সারা মস্কো জুড়ে যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো কথা নেই। আমার দুই ভাইয়ের একজন ইতিমধ্যেই চলে গেছে, আর একজন রক্ষীবাহিনীতে আছে, শীঘ্রই তারাও সীমান্তের পথে পা বাড়াবে। আমাদের প্রিয় সম্রাট পিটার্সবুর্গ ছেড়ে চলে গেছেন; সকলেরই ধারণা, বহুমূল্য জীবন নিয়ে তিনিও রণক্ষেত্রে দর্শন দেবেন। ঈশ্বর করুন, সর্বশক্তিমান কৃপা করে যে দেবদূতকে আমাদের সম্রাট করে পাঠিয়েছেন, তার হাতে যেন ইওরোপের শান্তি ধ্বংসকারী কর্সিকার রাক্ষসটি পর্যদস্ত হয়! ভাইদের কথা তো বলাই বাহুল্য, এই যুদ্ধ আমার অন্তরের একজন নিকটতম সাথীর সঙ্গ থেকেও আমাকে বঞ্চিত করেছে। আমি তরুণ নিকলাস রস্তভের কথা বলছি। অন্তরের উৎসাহ তাকে কর্মহীন থাকতে দেয় নি; বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়ে সে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ায় আমি প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছি। গত গ্রীষ্মকালে এই যুবকটির কথা তোমাকে আমি বলেছি; সে এতই মহৎ-হৃদয়, সত্যিকারের যৌবনদীপ্তিতে তার মন এতই ভরপুর যে আজকালকার বিশ বছরের বুড়োদের মধ্যে তা কদাচিৎ দেখা যায়। তাছাড়া, সে এত দিলখোলা, এত হৃদয়বান যে কি বলব। সে এত পবিত্র ও কাব্যময় যে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব অল্প দিনের হলেও সেই সম্পর্কের স্মৃতি আমার দীন অন্তরের এক মধুরতম সান্ত্বনার স্থল। আমাদের বিদায়ের কথা, অন্য যে সব কথা তখন হয়েছিল, সব একদিন তোমাকে বলব। সে স্মৃতি এখনো এত তাজা যে বলবার মতো নয়। আহা প্রিয় বন্ধু, তুমি কী সুখী যে এই তীব্র আনন্দ ও দুঃখের কথা তোমাকে জানতে হয় নি। তুমি ভাগ্যবতী, কারণ এ সবক্ষেত্রে দুঃখের মাত্রাটাই বড় বেশি হয়ে থাকে! আমি ভালো করেই জানি যে কাউন্ট নিকলাস বয়সে এতই তরুণ যে তার সঙ্গে বন্ধুত্বের অধিক কোনো সম্পর্ক আমার হয় নি; কিন্তু এই মধুর বন্ধুত্ব, এই কাব্যময় পবিত্র ঘনিষ্ঠতা-এর যে আমার বড়ই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এ কথা আর নয়! যে প্রধান সংবাদটি এখন সারা মস্কোর মুখে মুখে ফিরছে সেটি হল বুড়ো কাউন্ট বেজুখভের মৃত্যু ও তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার। ভাবতে পার! তিন প্রিন্সেস পেয়েছে যৎসামান্য, প্রিন্স ভাসিলি কিছুই পায় নি, আর মঁসিয় পিয়ের সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী তো হয়েছেই, তার উপরে সে বৈধ সন্তান হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে; ফলে সেই এখন কাউন্ট বেজুখভ এবং রাশিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পত্তির মালিক। গুজব যে এ ব্যাপারে প্রিন্স ভাসিলি একটি ঘৃণ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন, আর হতাশ হয়ে পিটার্সবুর্গে ফিরে গেছেন।
স্বীকার করছি, এই সব উইল ও উত্তরাধিকারের ব্যাপার-স্যাপার আমি সামান্যই বুঝি; কিন্তু এটা ভালোই জানি, যে যুবকটিকে আমরা এতদিন সাদামাঠা মঁসিয় পিয়ের বলেই জানতাম সে আজ কাউন্ট বেজুখভ হওয়ায় এবং রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সম্পত্তির মালিক হওয়ায় তার প্রতি বিবাহযোগ্য কন্যাদের মামণিদের ও সেই সব কন্যাদের আচার-ব্যবহার ও কথাবার্তায় যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তাতে আমার ভারী মজা লাগছে; অথচ তোমার-আমার মধ্যে বলছি, আমার কিন্তু আগাগোড়াই তাকে একটি বেচারা গোছর লোক বলেই মনে হয়েছে। গত দুবছর ধরে এখানকার লোকজনরা যেমন আমার জন্য স্বামী খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়েছে (যাদের অনেককেই আমি চিনি না পর্যন্ত), তেমনি এখনো আবার মস্কোর ঘটক মহলে জোর গুজব যে আমিই নাকি ভাবী কাউন্টেস বেজুখভা। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে সে পদটির জন্য আমার কোনো বাসনা নেই। হ্যাঁ, বিয়ের প্রসঙ্গে বলি : তুমি কি জান যে এই কিছুক্ষণ আগে সেই সর্বজনীন খালা আন্না মিখায়লভনা আমার কাছে এসে একান্ত গোপনীয় রাখবার শর্তে তোমার বিয়ের একটা প্রস্তাবের কথা বলে গেছেন। সেই ভাবীটি প্রিন্স ভাসিলির ছেলে আনাতোল ছাড়া আর কেউ নয়। কোনো ধনবতী বিশিষ্ট কন্যার সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে তারা ছেলেদের চরিত্রকে সংশোধন করতে ইচ্ছুক, আর সেজন্য তার আত্মীয়স্বজনরা তোমাকেই পছন্দ করেছে। এ বিষয়ে তুমি কি ভাববে আমি জানি না, কিন্তু কথাটা তোমাকে জানানো আমার কর্তব্য বলে মনে করি। শুনেছি সে নাকি খুব সুদর্শন ও ভয়ংকর লম্পট। তার সম্বন্ধে শুধু এইটুকুই জানতে পেরেছি।
কিন্তু এ সব গালগল্প তো অনেক হল। চিঠির দুনম্বর পাতা প্রায় শেষ করে এনেছি; আপ্রাক্সিনদের বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে যাবার জন্য মামণির ডাক এসেছে। মরমিয়াবাদের উপর যে বইখানা পাঠালাম পড়ে দেখো; এখানে বইটার প্রচুর সুখ্যাতি। দুর্বল মানুষের পক্ষে অনেক কিছুই বোঝা শক্ত, তবু এই আশ্চর্য বইটি মনকে। শান্ত করে, উন্নত করে। বিদায়! তোমার বাবা মঁসিয়কে আমার শ্রদ্ধা জানিও, আর মাদময়জেল বুরিয়েকে জানিও আমার প্রীতি। তোমাকে জানাই ভালোবাসাভরা আলিঙ্গন।জুলি
পুনশ্চ। তোমার ভাই ও তার মনোরমা ছোট্ট স্ত্রীটির সংবাদ জানিও।
ঈষৎ হেসে প্রিন্সেস কি যেন ভাবল কিছুক্ষণ; সে হাসিতে তার উজ্জ্বল চোখ দুটি এমনভাবে জলমল করে উঠল যে তার মুখের চেহারাটাই সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। তারপর হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল, ভারি পা ফেলে টেবিলের কাছে গেল। এক তা কাগজ নিয়ে তার উপর দ্রুত হাত চালাতে লাগল। চিঠির জবাব লিখে ফেলল ফরাসিতে :
প্রিয় সোনা বন্ধু,-তোমার ১৩ তারিখের চিঠি আমাকে প্রচুর আনন্দ দিয়েছে। রোমান্টিক জুলি আমার, তাহলে এখন তুমিও আমাকে ভালোবাসা যে বিরহকে তুমি এত খারাপ বলে উল্লেখ করেছ তার স্বাভাবিক প্রভাব তো তোমার উপর পড়েছে বলে মনে হয় না। তুমি আমাদের বিরহের নালিশ জানিয়েছ। আমি যদি নালিশ জানাতে পারতাম, তাহলে কি বলতাম? আমি যে সব প্রিয়জনের সঙ্গসুখ হতে বঞ্চিত হয়ে আছি। আঃ, ধর্মের কাছ থেকে যদি সান্ত্বনা না পেতাম, তাহলে যে জীবন বড়ই দুঃখময় হত। সেই যুবকটির প্রতি তোমার অনুরাগকে আমি বিরূপ চোখে দেখব এ-কথা তুমি ভাবলে কেমন করে? এ সব ব্যাপারে আমি শুধু নিজের উপরেই বিরূপ হই। অপরের বেলায় এ ধরনের মনোভাব আমি বুঝতে পারি; নিজের সে অভিজ্ঞতা না থাকায় আমি তাকে সমর্থন করতে পারি না, কিন্তু তাই বলে নিন্দাও তো করতে পারি না। আমার শুধু মনে হয়, একটি যুবকের সুন্দর দুটি চোখ তোমার মতো একটি রোমান্টিক প্রেমময়ী যুবতীর অন্তরে যে অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে তার তুলনায় খৃস্টিয় ভালোবাসা, প্রতিবেশীকে ভালোবাসা, শত্রুকে ভালোবাসা অনেক মহত্তর, মধুরতর, শ্রেয়তর।
