সৈন্যদের বাধা দিতে কুতুজভ সাধ্যমতো চেষ্টা করল, কিন্তু রাস্তা বন্ধ করে দেবার চেষ্টায় সৈন্যরা আক্রমণ করে বসল। শুনেছি, পদাতিক রেজিমেন্টগুলি বাজনা বাজিয়ে ঢাক পিটিয়ে আক্রমণ করতে এগিয়ে গেল এবং হাজার হাজার মানুষ খুন হল।
কিন্তু তারা না পারল পথ আটকাতে, আর না পারল কাউকে পরাজিত করতে, বিপদের মুখেপড়ে ফরাসি বাহিনী আরো সুসংহত হয়ে ধীরে ধীরে সংখ্যায় কমতে কমতেও সমালেনঙ্কের মারাত্মক পথ ধরে এগিয়ে চলল।
১৪. বরদিনোর যুদ্ধ
চতুর্দশ পর্ব – অধ্যায়-১
বরদিনোর যুদ্ধ, তার পরেই মস্কো দখল এবং বিনা যুদ্ধে ফরাসিদের পলায়ন–এটা ইতিহাসের একটি পরম শিক্ষণীয় ঘটনা।
সব ইতিহাসকারই একমত যে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও জাতির পারস্পরিক সংর্ঘষের বহিরঙ্গ কার্যকলাপই যুদ্ধের ভিতর দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে এবং সে যুদ্ধের অল্প-বিস্তর সাফল্যের ফল অনুসারেই রাষ্ট্রের ও জাতির শক্তির হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটে। : কোনও রাজা বা সম্রাট অন্য একরাজা বা ম্রাটের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে একটা সেনাবাহিনী গড়ে তোলে, শত্রুর সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে, তিন, পাঁচ, অথবা দশ হাজার মানুষকে মেরে জয়লাভ করে, এবং একটা রাজ্য ও কয়েক লক্ষ লোকের একটা জাতিকে পদানত করে–এ ধরনের ঐতিহাসিক বিবরণ খুব বিস্ময়কর মনে হলেও ইতিহাসের ঘটনাবলী (আমরা যতদূর জানি) এই বক্তব্যের সত্যতাকেই সমর্থন করে যে এক সেনাদলের বিরুদ্ধে অপর সেনাদলের সাফল্যের তারতম্যই সেই জাতির শক্তির হ্রাস-বৃদ্ধির কারণ, অন্ততপক্ষে একটি মৌলিক নির্দেশক-যদিও এটা খুবই দুর্বোধ্য যে একটা জাতির একশো ভাগের এক ভাগ মাত্র হয়েও একটা সেনাদলের পরাজয় ঘটলে একটা গোটা জাতি কেন আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। যেই একটি সেনাদল জয়লাভ করল অমনি সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ী জাতির অধিকার বিজিতের সর্ব রকম স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে বৃদ্ধিলাভ করে। একটা সেনাদল পরাজিত হল, আর সঙ্গে সঙ্গে একটা জাতি তার সব অধিকার হারিয়ে ফেলল, আর সেই সেনাদল যদি সম্পূর্ণরূপে পর্যদস্ত হল তো গোটা জাতি হল সম্পূর্ণ পদানত।
ইতিহাস অনুসারে প্রাচীকাল থেকেই এই চলে আসছে, এবং আমাদের কালেও তাই চলেছে। নেপোলিয়নের সব যুদ্ধ এই নীতিকেই সমর্থন করে। অস্ট্রিয় বাহিনী যতটা পরাজয় বরণ করেছে সে অনুপাতে অস্ট্রিয়া তার অধিকার হারিয়েছে, আর সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পেয়েছে ফ্রান্সের অধিকার ও শক্তি। জেনা ও অয়েরস্তাদে ফরাসিদের জয়লাভ প্রুশিয়ার স্বাধীন সত্তাকে ধ্বংস করেছে।
কিন্তু তারপরে ১৮১২-তে ফরাসিরা মস্কোর কাছে একটা জয়লাভ করল। মস্কো দখল করা হল, আর তারপরে আর কোনো যুদ্ধ হল না, কিন্তু রাশিয়ার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হল না, বিলুপ্ত হয়ে গেল ছয় লক্ষ সৈন্যসমন্বিত ফরাসি বাহিনী এবং তারপরে নেপোলিয়ন-শাসিত ফ্রান্স দেশটা পর্যন্ত। ইতিহাসের বিধানের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ঘটনাকে বিকৃত করে একথা বলাও অসম্ভব যে বরদিনোর রণক্ষেত্র রুশদের হাতেই থেকে গিয়েছিল, অথবা মস্কোর পরে আর যেসব যুদ্ধ হয়েছিল তাতেই নেপোলিয়নের সেনাদল বিধ্বস্ত হয়েছিল।
বরদিনোতে ফরাসিদের জয়লাভের পরে সাধারণভাবে আর কোনো যুদ্ধ হয়নি, গুরুতর কোনো সংঘর্ষও ঘটেনি, তথাপি ফরাসি বাহিনীর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে গেল। এর অর্থ কি? এটা যদি চীনের ইতিহাস থেকে নেওয়া কোনো দৃষ্টান্ত হত তাহলে আমরা বলতে পারতাম যে এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনাই নয় (কোনো কিছু যখন তাদের হিসেবের সঙ্গে খাপ খায় না, ইতিহাসকাররা তখন সুবিধামতো এই কথাই বলে থাকে), এটা যদি কোনো ছোটখাট সংঘর্ষ হত, তাহলে এটাকে ব্যতিক্রম বলে ধরে নিতে পারতাম, কিন্তু এই ঘটনাটি ঘটেছে আমাদের পিতৃপুরুষের চোখের সামনে, তাদের কাছে এটা ছিল তাদের পিতৃভূমির জীবন-মরণের প্রশ্ন, আর আমাদের জ্ঞানমতে এটা ঘটেছিল বৃহত্তম একটি যুদ্ধে।
১৮১২-র অভিযানে বরদিনোর যুদ্ধ ফরাসি বিতাড়ন পর্যন্ত এই অধ্যায়টিই প্রমাণ করেছে যে একটা যুদ্ধে জয়লাভ করলেই একটা দেশকে জয় করা যায় না, এবং দেশ জয়ের কোনো অনিবার্য সংকেতও সেটা নয়, এতে আরো প্রমাণ হয়েছে, যে-শক্তি একটা জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে সে-শক্তি কোনো বিজয়ীর হাতে থাকেনা, সেনাদল ও যুদ্ধের মধ্যেও থাকে না, থাকে অন্য কোথাও।
মস্কো ছেড়ে আসার আগে ফরাসি বাহিনীর অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে ফরাসি ইতিহাসকাররা বলেছে যে অশ্বারোহী বাহিনী, গোলন্দাজ বাহিনী ও যানবাহন ব্যবস্থা ছাড়া আর সবদিক থেকেই গ্র্যান্ড আর্মির অবস্থা বেশ ভালোই ছিল–আর পশুদের কোনো রকম খাদ্যই ছিল না। সে দুর্ভাগ্যের কোনো প্রতিকার কারো হাতে ছিল না, কারণ সে জেলার চাষীরা সব খড় পুড়িয়ে দিয়েছিল যাতে সেগুলি ফরাসিদের হাতে না পড়ে।
জয়লাভকরেও ঈলিত ফল পাওয়া গেল না, কারণ চাষী কার্প ও ভাস এবং অনুরূপ অসংখ্য চাষী চড়া দাম পেয়েও তাদের খড় নিয়ে মস্কোতে যায়নি, সব পুড়িয়ে দিয়েছে।
এমন দুটি লোককে কল্পনা করা যাক যারা দ্বৈতযুদ্ধের সব রকম নিয়মকানুন মেনে তরবারি নিয়ে যুদ্ধে করতে এসেছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে যুদ্ধ চলল, হঠাৎ একজন যোদ্ধা যখন বুঝতে পারল যে সে আহত হয়েছে। আর ব্যাপারটা ঠাট্টা-ইয়ার্কি নয়, তখন সে তরবারি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাতের কাছে যে মুগুরটা পেল তাই ঘোরাতে শুরু করল। তারপর কল্পনা করা যাক, যে-যোদ্ধাটি কার্যোদ্ধারের শ্রেষ্ঠ এবং সহজতম পথটি বেছে নিল সেই কিন্তু আবার বীরত্বের চিরাচরিত ঐতিহ্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আসল কথা গোপন সাহায্যেই সে জয়লাভ করেছে। সেই দ্বৈতযুদ্ধের এ হেন বিবরণ থেকে কত রকম গোলমাল ও অস্পষ্টতার সৃষ্টি যে হতে পারে তা তত সহজেই কল্পনা করা যায়।
