তাদের পিছনে মিকুলিনো থেকে দুই ভার্স্ট দূরে জঙ্গলটা যেখানে রাস্তা পর্যন্ত প্রসারিত সেখানে ছয় জন কসাককে মোতায়েন করা হয়েছে, কোনো নতুন ফরাসি দলকে দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের খবর দিতে হবে।
শামশেভো ছাড়িয়ে রাস্তার উপর অনুরূপভাবে নজর রাখবে দলখভ, অন্য ফরাসি সৈন্যরা কতদূরে আছে সেদিকে খেয়াল রাখবে সে। তাদের হিসেবমতো এই দলটাতে পনেরোশো লোক আছে। দেনিসভের আছে দুশো, আর দলখভের লোকের সংখ্যাও ঐরকমই। কিন্তু সংখ্যার এই তারতম্য দেনিসভকে দমাতে পারল না। তার এখন একমাত্র জানা দরকার এরা সব কোন সৈন্য এবং শত্রুপক্ষের ভিতর থেকে একটা জিভ–অর্থাৎ একটা লোককে গ্রেপ্তার করা যায় কি না। সকালবেলাকার মালগাড়ির উপর আক্রমণটা এত দ্রুত সারা হয়েছিল যে মালগাড়ির সঙ্গে যে ফরাসি সৈন্য ছিল তাদের সকলকেই মেরে ফেলা হয়েছে, কেবল একটা ঢাক বাজিয়ে ছেলেকে জীবন্ত ধরা হয়েছে, কিন্তু যেহেতু সেও দলছাড়া তাই সেনাদল সম্পর্কে বিশেষ কোনো খবরই সে বলতে পারল না।
গোটা সেনাদল পাছে সতর্ক হয়ে যায় এই ভয়ে দ্বিতীয়বার আক্রমণ করাটা দেনিসভ বিপজ্জনক বলেই মনে করছে। তাই সে তার দলের চাষী তিখন শচেরবাতিকে শামশেভোতে পাঠিয়েছে, যাতে সে অনন্তত এমন একজন ফরাসি ভাণ্ডারিকেও ধরে আনতে পারে যাকে আগে আগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
.
অধ্যায়-৪
হেমন্তের একটি আতপ্ত বর্ষার দিন। আকাশে ও দিগন্তে ঘোলা জলের রং। মাঝে মাঝে একটা কুয়াশা নেমে আসছে, আর তারপরেই হঠাৎ বৃষ্টি তির্যক ফোঁটা পড়তে শুরু করছে।
গায়ে জোব্বা ও মাথায় ভেড়ার চামড়ার টুপি ছড়িয়ে দেনিসভ একটা শুটকো ঘোড়ায় চেপে চলেছে। পোশাক বেয়ে বৃষ্টির ধারা গড়িয়ে পড়ছে। ঘোড়াটা মাথা ঘুরিয়ে কান হেলিয়ে চলেছে। ঘোড়ার মতোই বৃষ্টি ছাঁট এড়াবার জন্য সেও মুখ ঘুরিয়ে সাবধানে সামনের দিকে তাকাচ্ছে। ছোট ঘন কালো দাড়িওয়ালা সরু মুখটাকে রাগী দেখাচ্ছে।
দেনিসভের পাশেই যথারীতি রয়েছে তার এক সহকর্মী, জোব্বা ও ভেড়ার চামড়ার টুপি পরে সেও চলেছে একটা বড় চকচকে ডন ঘোড়ায় চেপে।
তৃতীয় এসাউল লভয়েস্কি লোকটি দীর্ঘকায়, একটা তীরের মতো খাড়া, মুখ বিবর্ণ, চুল ভালো, কুতকুতে হাল্কা চোখ, মুখে ও চালচালনে শান্ত আত্মতুষ্টির প্রকাশ। তাদের আগে আগে হেঁটে চলেছে একটি চাষী পথ প্রদর্শক। পরনে ধূরস চাষী কোট, মাথায় শাদা বোনা টুপি।
কিছুটা পিছনে মস্তলেজ ও লোমশ একটা ছোট, শুটকো কিরঘিজ ঘোড়ায় চেপে চলেছে নীল রঙের ফরাসি ওভারকোট পরা একটি তরুণ অফিসার। ঘোড়াটার মুখ থেকে রক্ত ঝরছে।
তার পিছনে ঘোড়ায় চেপে চলেছে একজন হুজার। তার পিছনে ঘোড়ার পাছার উপর বসে চলেছে ছেঁড়া ফরাসি ইউনিফর্ম ও নীল টুপি পরা একটা ছেলে। ঠাণ্ডা লাল হাত দিয়ে ছেলেটা হুজারকে ধরে আছে, ভুরু তুলে অবাক হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছে। এটিই সেই ফরাসি ঢাক-বাজিয়ে ছেলে যাকে সকালে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তাদের পিছন-পিছন জঙ্গল-কাটা বনপথ ধরে চলেছে তিন-চার সারি হুজার, তারপর কাক, তাদের কারো পরনে পশমি জোব্বা, কারো ফরাসি ওভারকোট, কারো বা মাথায় ঘোড়ার কাপড় ছড়ানো। ঘোড়াগুলো আসলে বাদামি বা ফুটফুট রঙের যাই হোকনা কেন, বৃষ্টিতে ভিজে এখন সবগুলোকেই কালো দেখাচ্ছে। লোমগুলো ভিজে জট পাকিয়ে যাওয়ায় ঘাড়গুলোকে খুব সরু মনে হচ্ছে। গা থেকে ধোয়া উঠছে। জামা, জিন, লাগাম, সবকিছুই রাস্তায় জমে-থাকা পচা পাতার মতো জলে ভিজে পিছল ও স্যাঁতসেঁতে হয়ে উঠেছে। বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত কসাকদের সারির মধ্যে ফরাসি ও কসাকদের ঘোড়ায় টানা দুটো মালগাড়ি গাছের কাটা ডালপালা ও গর্তের জলের ভিতর দিয়ে কোনো রকমে এগিয়ে চলেছে।
রাস্তার মধ্যে একটা জলের গর্তকে এড়িয়ে চলতে গিয়ে দেনিসভের ঘোড়াটা একপাশে কিছুটা সরে যেতেই চালকের হাঁটুটা একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেল।
আঃ, মহাশয়তান! দেনিসভ রেগে চেঁচিয়ে উঠল, দাঁত বের করে তিন চাবুক কসাল ঘোড়াটার পিঠে, নিজের ও সঙ্গীদের গায়ে ছিটকে এসে কাদা লাগল।
একে বৃষ্টি তায় ক্ষুধা (সকাল থেকে কারো কিছু খাওয়া হয়নি), দেনিসভের মন-মেজাজ এমনিতেই ভালো নেই, তার উপর এখনো পর্যন্ত দলখভের কোনো পাত্তা নেই, এবং একটা জিভকে আটক করতে যে লোকটাকে পাঠানো হয়েছে সেও এখনো ফেরেনি।
একটা যানবাহনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আজকের মতো সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। একা একা ওদের আক্রমণ করার অনেক ঝুঁকি, আর আক্রমণটা যদি একদিন পিছিয়ে দেই তাহলে বড় কোনো গেরিলা দল আমাদের নাকের উপর দিয়ে শিকারটা ছিনিয়ে নিয়ে যাবে। ভাবতে ভাবতেই দেনিসভ অনবরত সামনের দিকে তাকাচ্ছে, মনে আশা, যদি দলখভের কোনো লোককে দেখতে পায়।
জঙ্গলের মধ্যে এমন একটা পথে তারা পৌঁছে গেল যেখান থেকে ডানদিকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। দেনিসভ থামল।
বলল, কে যেন আসছে।
এসাউলও সেইদিকে তাকাল। বলল, দুজন আসছে, একজন অফিসার ও একজন কসাক। কিন্তু লেফটেনান্ট-কর্নেল স্বয়ং আসছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।
একটা উৎরাই ধরে নেমে যাওয়ার ফলে আশ্বারোহী দুজনকে আর দেখা গেল না, কিন্তু কয়েক মিনিট পরে আবার তারা দেখা দিল। সামনে একজন অফিসার, চুল ও পোশাক জলে ভিজে গেছে, হাতের চামড়ার চাবুকটা চালাচ্ছে, ট্রাউজার উঠে গেছে হাঁটুর উপরে। পিছনে রেকাবে পা রেখে দাঁড়িয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে একটি কসাক। অফিসারটির বয়স খুবই অল্প, চওড়া গোলাপি মুখ, তীক্ষ্ম ফুর্তিবাজ চোখ, ঘোড়া ছুটিয়ে দেনিসভের কাছে পৌঁছে তার হাতে একটা ভেজা খাম দিল।
