তিখনের কথা শুনে ও হাসি দেখে পেতয়া যেরকম হাসির দমকে ফেটে পড়েছিল সেটা কেটে যেতে এবং তিখন একটা মানুষকে মেরে ফেলেছে সেকথা বুঝবার পরে পেতয়া খুব অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। সে ঢাক বাজিয়ে ছেলেটার দিকে তাকাল, বুকের মধ্যে একটা ব্যথা অনুভব করল। কিন্তু এ অস্বস্তি শুধু মুহূর্তের জন্য। তার মনে হল, তাকে মাথা উঁচু করে চলতে হবে, সাহস দেখাতে হবে, আগামীকালের অভিযান সম্পর্কে সঙ্গীটির সঙ্গে আলোচনা করতে হবে, যে দলে সে এসে পড়েছে তার উপযুক্ত তাকে হতেই হবে।
যে অফিসারটিকে খবর নিতে পাঠানো হয়েছিল তার সঙ্গে পথেই দেখা হয়ে গেল। সে খবর দিল, দলখভ অচিরেই এসে পড়বে এবং সে বহাল তবিয়তেই আছে।
সঙ্গে সঙ্গে দেনিসভ খুশি হয়ে উঠল। পেতয়াকে কাছে ডেকে বলল : আরে, এবার তোমার কথা বল।
.
অধ্যায়-৭
পরিবারের লোকজনরা মস্কো ত্যাগ করার পরেই পেতয়া তাদের ছেড়ে নিজের রেজিমেন্টে যোগ দেয় এবং অচিরেই একটা বড় গেরিলা দলের অধিনায়ক জেনারেল তাকে আর্দালি হিসেবে নিয়ে নেয়। কমিশন পাবার পর থেকে, বিশেষ করে যবে থেকে সে সক্রিয় সেনাদলে যোগ দিয়েছে এবং ভিয়াজমার যুদ্ধে অংশ নিয়েছে, তখন থেকে বড় হয়ে ওঠার একটা সানন্দ উত্তেজনা তাকে পেয়ে বসেছে, সত্যিকারের বীরত্বপূর্ণ কিছু করবার কোনো সুযোগ যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায় তার জন্য সে সদাসর্বদাই একান্ত তৎপর। সেনাবাহিনীতে এসে সে যা কিছু দেখেছে ও জেনেছে তাতে তার মন আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার এও মনে হয়েছে যে সে যেখানে যেখানে থাকছে না আসল বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধটা সেখানেই ঘটে যাচ্ছে। তাই যেখানে সে নেই সেখানেই ছুটে যেতে তার এত তাড়া।
২১ অক্টোবর তার জেনারেল জানাল যে একজন কাউকে দেনিসভের দলের কাছে পাঠাতে হবে, তখন পেতয়া এমন করুণাভাবে সেখানে যাবার অনুমতি চাইল যে জেনারেল আপত্তি করতে পারল না। কিন্তু পাঠাবার সময় জেনারেলের মনে পড়ে গেল ভিয়াজমার যুদ্ধে পেতয়ার পাগলের মতো কাণ্ড-কারখানা, তাকে যেখানে পাঠানো হয়েছিল, সোজা রাস্তা ধরে সেদিকে না গিয়ে সে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছিল ফরাসি অগ্রবর্তী বাহিনীর একেবারে গোলাগুলির মুখে এবং সেখানে দু দুবার নিজের পিস্তল থেকে গুলি ছুঁড়েছিল। তাই জেনারেল এখন স্পষ্ট করে তাকে বলে দিয়েছে, দেনিসভের কোনো অভিযানে সে অংশ নিতে পারবে না। তাই তো দেনিসভ যখন জিজ্ঞাসা করেছিল সে থেকে যেতে পারবে কি না তখন পেতয়া জবাব দিতে ইতস্তত করেছিল, তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। বনের প্রান্তে উপস্থিত হবার আগে পর্যন্ত পেতয়া ভেবেছিল যে জেনারেলের নির্দেশ সে কঠোরভাবে মেনে চলবে এবং অবিলম্বে ফিরে যাবে। কিন্তু ফরাসিদের দেখতে পেয়ে এবং তিখনকে দেখার পরে যখন সে জানতে পারল যে ফরাসিদের দেখতে পেয়ে এবং তিখনকে দেখার পরে যখন সে জানতে পারল যে সে রাতে নিশ্চয় একটা আক্রমণ চালানো হবে তখন সে হঠাৎ মতটা পাল্টে ফেলে স্থির করে বসল, যে জেনারেলকে সে এতদিন পর্যন্ত শ্রদ্ধা করে এসেছে সে একটি বদখত জার্মান, আর দেনিসভ একজন বীর, সঙ্গীটিও বীর, এমন কি তিখনও বীর, তাই এই সংকটকালে তাদের ছেড়ে যাওয়া তার পক্ষে খুবই লজ্জাজনক ব্যাপার হবে।
দেনিসভ, পেতয়া ও সঙ্গীটি যখন পাহারা-ঘরে পৌঁছল তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। গোধূলির আলোয় ঘোড়াগুলোকে দেখা যাচ্ছে, কসাক ও হুজাররা জঙ্গলের এমন জায়গায় আগুন জ্বালিয়েছে যেখান থেকে ফরাসিরা ধোয়া দেখতে পাবে না। ছোট পাহারা-ঘরের বারান্দায় জনৈক কসাক আস্তিন গুটিয়ে মাংস কাটছে। ঘরের মধ্যে দেনিসভের দলের তিনটি অফিসার একটা দরজাকে টেবিলের উপরকার কাঠে রূপান্তরিত করছে। পেতয়া ভেজা পোশাক ছেড়ে সেগুলো শুঁকতে পাঠিয়ে সঙ্গে সঙ্গে খাবার টেবিল পাতার কাজে অফিসারকে সাহায্য করতে লেগে গেল।
দশ মিনিটের মধ্যে টেবিল তৈরি হয়ে গেল, একটা তোয়ালেও বিছিয়ে দেওয়া হল। টেবিলের পরিবেশন করা হল ভদকা, এক ফ্লাস্ক রাম, শাদা রুটি, ঝলসানো মাংস ও নুন।
অফিসারদের সঙ্গে টেবিলে বসে দুই হাতে চর্বিওয়ালা সুস্বাদু মাংস ছিঁড়তে ছিঁড়তে পেতয়ার মনে সকলের জন্য একটা শিশুসুলভ রোমাঞ্চকর ভালোবাসা জেগে উঠল, ফলে তার মনেও বিশষাস জন্মাল যে অন্যরাও তাকে সেইভাবেই ভালোবাসে।
সে দেনিসভকে বলল, আচ্ছা ভাসিলি দিমিত্রিচ, আপনি কি মনে করেন, আমার এখানে এই কটা দিন থাকা কি ঠিক হবে? জবাবের জন্য অপেক্ষা না করে সে নিজেই জবাবটা দিল : দেখুন, আমাকে বলা হয়েছিল খুঁজে বের করতে–তা আমি তো খুঁজছি…শুধু আমাকে একেবারে ভিতরে…মানে আসল ঘটনার মধ্যে যেতে দেবেন…আমি কোনো পুরস্কার চাই না…কিন্তু আমি চাই…
পিছনে হেলান দিয়ে হাত নেড়ে দাঁতে দাঁত চেপে পেতয়া চারদিকে তাকাতে লাগল।
দেনিসভ হেসে বলল, একেবারে প্রধান ঘটনার মধ্যে…
পেতয়া বলতে লাগল, শুধু দয়া করে আমাকে একটু পরিচালনার দায়িত্ব দিন, যাতে আমি সত্যি পরিচালনার সুযোগটা পাই। তাতে আপনার কি আসে-যায়?…ও হো, আপনার একটা ছুরি চাই। জনৈক অফিসারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে পেতয়া বলল।
একটা ভাঁজ-করা ছুরি তার দিকে এগিয়ে দিল। অফিসার ছুরিটার প্রশংসা করল।
