দলের মধ্যে সেই সবচাইতে সাহসী ও দরকারি লোক। আক্রমণের অধিকতর সুযোগ আর কেউ পায়নি, আর কেউই তার চাইতে বেশি ফরাসিদের গ্রেপ্তার করতে বা মারতে পারেনি, ফলে সব কসাক ও হুজাররাই তাকে ভাঁড় বানিয়ে তুলেছে, আর সেও স্বেচ্ছায় সে ভূমিকাটিকে মেনে নিয়েছে। গত রাতে দেনিসভ তাকে আমশেতভা পাঠিয়েছে একটি জিভকে গ্রেপ্তার করে আনতে। কিন্তু হয় মাত্র একটি ফরাসিকে নিয়ে আসতে তার মন চায়নি, অথবা সারা রাত ঘুমিয়ে কাটিয়েছে, কারণ যাই হোক এখন দিনের বেলায় ঝোঁপ-ঝাড়ের ভিতর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে একেবারে ফরাসিদের আওতার মধ্যে ঢুকে পড়েছে এবং–উপর থেকে দেনিসভ যে-রকমটা দেখতে পেয়েছে-ফরাসিরাও তাকে ঠিক দেখতে পেয়েছিল।
.
অধ্যায়-৬
পরদিনের আক্রমণ সম্পর্কে সঙ্গীর সঙ্গে কিছু কথা বলে দেনিসভ ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে ফিরে চলল।
পেতয়াকে বলল, চল হে ছেলে, এবার গিয়ে শরীরটাকে শুকিয়ে নেওয়া যাক।
পাহারা-ঘরে পৌঁছে দেনিসভ থেমে জঙ্গলের দিকে ভালো করে তাকাল। গাছপালার ভিতর দিয়ে একটি লোক লম্বা হাল্কা পায়ে এগিয়ে আসছে। তার পা দুটি লম্বা, লম্বা হাত দুটি দুপাশে ঝুলছে, পরনে খাটো কুর্তা, বাকলের জুতা ও কাজান টুপি। তার কাঁধে একটা ছোট বন্দুক, আর কোমরবন্ধে একটা কুড়ল গোঁজা। দেনিসভকে দেখেই সে তাড়াতাড়ি কি একটা যেন ঝোঁপের মধ্যে ছুঁড়ে দিল, মাথার ভিজে টুপিটা খুলল। তারপর কমান্ডারের দিকে এগিয়ে গেল। লোকটি তিখন। বলিরেখা ও ছোট ছোট গর্তেভরা মুখ ও ক্ষুদে ক্ষুদে চোখ দুটি আত্মতৃপ্তির খুশিতে ঝিলমিল করছে। মাথাটা তুলে যেন একটা হাসিকে চেপে রেখে দেনিসভের দিকে তাকাল।
আচ্ছা, তুমি কোথায় উধাও হয়েছিলে? দেনিসভ শুধাল।
ফ্যাঁসফেঁসে অথচ সুরেলা মোটা গলায় তিখন সাহসের সঙ্গে তাড়াতাড়ি জবাব দিল, কোথায় উধাও হয়েছিলাম? আমি তো গিয়েছিলাম ফরাসিদের ধরে আনতে।
দিনের আলোয় ওখানে ঢু মেরেছিলে কেন? গাধা কোথাকার! আচ্ছা, একটাকেও আননি কেন?
আহা, একটাকে তো ঠিকই এনেছিলাম, তিখন বলল।
সে কোথায়?
দেখুন, খুব ভোরেই তাকে ধরেছিলাম, তিখন বলতে লাগল। তাকে জঙ্গলে নিয়ে এলাম। পরে বুঝলাম তাকে দিয়ে কোনো কাজ হবে না। তাই ভাবলাম আবার গিয়ে একটু ভালো কাউকে আনব।
দেনিসভ সঙ্গীকে বলল, দেখলে তো?…কী শয়তান–ঠিক যা ভেবেছিলাম। তাকেই নিয়ে এলে না কেন?
তিখন সঙ্গে সঙ্গে সক্রোধে বলে উঠল, তাকে এনে কি লাভ হত? তাকে দিয়ে আপনার কাজ হত না। আপনার কি রকম লোক চাই তা যেন আমি জানি না!
তুমি একটা জানোয়ার!…তারপর?
তিখন বলতে লাগল, আর একজনের খোঁজে গেলাম। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এইভাবে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে শুয়ে পড়লাম। (হঠাৎ সে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল।) একজন এসে হাজির হল, অমনি তাকে জাপটে ধরলাম, এইভাবে। (সে লাফিয়ে উঠল। বললাম, চল কর্নেলের কাছে। সে চেঁচাতে শুরু করে দিল, আর হঠাৎ তারা চারজন হয়ে গেল। ছোট ছোট তলোয়ার নিয়ে তারা আমার দিকে ধেয়ে এল। আমিও কুড় ল নিয়ে রুখে দাঁড়ালাম, এইভাবে : বললাম, তোমরা কি করতে চাও? খ্রিস্ট তোমাদের সহায় হোন! বুকটা চিতিয়ে ক্রুদ্ধ গলায় চিৎকার করে হাত নেড়ে চোখ মিটমিটি করে তাকিয়ে সঙ্গীটি বলল, যা, তুমি যে জলের ভিতর দিয়ে কীভাবে পালাচ্ছিলে সেটা আমরা পাহাড়ের উপর থেকে দেখেছি।
পেতয়ার ভীষণ হাসি পেল, কিন্তু তারা কেউই হাসল না। এসবের অর্থ কি বুঝতে না পেরে সে একবার তিখনের মুখের দিকে, একবার সঙ্গীটির এবং একবার দেনিসভের মুখের দিকে তাকাতে লাগল।
রাগে কাশতে কাশতে দেনিসভ বলল, ওসব ভাঁড়ামি রাখ! প্রথমটিকেই কেন ধরে আনলে না?
তিখন এক হাতে পিঠ ও অন্য হাতে মাথা চুলকোতে লাগল, তারপর হঠাৎ বোকার মতো দন্তপাটি বিকশিত করল, ফলে একটা পড়া দাঁতের ফোকলা জায়গাটা বেরিয়ে পড়ল। (এই জন্যই তাকে শচেরবাতি–অর্থাৎ ফোকলা-দাতি বলে ডাকে)। দেনিসভ মুচকি হাসল, পেতয়া খুশিতে হো-হো করে হেসে উঠল। তিখনো সে হাসিতে যোগ দিল।
তিখন বলল, আহা, সে যে একেবারেই অকর্মার ধাড়ি। তার পোশাক-তাও বাজে! তাকে আনি কেমন করে? আর কী অভদ্র ইয়োর অনার। বলে কি না, আমি নিজেই তো একজন জেনারেলের ছেলে, আমি যাব না!
দেনিসভ বলল, তুমি একটা জানোয়ার। আমি চেয়েছিলাম তাকে প্রশ্ন করে…
তিখন বলল, কিন্তু আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম। সে বলল বিশেষ কিছু জানে না। আরো বলল, আমরা তো অনেকে রয়েছি, কিন্তু সকলেই এলেবেলে-নামেই সৈনিক। জোর গলায় একটা হাঁক দাও, দেখবে সবগুলো ধরা দেবে। দেনিসভের চোখে চোখ রেখে তিখন হেসে ফেলল।
তোমাকে একশো চাবুক লাগাব-ভঁড়ামি করার মজা দেখিয়ে দেব! দেনিসভ রুক্ষকণ্ঠে বলল।
তিখন সক্ষোভে বলল, কিন্তু আপনি রাগ করছেন কেন? এমন ভাবে দেখাচ্ছেন যেন আপনার ফরাসিদের আমি চোখেই দেখিনি। অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত সবুর করুন, আপনার যে কজন চাই এনে দেব–চান তো তিন জনকে এনে দেব।
ঠিক আছে, এবার চলা যাক, বলে দেনিসভ ঘোড় চালিয়ে দিল, পাহারা-ঘর পর্যন্ত রাগে ভুরু কুঁচকে চুপচাপ চলতে লাগল।
তিখন কিছুটা পিছিয়ে পড়ল। পেতয়া শুনতে পেল, তিখন যে বুটজোড়া ঝোঁপের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছিল তা নিয়ে কসাকরা তিখনের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করছে।
