রণকৌশল অনুসারে আত্মরক্ষার জন্য ছোট ছোট দলে বিভক্ত হওয়া উচিত হলেও ফরাসি বাহিনী ১৮১২ তে পশ্চাদপসরণের সময় একটি দলেই সংঘবদ্ধ হয়েছিল, কারণ তখন সেনাদলের মনোবল এতদূর ভেঙে পড়েছিল যে একমাত্র ভড়ই তাদের একত্র রাখতে পেরেছিল। অপরদিকে, নিয়ম অনুসারে রুশদের উচিত ছিল একযোগে সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ করা, কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে তারা ভাগ হয়ে গিয়েছিল ঘোট ঘোট দলে, কারণ তাদের মনোবল তখন এতই উঁচুপর্দায় উঠেছিল যে কোনো একটি সৈনিক বিনা হুকুমে ফরাসিদের উপর আঘাত হানতে লাগল, অথচ বাধ্যতামূলকভাবে নিজেদের কোনো রকম দুঃখ-দুর্দশা ও বিপদের মুখে ঠেলে দিতে হল না।
.
অধ্যায়-৩
ফরাসিদের সম্মালেনঙ্কে প্রবেশের পর থেকেই তথাকথিত দলীয় যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
দলীয় যুদ্ধবিগ্রহ সরকারিভাবে স্বীকৃত হবার আগেই কসাকও চাষীদের হাতে হাজার হাজার দলছাড়া শত্রুসৈন্য, লুটেরা ও ঘোড়ার খাদ্য-চোর নিহত হয়েছে, একটা দলছাড়া পাগলা কুকুরকে অন্য কুকুরেরা যেভাবে মেরে ফেলে, তারাও এইসব ফরাসিদের সেইভাবেই মেরেছে। দেনিসম দাভিদভই প্রথম এধরনের লড়াইয়ের মূল্য বুঝেছিল।
২৪ আগস্ট দাভিদভের প্রথম দলীয় সেনাদল গঠিত হল, তারপর আরো অনেককে স্বীকৃতি দেওয়া হল। অভিযান যত অগ্রসর হয়ে চলল ততই এধরনের অসংখ্য সেনাদল গড়ে উঠতে লাগল।
এই বেসরকারি সেনাদলগুলি বিরাট বাহিনীকে একটু একটু করে ভাগে-ভাগে ধ্বংস করতে লাগল। ফরাসি বাহিনীরূপী শুকনো গাছ থেকে যে-সব পাতা আপনা থেকেই জরে পড়ছিল তারা কেবল সেগুলিকে সংগ্রহ করতে লাগল, কখনো বা গাছটাকে ঝাঁকিও দিল। অক্টোবর নাগাদ ফরাসিরা যখন ঘোলেনস্ক-এর দিকে পালাতে শুরু করেছে ততদিনে ছোট-বড় নানা আকারের ও চরিত্রের শত শত এই ধরনের সেনাদল গড়ে উঠেছে। কতকগুলি গড়ে উঠল পুরোপুরি সামরিক কায়দায়, তাদের মধ্যে পদাতিক, অশ্বারোহী, কর্মচারী এবং জীবনযাত্রার আয়াস-আরাম সবই ছিল। কতকগুলি গড়ে উঠল কেবলমাত্র কসাক অশ্বারোহী নিয়ে। পদাতিক, অশ্বারোহী, চাষী ও জোতদারদের নিয়েও অনেকদল এখানে-ওখানে গড়ে উঠল, তাদের পরিচয় কেউ জানল না। জনৈক গির্জা-কর্মী একটা দল গড়ে এক মাসে কয়েকশো শত্রুকে বন্দি করল, আর জনৈক গ্রাম-প্রধানের স্ত্রী ভাসিলিসা কয়েকশো ফরাসিকে হত্যা করল।
দলীয় যুদ্ধের আগুন তীব্রতর হয়ে জ্বলে উঠল অক্টোবরের শেষের দিকে। প্রথম অধ্যায় সবে শেষ হয়েছে, নিজেদের সাহস দেখে যোদ্ধারা নিজেরাই অবাক, প্রতি মিনিট তাদের শংকা এই বুঝি ফরাসিরা তাদের ঘিরে ফেলে প্রেপ্তার করে, ঘোড়ার পিঠ থেকে না নেমেই তারা জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, নামবার সাহস হয়না, সর্বদাই ভয় ফরাসিরা বুঝি পিছু নিয়েছে। অক্টোবরের শেষ নাগাদ এধরনের যুদ্ধ একটা নির্দিষ্ট আকার লাভ করল, সকলেই পরিষ্কার বুঝতে পারল ফরাসিদের বিরুদ্ধে কতটা এগুনো যেতে পারে এবং কতটা পারে না। যে ছোট দলগুলি অনেক আগে থেকেই কাজ শুরু করে দিয়েছে এবং খুব কাছে থেকে ফরাসিদের দেখেছে, তারা যেসব কাজকে সম্ভব বলে মনে করে বড় দলের অধিনায়করা তা কল্পনাও করতে পারে না। যেসব কসাক ও চাষীরা ফরাসিদের মধ্যে লুকিয়ে ঢুকে পড়েছে তারা সবকিছুই সম্ভব বলে মনে করে।
২২ অক্টোবর বেসরকারি দলের অন্যতম নেতা দেনিসভ তার দলবল নিয়ে গেরিলা উদ্দীপনার একেবারে চরমে উঠল। ভোর থেকে সে সদলবলে এগিয়ে চলেছে। যে জঙ্গলটা বড় রাস্তাটাকে ঘিরে রেখেছে সারাদিন সেই জঙ্গলের ভিতর থেকে সে দেখেছে, অশ্বারোহী বাহিনীর মালপত্র ও রুশ বন্দিদের নিয়ে একটা বড় ফরাসি দল কড়া পাহারায় গেঁলেনঙ্কের দিকে এগিয়ে চলেছে। দেনিসভ এবং দলখভ (সেও একটা ছোট দল নিয়ে দেনিসভের কাছাকাছিই ঘোরাফেরা করছিল) ছাড়া কয়েকটা ডিভিশনের কমান্ডারও এই দলটির কথা জানতে পেরে দাঁতে শান দিতে শুরু করল। এইসব বড় দলের দুজন কমান্ডার-একজন পোল ও অপরজন জার্মান-সঙ্গে সঙ্গে দেনিসভকে আমন্ত্রণ জানাল, এক সঙ্গে দলটিকে আক্রমণ করতে তাদের দলের সঙ্গে যোগ দিতে।
তাদের দলিলপত্র পড়ে দেনিসভ বলল, না ভাই, আমার নিজেরই যথেষ্ট গোঁফ গজিয়েছে, জার্মানটিকে লিখে জানাল, এরকম একজন সাহসী ও বিখ্যাত জেনারেলের অধীনে কাজ করবার আন্তরিক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাকে সে সুখ থেকে বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে, কারণ সে ইতিমধ্যেই একজন জেনারেলের অধীনে কাজ করছে। পুলিশ জেনারেলকেও সেই একই মর্মে চিঠি লিখে জানাল, সে ইতিমধ্যেই একজন জার্মান জেনারেলের অধীনে কাজ করছে।
এই ভাবে সব বন্দোবস্ত করে দেনিসভ ও দলখভ স্থির করল, উপরওয়ালাদের কিছু না জানিয়ে নিজেদের ছোট দল নিয়েই তারা ঐ যাত্রীদলটিকে আক্রমণ করে দখল করে নেবে। ২২ অক্টোবর দলটা মিকুলিনো গ্রাম থেকে শামশেভো গ্রামের দিকে যাচ্ছিল। মিকুলিনো ও শামশেভোর মাঝখানে রাস্তার বাঁ দিকে মস্ত বড় সব জঙ্গল কোথাও একেবারে রাস্তা পর্যন্ত প্রসারিত, আবার কোথাও বা রাস্তা থেকে এক ভা বা তার কিছু দূরে অবস্থিত। দেনিসভ ও তার দল সারাদিন সেই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে গেল, কখনো জঙ্গলের বেশ ভিতর দিয়ে, কখনো বা জঙ্গলের একেবারে কিনারা ধরে, কিন্তু কোনো সময়ই আগুয়ান ফরাসি দলটিকে দৃষ্টির বাইরে যেতে দিল না। সকালেই দেনিসভের দলের কসাকরা ঘোড়ার জিনভর্তি দুটো মালগাড়িকে আক্রমণ করে নিয়ে এল, জঙ্গল যেখানে রাস্তার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে সেখানে গাড়ি দুটো কাদায় আটকে গিয়েছিল। তারপর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দলটা ফরাসিদের উপর সারাক্ষণ নজর রেখেছে, কিন্তু আক্রমণ করেনি। ফরাসি দলটাকে নির্ভয়ে চুপচাপ শামশেভোতে পৌঁছতে দেওয়া দরকার, কারণ পূর্ব ব্যবস্থা মতো সেখানে একটি পাহারাওয়ালার কুটিরে দলখভের আসার কথা আছে, তারপরেই ভোরবেলা তারা অতর্কিতে দুদিক থেকে দলটার মাথার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে তুষারপিণ্ডের মতো, এক আঘাতেই তাদের ছত্র ভঙ্গ করে দিয়ে দখল করে নেবে।
