীরটা গরম করছে। হো, ভেসেনিয়া! ভেসেনিয়া!–ভেসেন্নি! অন্ধকারেই তারা হাসাহাসি করে ডাকতে লাগল।
পাশে দাঁড়ানো একটি হুজার বলল, ছেলেটা বেশ চটপটে। কিছুক্ষণ আগেই আমরা তাকে কিছু খেতে দিয়েছি। তার ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছিল।
অন্ধকারে কাদার ভিতর দিয়ে ছুটে আসা খালি পায়ের শব্দ শোনা গেল। ঢাক-বাজিয়ে ছেলেটি দরজায় হাজির।
পেতয়া ফরাসিতে বলল, আরে, এই যে তুমি! কিছু খাবে কি? কোনো ভয় নেই, ওরা তোমাকে মারবে না। এস, ভিতরে এস।
প্রায় শিশুর মতো কাঁপা গলায় ছেলেটি বলল, ধন্যবাদ মঁসিয়। নোংরা পা দুটো চৌকাঠে ঘষতে লাগল।
ছেলেটিকে অনেক কথা বলার ইচ্ছা পেতয়ার ছিল, কিন্তু বলবার সাহস হল না। একটু দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেটির হাত ধরে চাপ দিল। ভিতরে এস, ভিতরে এস!শান্ত মৃদুস্বরে আর একবার কথাটা বলল। দরজাটা খুলে তাকেই আগে ঢুকতে দিল।
ছেলেটিকে ঢুকিয়ে দিয়ে পেতয়া কিছুটা দূরে গিয়ে বসল। তার প্রতি মনোযোগ দেওয়াটা তার পক্ষে মর্যাদাহানিকর বলে মনে হল। পকেটে হাত দিয়ে টাকাগুলি নাড়াচাড়া করতে লাগল। কিছু টাকা ঢাক-বাজিয়ে ছেলেটিকে দিলে কি সেটা হাস্যকর মনে হবে!
.
অধ্যায়-৮
দলখভ এসে পড়ায় পেতয়ার মনোযোগ ঢাক-বাজিয়ে ছেলেটির উপর থেকে সরে গেছে। ইতিমধ্যেই দেনিসভ তাকে দিয়েছে মাংস ও ভদকা, তাকে পরিয়ে দিয়েছে একটা রুশ কোট যাতে অন্য বন্দিদের সঙ্গে পাঠিয়ে না দিয়ে তার দলেই রেখে দেওয়া হয়। সেনাদলে এসে দলখভের অসাধারণ সাহসিকতা ও ফরাসিদের প্রতি নিষ্ঠুরতার অনেক গল্প পেতয়া শুনেছে। তাই সে কুটিরে ঢোকার পর থেকে পেতয়া তার উপর থেকে চোখ সরায়নি, নিজের মনে সাহস এনে মাথা উঁচু করে রেখেছে। যাতে সে এই মহৎ সঙ্গের অনুপযুক্ত না হয়ে পড়ে।
দলখভের চেহারার সরলতায় পেতয়া অবাক হয়ে গেল।
দেনিসভের পরনে কসাক কোট, মুখে দাড়ি, অঘটন-ঘটনকারি নিকলাসের মূর্তি তার বুকে, তার কথা বলার ধরন ও কাজকর্মই বলে দেয় তার অসাধারণ মর্যাদার কথা। কিন্তু যে দলখভ মস্কোতে পরত একটা পারসিক পোশাক, এখন তাকে দেখলে রক্ষীবাহিনীর একজন ঠিক-ঠিক অফিসার বলেই মনে হয়। তার মুখ পরিষ্কার করে কামানো, পরনে রক্ষীবাহিনীর মোটা কোট, বোতামের ঘরে একটা সেন্ট জর্জের স্মরণ ঝোলানো, মাথায় একটা লুট-করা টুপি খাড়া করে বসানো। ভেজা পশমি জোব্বাটা ঘরের এক কোণে খুলে রেখে কারো সঙ্গে কুশল বিনিময় না করে সোজা দেনিসভের কাছে গিয়ে কাজকর্ম সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করতে লাগল। দেনিসভ সব কথাই খুলে বলল।
