বলল, জেনারেলের কাছ থেকে। খামটা শুকনো নেই বলে ক্ষমা করবেন।
ভুরু কুঁচকে দেনিসভ খামটা নিয়ে খুলে ফেলল।
লভায়েস্কিকে লক্ষ্য করে অফিসারটি বলল, সেখানে সকলেই অনবরত বলেছে: এটা বিপজ্জনক, এটা বিপজ্জনক। কিন্তু কমারভ ও আমি কসাকটিকে দেখাল প্রস্তুত ছিলাম। আমাদের প্রত্যেকের একটা করে পিস্তল আছে।…কিন্তু এ কে? ঢাক-বাজিয়ে ছোকরাকে দেখে সে প্রশ্ন করল। কোনো বন্দি কি? আপনারা এরই মধ্যে লড়াই শুরু করে দিয়েছেন? ওর সঙ্গে কথা বলতে পারি কি?
চিঠিটা পড়ে দেনিসভ চেঁচিয়ে বলল, রস্তভ! পেতয়া! কেন বলনি তুমি কে? সে হেসে তরুণের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিল।
অফিসারটি পেতয়া রস্তভ।
সারাটা পথ পেতয়া নিজেকে তালিম দিতে দিতে এসেছে-পূর্ব পরিচয়ের কথা না জানিয়ে দেনিসভের সঙ্গে একজন বয়স্ক লোকের মতোই ব্যবহার করবে। কিন্তু দেনিসভ হেসে উঠতেই পেতয়ার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল, খুশিতে তাতে লালে ছোপ লাগল, এতক্ষণ পর্যন্ত যে সরকারি আদব-কায়দার তালিম নিচ্ছিল সেটা ভুলে গিয়ে দেনিসভকে বলতে লাগল, ইতিমধ্যেই ভিয়াজমার কাছে একটা যুদ্ধে সে অংশ নিয়েছে, এবং হুজার হিসেবে সেখানে বেশ বিখ্যাত হয়ে উঠেছে।
দেনিসভ তাকে বাধা দিয়ে বলল, তোমাকে দেখে খুশি হলাম। তার মুখে আবার উদ্বেগের চিহ্ন ফুটে উঠল।
সঙ্গীকে বলল, মাইকের ফিয়কলিতিফ, জান আবার সেই জার্মানের চিঠি। পেতয়াকে দেখিয়ে বলল, ও তো তার অধীনেই আছে।
দেনিসভ সঙ্গীকে জানাল, চিঠিতে জার্মান জেনারেলটি আবারও সেই দাবিই জানিয়েছে যে যানবাহনের উপর আক্রমণ চালাতে সে যেন তার সঙ্গে হাত মেলায়।
তারপর বলল, আমরা যদি এ সুযোগ না নেই, তাহলে কাল সেই আমাদের নাকের উপর দিয়ে সুযোগটা ছিনিয়ে নেবে।
নতুন করে অ্যাডজুটান্ট ও জেনারেলের খেলা শুরু করে পেতয়া অভিবাদনের ভঙ্গিতে হাত তুলে বলল, কোনো হুকুম দেবেন কি ইয়োর অনার? না কি আমি আপনার সঙ্গেই থাকব?
হুকুম? দেনিসভ চিন্তিত ভাবে বলল। তুমি কি কাল পর্যন্ত থাকতে পারবে?
আহা, তাই করুন…আমি আপনার সঙ্গে থাকতে পারি কি? পেতয়া চেঁচিয়ে বলল।
দেনিসভ শুধাল, কিন্তু জেনারেল তোমাকে ঠিক কি বলে দিয়েছে। এখনি ফিরতে বলেছে কি?
পেতয়ার মুখ লাল হয়ে উঠল।
তিনি কিছুই বলেননি। আমার তো মনে হয় থাকতে পারি।
দেনিসভ বলল, বেশ, ঠিক আছে।
নিজের লোকদের দিকে ফিরে একটা দলকে বিশ্রামস্থলে যেতে বলল, জায়গাটা জঙ্গলের মধ্যে পাহারাদারের কুটিরের কাছে, কিরঘিজ ঘোড় সওয়ার অফিসারটিকে বলল দলখভের খোঁজ করতে এবং সে সন্ধ্যায় আসবে কি না সেটা জানতে। দেনিসভের নিজের ইচ্ছা, সঙ্গী ও পেতয়াকে নিয়ে জঙ্গলের সেই প্রান্তে চলে যাবে যেখানে সেটা শামমেশভো পর্যন্ত বিস্তৃত, ফরাসিদের যে সাময়িক আশ্রয় স্থলটাকে পরদিন আক্রমণ করা হবে সেখান থেকে তার কিছু অংশের উপর নজর রাখা যাবে।
চাষী পথ-প্রদর্শককে বলল, আচ্ছা বুড়ো, আমাদের শাম শেভোতে নিয়ে চল।
দেনিসভ, পেতয়া, ও সঙ্গীটি কসাক ও হুজারদের সঙ্গে নিয়ে একটা খাড়ি পেরিয়ে বাঁ দিক থেকে জঙ্গলের শেষ প্রান্তের দিকে ঘোড়া চালিয়ে দিল।
.
অধ্যায়-৫
বৃষ্টি থেমে গেছে। শুধু কুয়াশা নামছে, আর গাছ থেকে জলের ফোঁটা পড়ছে। দেনিসভ, তার সঙ্গী ও পেতয়া নীরবে চলেছে। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বোনা টুপি মাথায় চাষীটি। বাকলের জুতো পায়ে গাছের শিকড় ও ভেজা পাতার উপর দিয়েসে নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে জঙ্গলের শেষ প্রান্তের দিকে।
একটা উঁচু জায়গায় উঠে সে থামল, চারদিকে তাকাল, তারপর যেখানে গাছগুলো ফাঁকাফকা সেই দিকে এগিয়ে চলল। একটা বড় ওক গাছের পাতাগুলি এখনো ঝরে পড়েনি। সেখানে পৌঁছে হাত বাড়িয়ে সে রহস্যজনক ভাবে ইঙ্গিতে কি যেন দেখাল।
দেনিসভ ও পেতয়া ঘোড়া ছুটিয়ে তার কাছে এগিয়ে গেল। চাষীটি যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে তারা ফরাসিদের দেখতে পেল। বনের ঠিক ওপারে একটা উৎরাইয়ের বুকে বসন্তকালীন গমের একটা ক্ষেত দেখা গেল। ডান দিকে একটা গভীর খাড়ির ওপারে একটা ছোট গ্রাম ও ভাঙা ছাদওয়ালা একটা বাড়িও আছে। গ্রামের মধ্যে, বাড়িটাতে, বাগানে, কুয়োর পাশে, পুকুরের ধারে,সবটা উঁচু জায়গায়, সেতুটা থেকে রাস্তা বরাবর পাঁচশো গজ দূর পর্যন্ত আগাগোড়া মানুষের পর মানুষের জমায়েত চোখে পড়ল কাঁপা কাঁপা কুয়াশার ভিতর দিয়ে। অ-রুশ ভাষায় ঘোড়াগুলোকে ডাকাডাকি এবং পরস্পরের কথাবার্তা পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে।
ফরাসিদের উপর থেকে চোখ না সরিয়েই দেনিসভ নিচু গলায় বলল, বন্দিকে এখানে নিয়ে এস।
একটি কসাক ঘোড়া থেকে নেমে ছেলেটিকে তুলে দেনিসভের কাছে নিয়ে গেল। ফরাসি সৈন্যদের দেখিয়ে দেনিসভ তাকে জিজ্ঞাসা করল, এখানে-ওখানে যারা রয়েছে তারা কারা। ঠাণ্ডা হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে ভুরু দুটো তুলে ছেলেটি সভয়ে দেনিসভের দিকে তাকাল, কিন্তু যা কিছু সে জানে সবকথা বলার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সে এলোমেলো জবাব দিতে লাগল, দেনিসভ যা জিজ্ঞাসা করল তাতেই সায় দিয়ে চলল। ভুরু কুঁচকে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে দেনিসভ তার সঙ্গীর অনুমান জানতে চাইল।
পেতয়া দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে একবার ঢাক-বাজিয়ে ছেলেটির দিকে, একবার দেনিসভের দিকে, একবার তার সঙ্গীর দিকে, এবং একবার গ্রাম ও পথ বরাবর অবস্থিত ফরাসিদের দেখতে লাগল। তার একমাত্র চেষ্টা, কোনো কিছুই যেন দৃষ্টি না এড়ায়।
