চোখ মিটমিট করতে করতে দেনিসভ বলল, দলখভ আসুক আর না আসুক, আমরা ওদের দখল করবই।
সঙ্গী বলল, জায়গাটা খুবই উপযুক্ত।
দেনিসভ বলল, ঠিক আছে, জলাভূমির পাশ দিয়ে পদাতিক সেনাদের পাঠাও।
তারা বাগানটা পর্যন্ত ধেয়ে যাবে। তুমি কত্সকদের নিয়ে ওখানে গিয়ে ঘিরে ফেলবে-সে গ্রামের ওপারে জঙ্গলের মধ্যে একটা জায়গা দেখাল-আর হুজারদের নিয়ে আমি যাব এখান থেকে। আর সংকেত করা মাত্রই গুলি…
সঙ্গী বলল, গহ্বরটা অনতিক্ৰমণীয়-ওখানেও একটা জলাভূমি আছে। ঘোড়াগুলো ডুবে যাবে। আমাদের ঘোড়া ছুটিয়ে যেতে হবে আরো বদিক দিয়ে…
তারা যখন নিচু গলায় কথা বলছে সেই সময় পুকুরের পাশের নিচু জমিটা থেকে একটা গুলির শব্দ হল, একটা শাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলি দেখা গেল, তারপর আর একটা, আর সঙ্গে সঙ্গে নিচের ঢালু জায়গাটা থেকে শত শত ফরাসির খুশির হৈ-হল্লা শোনা গেল। মুহূর্তের জন্য দেনিসভ ও তার সঙ্গী সরে গেল। তারা এত কাছে চলে গিয়েছিল যে তারা ভাবল যে তারাই এই গুলি ও হৈ-হল্লার কারণ। কিন্তু তাদের জন্য সেসব হয়নি। আরো নিচে একটা লোক লাল পোশাক পরে জলাভূমির ভিতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল। ফরাসিরা তাকে লক্ষ্য করেই গুলি ছুঁড়েছে, চেঁচামেচি করেছে।
সঙ্গীটি বলল, সে কি, ও যে আমাদের তিখন।
তাই তো! তাই তো!
রাঙ্কেল। দেনিসভ বলল।
ও ঠিক চলে যাবে, চোখ কুঁচকে সঙ্গী বলল।
যাকে ওরা তিখন বলল সে দৌড়ে নদীর কাছে গিয়ে জলে ঝাঁপ দিল, জল ছিটকে উঠল, মুহূর্তের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেল, তারপর হাত-পা ছুঁড়ে জল থেকে উঠেই ছুট লাগাল। ফরাসিরা তার পিছু নিয়ে শেষটা থেমে গেল।
লোকটা চালাক আছে, সঙ্গীটি বলল।
বিরক্ত মুখে দেনিসভ বলল, কি জানোয়ার রে বাবা। এতক্ষণ ও কি করছিল?
লোকটা কে? পেতয়া শুধাল।
আমাদের প্লাস্তুন (পদাতিক বন্দুকবাজ)। একটা জিভকে ধরে আনতে ওকে পাঠিয়ে ছিলাম।
ওঃ, তাই, পেতয়া এমন ভাবে মাথা নেড়ে কথাটা বলল যেন সে সবকিছু বুঝতে পেরেছে, আসলে কিন্তু সে কিছুই বোঝেনি।
তিখন শচেরবাতি তাদের দলের অপরিহার্য লোকদের অন্যতম। সে গঝাত নদীর কাছাকাছি পক্ৰোভস্কের একজন চাষী। কাজের ভার নিয়ে দেনিসভ যখন প্রথম পক্রোস্কে এসেছিল এবং গ্রাম-প্রাধানকে ডেকে ফরাসিদের খোঁজ-খবর জানতে চেয়েছিল তখন অন্যসব গ্রাম-প্রধানদের মতোই নিজেকে বাঁচাবার জন্য সে বলেছিল, কোনো ফরাসিকে সে দেখেনি, বা তাদের সম্পর্কে কিছু শোনেও নি। কিন্তু দেনিসভ যখন বুঝিয়ে বলল যে ফরাসিদের মেরে ফেলাই তার উদ্দেশ্য, আর তাই সে জানতে চাইছে সে অঞ্চলে কোনো ফরাসি এসেছে কি না, তখন গ্রাম-প্রধান জবাবদিল যে কিছু লুটেরা তাদের গ্রামে এসেছিল, কিন্তু একমাত্র তিখন শচেরবাতিই তাদের খোঁজ খবর রাখে। দেনিসভ তিখনকে ডাকিয়ে এনে তার কাজকর্মের অনেক প্রশংসা করে গ্রাম-প্রধানের সামনেই জার ও দেশের প্রতি আনুগত্য এবং পিতৃভূমির সব সন্তানেরই যে ফরাসিদের ঘৃণা করা উচিত সে বিষয়ে কিছুকথা বলেছিল।
দেনিসভের কথায় ভয় পেয়ে তিখন বলেছিল, আমরা তো ফরাসিদের কোনো ক্ষতি করিনি। কি জানেন, তাদের নিয়ে একটু মজা করেছি আর কি। জনবিশেকের মতো লুটেরাদের মেরে ফেলেছি বটে, কিন্তু আর কারো কোনো ক্ষতিতো করিনি…।
পরদিন চাষীটির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে দেনিসভ যখন পক্রোভঙ্ক ছেড়ে চলে গেল তখন তাকে জানানো হল যে তিখন তাদের দলে যোগ দিয়েছে এবং তাদের সঙ্গে থাকার অনুমতি চাইছে। দেনিসভ অনুমতি দিয়েছে।
প্রথম দিকে তিখন আজেবাজে কাজগুলি করত, আগুন জ্বালাত, জল আনত, মরা ঘোড়ার চামড়া ছাড়া, ইত্যাদি, কিন্তু অচিরেই দলীয় লড়াইয়ের প্রতি তার আকর্ষণ ও মোগ্যতার পরিচয় পাওয়া গেল। রাতের বেলা লুঠতরাজ করতে বেরিয়ে ফরাসিদের পোশাক ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসত, বলে দিলে কিছু বন্দিও ধরে আনত। তখন দেনিসভ তাকে আজেবাজে কাজ থেকে মুক্তি দিয়ে অভিযানে বের হবার সময় তাকে সঙ্গে নিত এবং তাকে কসাকদের সঙ্গে ভর্তি করে নিল।
তিখন ঘোড়ায় চড়তে ভালোবাসে না, সব সময় পায়ে হেঁটে চলে, কিন্তু কখনো অশ্বারোহীদের থেকে পিছনে পড়ে থাকে না। তার সঙ্গে থাকে একটা ছোট বন্দুক, একশো বর্শা ও একটু কুড় ল। তিখন খুব ভাললাভাবে কাঠ চিড়তে পারে, কুড়ল দিয়ে ছোট ছোট কাঠের পেরেক ও চামচে বানাতে পারে। দেনিসভের দলে তার একটা বিশিষ্ট আসন তৈরি হয়েছে। যখনই বিশেষ কষ্টকর ও বাজে কোনো কাজ করার দরকার হয়-একটা গাড়িকে কাদার ভিতর থেকে ঠেলে তোলা, লেজ ধরে টেনে একটা ঘোড়াকে জলাভূমির ভিতর থেকে বের করে আনা, তার ছাল ছাড়ানো, ফরাসিদের মধ্যে ঢুকে পড়া, অথবা একদিনে ত্রিশ মাইলের বেশি হাঁটা-তখন সকলেই হাসতে হাসতে তিখনকে দেখিয়ে দেয়।
সকলেই বলে, এতে শয়তানটার কিছু হবে না-ও তো ঘোড়ার মতো শক্তি রাখে।
একবার তিখন একটি ফরাসিকে গ্রেপ্তার করবার চেষ্টা করলে ফরাসিটি পিস্তল ছুঁড়ে তার পিঠের মাংসল জায়গাটাতে গুলি করেছিল। ভদকা খেয়ে ও তার প্রলেপ লাগিয়েই তিখন সে ঘাটা সারিয়ে তুলেছিল। সেই থেকে দলের সকলেই ঘটনাটা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে, আর তিখনও হাসিমুখে তাতে যোগ দেয়।
কসাকরা তাকে ক্ষেপাবার জন্য বলে, হ্যালো সাঙাৎ! আর কখনো যাবে? কেমন একখানা দিয়েছে? তিখন রাগের ভান করে ইচ্ছা করেই চোখ-মুখ পাকিয়ে ফরাসিদের সম্পর্কে নানারকম হাসির কথা বলে। এই ঘটনায় তিখনের আচরণে একটাই পরিবর্তন দেখা গেল–আহত হবার পর থেকে সে আর কাউকে বন্দি করে আনে না।
