এক্ষেত্রে দ্ধৈতযুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে ফরাসি বাহিনী, তার যে প্রতিপক্ষ তরবারি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মুগুর তুলে নিয়েছে সে হল রুশ জনগণ, যারা দ্বৈতযুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেছে তারা হল এই ঘটনার বর্ণনাকারী ইতিহাসকাররা।
সমালেনস্কের অগ্নিকাণ্ডের পরে যে যুদ্ধ শুরু হল তাতে যুদ্ধের সাবেকি ঐতিহ্যের কিছুই পালন করা হল না। শহর ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, যুদ্ধের পরে পশ্চাদপসরণ করা, বরদিনোতে প্রচণ্ড আঘাত হানার পরে নতুন করে পশ্চাদপসরণ করা, মস্কোকে জ্বালিয়ে দেওয়া, লুটেরাদের গ্রেপ্তার করা, যানবাহন বাজেয়াপ্ত করা, আর গেরিলা যুদ্ধ-এ সবেতেই তো নিয়মকে লংঘন করা হয়েছে।
নেপালিয়ন এটা বুঝতে পেরেছিল, সময় সময় সে মস্কোতে দ্বৈতযুদ্ধের সঠিক মনোভাবও গ্রহণ করেছে এবং প্রতিপক্ষের তরবারির বদলে মাথার উপরে একটা মুগুরকে উদ্যত হতে দেখে সে কুতুজভ ও সম্রাট আলেক্সান্দারের কাছে এই মর্মে অভিযোগ করতেও ছাড়ে নি যে সব রকম নিয়ম-কানুন লংঘন করে যুদ্ধটা চালানো হচ্ছে যেন মানুষ মারার ব্যাপারেও কোনো নিয়ম-কানুন থাকে পারে। এ প্রসঙ্গে ফরাসিদের প্রতিবাদ জ্ঞাপন এবং কিছু উচ্চপদস্থ রুশ কর্মচারী কর্তৃক মুগুর-যুদ্ধটা লজ্জাজনক বিবেচিত হওয়া সত্ত্বেও জনযুদ্ধের মুগুরটাকে যথা সম্ভব ক্ষতিকর ভাবেও প্রচণ্ড শক্তিতে উদ্যত করা হল, এবং কারো পরামর্শ, রুচি বা অন্য কিছুর পরোয়ানা করে অর্থহীন সরলতার সঙ্গে সেটাকে বার বার তুলতে ও নামাতে লাগল, এবং ফরাসিদের মারতে মারতে একসময় গোটা অভিযানকেই বিধ্বস্ত করে দিল।
১৮১৩ সালে ফরাসিরা যা করেছিল তরবারির হাতলটা উদার বিজয়ীর দিকে এগিয়ে না ধরে সংকট-মুহূর্তে কোনো রকম নিয়মের তোয়াক্কা না করে হাতের কাছে যে মুগুরটা পেয়েছে সেটাকেই তুলে নিয়ে অনবরত আঘাত করেছে যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের অন্তরের বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার বদলে জেগে উঠেছে অবহেলা ও সহানুভূতি–একটা জাতির পক্ষে সেটা ভালোই হয়েছে।
.
অধ্যায়-২
যুদ্ধের তথাকথিত নিয়মের অন্যতম স্পষ্ট ও সুবিধাজনক ব্যতিক্রম হচ্ছে একত্র সম্মিলিত বহুজনের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট দলে আক্রমণ চালানো। জাতীয় স্তরের যুদ্ধেই এ ধরনের আক্রমণ চালানো হয়ে থাকে। এধরনের আক্রমণের ক্ষেত্রে দুটো জনতা পরস্পরের মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে দুদলেই সরে যায়, একক ভাবে আক্রমণ করে, অধিকতর শক্তিশালী প্রতিপক্ষের আক্রমণের মুখে পালিয়ে যায়, কিন্তু সুযোগ পেলেই আবার আক্রমণ করে। এই যুদ্ধই করেছিল স্পেনের গেরিলারা, ককেসাসের পার্বত্য জাতিরা এবং ১৮২২-তে রুশরা।
এধরনের যুদ্ধকে লোকে গেরিলা যুদ্ধ বলে, তারা ধরে নেয় যে নামেই এর তাৎপর্য পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কিন্তু এধরনের যুদ্ধ কোনো নিয়মের আওতায় আসে না এবং অব্যর্থ বলে স্বীকৃত একটি সুপরিচিত রণ-নীতির এটা সম্পূর্ণ বিরোধী। সে নীতিটা হল–সংঘর্ষের সময় প্রতিপক্ষের চাইতে অধিকতর শক্তিশালী হতে হলে আক্রমণকারীকে সর্বশক্তি একত্রীভূত করতে হবে।
গেরিলা যুদ্ধ (ইতিহাসই সাক্ষী যে সেটা সর্বদাই সফল) এই নীতিকে সরাসরি লংঘন করে চলে।
এই স্ববিরোধিতার কারণ হল-সমর-বিজ্ঞানে ধরেই নেওয়া হয় যে একটি বাহিনীর শক্তিও তার সৈন্যসংখ্যা সমার্থবাচক। সমর-বিজ্ঞান বলে, সৈন্য যত বেশি শক্তিও তত বেশি।
সমর-বিজ্ঞানের পক্ষে এ-কথা বলা আর বলবিদ্যার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র ভড়ের উল্লেখ করে বলবেগের সংজ্ঞা নিরুপণ করা একই কথা।
বলবেগ ভড় ও গতির ফলস্বরূপ।
সামরিক ব্যাপারে একটি বাহিনীর শক্তি ভড় এবং একটি অজ্ঞাত কিছুর ফলস্বরূপ।
একটি বাহিনীর শক্তিযে তার আকারের অনুরূ প হয় না, ছোট ছোট দল যে বড় দলকেপ্রান্ত করে, তার অসংখ্য দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় দেখতে পেয়ে সমর-বিজ্ঞান অস্পষ্টভাবে একটি অজ্ঞাত শক্তির অস্তিত্বকে স্বীকার করে এবং সেটাকে খুঁজে বের করতে চেষ্টা করে।
একটি বাহিনীর মনোবল হচ্ছে সেই অজ্ঞাত শক্তি, তাকে জড় দিয়ে গুণ করলেই আসল শক্তিটাকে পাওয়া যায়। এই অজ্ঞাত কিছুর-একটা বাহিনীর মনোবলের-সংজ্ঞা নিরুপণ করা এবং তার তাৎপর্যকে প্রকাশ করা বিজ্ঞানের একটা সমস্যা।
দশটি সৈনিক, দশটি ব্যাটেলিয়ন, বা দশটি ডিভিশন পনেরোটি সৈনিক, ব্যাটেলিয়ন, বাডিভিশনের সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়লাভ করে–অর্থাৎ অপর পক্ষকে মেরে ফেলে বা বন্দি করে, অথচ নিজপক্ষের মারা যায় চারজন, তার অর্থ, একপক্ষে যায় চারজন, আর অপরপক্ষে যায় পনেরো জন। ফলে চার হয়ে যায় পনেরোর সমান, আর তাই ৪-ক=১৫-খ। ফলে ক/খ=১৫/৪। এই সমীকরণ থেকে আমরা সেই অজ্ঞাত বস্তুরমূল্যমানটা পাই না, পাই দুটো অজ্ঞাত বস্তুর আনুপাতিক হার। বিভিন্ন নির্বাচিত ঐতিহাসিক ঘটনাকে (যুদ্ধ, অভিযান, যুদ্ধের সময়কাল) এই সমীকরণের অন্তর্ভুক্ত করলে এমন একটা সংখ্যা-শ্রেণী পাওয়া যেতে পারে যার মধ্যে নিহিত আছে কতকগুলি বিধি আর সেগুলিই অবশ্যই আবিষ্কারযোগ্য।
একটি বাহিনী আক্রমণ চালাবে একযোগে আর পশ্চাদপসরণ করবে ছোট ছোট দলে-রণ-কৌশলের এই নিয়মই অজান্তে স্বীকার করে যে একটি বাহিনীর শক্তি নির্ভর করে তার মনোবলের উপর। আক্রমণ প্রতিহত করতে যে শৃঙ্খলার দরকার, একটা সেনাদলকে গোলাগুলির মুখে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে তার চাইতে অনেক বেশি শৃঙ্খলা প্রয়োজন। কিন্তু এই নিয়মের মধ্যে সেনাদলের মনোবলকে ধরা হয়নি, তাই বারবার এটা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে।
