নেপোলিয়ন যে মুতোর সঙ্গে একমত হল এবং সৈন্যবাহিনী পশ্চাদপসরণ করল, তাতে কিন্তু একথা প্রমাণ হয় না যে নেপোলিয়ানই তার বাহিনীর পশ্চাদপসরণ ঘটিয়েছিল, বরং বলা যায়, যে শক্তিসমূহ গোটা বাহিনীকে প্রভাবিত করে তাকে মোঝায়েস্ক (অর্থাৎ স্মোলেনস্ক) রোড ধরে পরিচালিত করেছিল সেই শক্তিই একই সঙ্গে নেপোলিয়নকেও প্রভাবিত করেছিল।
.
অধ্যায়-১৯
একজন গতিশীল মানুষ সবসময়ই তার চলার স্বপক্ষে একটা লক্ষ্য খুঁজে নেয়। এক হাজার ভার্স্ট পথ অতিক্রম করতে হলে তাকে কল্পনা করে নিতেই হবে যে সেই হাজার ভাস্টের শেষে তার জন্য একটা ভালো কিছু অপেক্ষা করে আছে। চলার শক্তি অর্জন করতে হলে একটা প্রতিশ্রুত দেশের সম্ভাবনা সম্মুখে রাখতেই হবে।
ফরাসিদের অগ্রগতির সম্মুখে সেই প্রতিশ্রুত দেশটি ছিল মস্কো, আর তাদের পশ্চাদপসরণের সময় সেটি হয়েছে তাদের স্বদেশ। কিন্তু সে স্বদেশ তো বহুদূরে, যে মানুষকে এক হাজার ভার্স্ট যেতে হবে তার পক্ষে একান্তভাবে প্রয়োজন শেষ লক্ষ্যকে সরিয়ে রেখে নিজেকে এই কথা বলা : আজ আমি চল্লিশ ভার্স্ট দূরের এমন একটা স্থানে পৌঁছব যেখানে পাব বিশ্রাম, যেখানে রাতটা কাটাতে পারব। প্রথম দিনের যাত্রা পথে সেই বিশ্রামস্থলটিই তার শেষ লক্ষ্যকে ঢেকে দিয়ে তার সব আশা-আকাঙ্ক্ষাকে আকর্ষণ করে। আর ব্যক্তিবিশেষের এই মনোভাব সমষ্টির ক্ষেত্রে আরো বহুগুণ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
পুরনো স্মোলেনস্ক রোড ধরে আগুয়ান ফরাসি বাহিনীর শেষ লক্ষ্য তাদের স্বদেশভূমি তখন অনেক দূরে, তাদের প্রত্যক্ষ লক্ষ্য হচ্ছে স্মোলেনস্ক, তাই সমগ্র সেনাবাহিনীর মনের মধ্যে বহুগুণে বর্ধিত হয়ে তাদের সব আশা ও আকাঙ্ক্ষা সেই পথেই তাদের টেনে নিয়ে চলল। স্মোলেনদ্ধে তাদের জন্য প্রচুর খাদ্য ও নতুন সেনাদল অপেক্ষা করছে এ-কথা যে তারা জানত তা নয়, সেরকম কোনো কথা তাদের বলাও হয়নি (বরং ঊর্ধ্বতন অফিসাররা এবং স্বয়ং নেপোলিয়ানও জানত যে সেখানে রসদের একান্ত অভাব আছে)। কিন্তু একমাত্র এই আশা ও আকাঙ্ক্ষাই তাদের দিয়েছে এগিয়ে চলার এবং বর্তমান দুঃখ-দুর্দশা সহ্য করবার শক্তি। কাজেই একথা যারা জানত এবং যারা জানত না দুই দলই নিজেদের প্রতারিত করে আশ্বাসের স্থল হিসেবে আলেঙ্কের দিকেই ছুটে চলল।
বড় রাস্তায় পড়ে ফরাসিরা বিস্ময়কর উদ্যম ও অশ্রুতপূর্ব দ্রুতগতিতে পালাতে লাগল নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে! একই প্রেরণা ফরাসি সৈন্যদের একসূত্রে বেঁধে দিল, উৎসাহ যোগাল, তাছাড়া আরো একটি কারণ তাদের এক সঙ্গে বেঁধেছিল-সেটা তাদের প্রবল সংখ্যা। মাধ্যাকর্ষণ নিয়মের মতোই তাদের সমষ্টিগত প্রবলতা প্রতিটি মানব-অণুকে নিজের দিকে টেনে নিল। তারা হাজারে হাজারে এক জাতি, এক প্রাণ হয়ে ছুটতে লাগল।
এই সন্ত্রাস ও দুর্দশার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য প্রত্যেকেই তখন চাইছে নিজেকে বন্দি হিসেবে শক্রর হাতে সঁপে দিতে, কিন্তু একদিকে যাত্রার লক্ষ্যস্থল সমালেনস্ক-এর প্রতি সম-আকর্ষণের শক্তি সকলকে একই পথে টেনে নিয়ে চলল, আবার অন্যদিকে একটা আর্মি কার তো কোনো কোম্পানির কাছে আত্মসমর্পণ করতে, পারে না, যদিও ফরাসিরা নিজেদের আলাদা করে নিয়ে যে কোনো উপযুক্ত অজুহাতে আত্মসমর্পণের সুযোগ খুঁজতে লাগল, সে সুযোগ কিন্তু তাদের সামনে এল না। তাদের সংখ্যাধিক্য এবং সমবেত দ্রুতগতির জন্যই তারা সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হল, সর্বশক্তিনিয়োগ করে ফরাসিরা যেভাবে ছুটতে লাগল তাতে রুশদের পক্ষে তাদের গতিরোধ করা শুধু কষ্টকর নয়, অসম্ভব হয়ে পড়ল। একটা বিশেষ সময়সীমার পরে কোনো যান্ত্রিক বিচ্ছেদই জীবদেহের পচনকে ত্বরান্বিত করতে পারে না।
একতাল বরফ একমুহূর্তেই গলে যেতে পারে না। এমন একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে যার কমে তাপের কোনো মাত্রা প্রয়োগ করেই বরফকে গলানো যায় না। পরন্তু, তাপ যত বেশি হয়, অবশিষ্ট বরফটা ততবেশি জমাট বেঁধে যায়।
রুশ কমান্ডারদের মধ্যে একমাত্র কুতুজভই এটা বুঝত। মোলেনস্ক রোড ধরে ফরাসিদের পলায়ন যখনস্পষ্ট হয়ে উঠল, তখন ১১ অক্টোবর রাতে কনভনিৎসিন যেটা আগে থেকেই দেখতে পেয়েছিল তাই ঘটতে লাগল। ঊর্ধ্বতন অফিসাররা সকলেই চাইল নাম করতে, শত্রুকে মারতে, অবরোধ করতে, বন্দি করতে, ফরাসিদের পরাভূত করতে। সকলেই যুদ্ধের জন্য হৈ-হৈ করে উঠল।
একমাত্র কুতুজভই আক্রমণ প্রতিহত করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করল (যে কোনো প্রধান সেনাপতির পক্ষেই সে সাধ্য খুবই সীমিত)।
আজ আমরা যা বলছি সেদিন কুতুজভ তা বলতে পারেনিঃ আমাদের সৈন্যদের মৃত্যু ডেকে এনে আর ভাগ্যহীন লোকগুলোকে অমানুষিক ভাবে হত্যা করে কেন এই যুদ্ধ, কেন এই পথ-অবরোধ? যখন বিনা যুদ্ধেই তাদের সেনাদলের এক-তৃতীয়াংশ মস্কো থেকে ভিয়াজমা রোডের উপর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তখন এ যুদ্ধের কী দরকার? কিন্তু পরিণত বুদ্ধির উপর নির্ভর করে সে তাদের বলল স্বর্ণ-সেতুর কথা, সঙ্গে সঙ্গে তারা হেসে উঠল, কটুক্তি করল, মরণোম্মুখ জন্তুটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে, উল্লাসে ফেটে পড়ল।
এর্মলভ, মিলরাদভিচ, প্লাভ এবং অন্যরা ভিয়াজমার কাছে ফরাসিদের মুঠোর মধ্যে পেয়ে দুটো ফরাসি কোরকে বিচ্ছিন্ন করে ভেঙে চুরমার করে দেবার ইচ্ছাকে সংযত করতে পারল না, তাদের এই অভিপ্রায় কুতুজভকে জানাবার উদ্দেশ্যে খামে ভরে তাকে পাঠিয়ে দিল এক তাড়া শাদা কাগজ।
