বুকের উপর খোলা শার্টটা টেনে মিলিয়ে দিয়ে বার্ধক্য জনিত নিচু গলায় বলখভিতিনভকে বলল, আমাকে বল, আমাকে বল বন্ধু। কাছে এস-আরো কাছে। আমার জন্য কি খবর তুমি এনেছ? অ্যাঁ? নেপোলিয়ন মস্কো পরিত্যাগ করেছে এই তো? তুমি ঠিক জান? অ্যাঁ?
তাকে যা কিছু বলে দেওয়া হয়েছিল বলখভিতিনভ গোড়া থেকে সব কথা সবিস্তারে বলল।
আরো তাড়াতাড়ি বল, আরো তাড়াতাড়ি! আমাকে কষ্ট দিও না! কুতুজভ তাকে বাধা দিয়ে বলে উঠল।
বলখভিতিনভ সব কথা বলে নির্দেশের অপেক্ষায় চুপ করে রইল। তোল কি যেন বলতে যাচ্ছিল, কুতুজভ তাকে থামিয়ে দিল। নিজে কিছু বলতে চেষ্টা করল, কিন্তু হটাৎ তার মুখটা কুঁচকে ভাঁজ হয়ে গেল। তোলের দিকে হাতটা নেড়ে ঘরের বিপরীত দিকে ঝোলানো দেবমূর্তিগুলির ছায়ায় যে কোণটা অন্ধাকার হয়ে আছে সেই দিকে চলে গেল।
দুই হাত জোড় করে কাঁপা-গলায় বলতে লাগল, হে প্রভু, হে আমার সৃষ্টিকর্তা, আমাদের প্রার্থনা তুমি শুনেছ…রাশিয়া বাঁচল। হে প্রভু, তোমাকে ধন্যবাদ।
কুতুজভ কাঁদতে লাগল।
.
অধ্যায়-১৮
এই সংবাদ পাবার পর থেকে অভিযানের শেষ দিন পর্যন্ত কুতুজভের সমস্ত কাজকর্মের একমাত্র লক্ষ্য হল ছলে, বলে কৌশলে ও অনুরোধে তার সৈন্যদের ধ্বংসের মুখ শত্রুর বিরুদ্ধে অনর্থক আক্রমণ, রণ-কৌশল ও সংঘর্ষ থেকে বিরত রাখা। দখতুরভ মালো-ইয়ারোস্লাভেসে চলে গেল, কিন্তু কুতুজভ মূল বাহিনীর সঙ্গেই রয়ে গেল,আর কালুগা থেকে সকলকে চলে যেতে হুকুম দিল, সে শহর থেকে আরো পিছনে সরে যাওয়া তার কাছে খুবই সহজ বলে মনে হল।
কুতুজভ সর্বত্রই পশ্চাদপসরণ করে চলল, কিন্তু শত্রুপক্ষ তার পশ্চাদপসরণের জন্য অপেক্ষা না করেই বিপরীত মুখে পালাতে লাগল।
নেপোলিয়নের ইতিহাসকাররা তারুতিনো এবং মালো-ইয়াররা স্লাভেস-এ তার সুকৌশল সৈন্য পরিচালনার কথা আমাদের শুনিয়েছে, আর নেপোলিয়ন যদি সময়মতো দক্ষিণের সমৃদ্ধ অঞ্চল গুলিতে প্রবেশ করতে পারত তাহলে কি ঘটতে পারত তা নিয়েও অনেক জল্পনা-কল্পনাও করেছে।
কিন্তু নেপোলিয়নের দক্ষিণ অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাবার পথেযে কোনো বাধাই ছিল না (কারণ রুশ বাহিনী কোথাও তাকে বাধা দেয়নি) সেকথা না হয় নাই বলা হল, তবু ইতিহাসকাররা ভুলে গেছে যে কোনো কিছুই তখন আর নেপোলিয়নের বাহিনীকে রক্ষা করতে পারত না, কারণ ততক্ষণে তার মধ্যে অনিবার্য ধ্বংসের বীজটি বপন করা হয়ে গেছে। যে বাহিনী মস্কোতে প্রচুর রসদের সরবরাহ পেয়েও তাকে মজুত না করে পায়ের নিচে পিবে নষ্ট করেছে এবং যোলেনস্কে পৌঁছে খাদ্যসম্ভার গুদামজাত না করে কেবল লুটই করেছে, সেই বাহিনী কালুগা প্রদেশে গিয়ে কেমন করে সুবুদ্ধি ফিরে পাবে যখন সেখানেও বাস করত মস্কোর মতোই সব রুশ অধিবাসীরা এবং সেখানেও জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করে দেবার মতো সবকিছুই ছিল?
সে বাহিনী কোথাও গিয়ে বাঁচতে পারত না। বরদিনোর যুদ্ধ এবং মস্কো ধ্বংসের পরে তার ভিতরে ভিতরে যেন ধ্বংসের বীজ আপনা থেকেই রোপিত হয়ে গিয়েছিল।
স্বয়ং নেপোলিয়ন ও তার সৈন্যসহ যারা একদিন ছিল একটা বাহিনীর সদস্য তারাই পালাতে লাগল কোথায় পালাচ্ছে তা না জেনে, যে অসহায় অবস্থার সম্পর্কে তখন তারা সকলেই অল্প-বিস্তর সচেতন তার হাত থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালিয়ে বাঁচাটাই তখন প্রত্যেকেরই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
তাই তো দেখতে পাই, জেনারেলরা সকলে একত্রে আলোচনার ভান করে মালো-ইয়ারোস্লাভেৎসের বৈঠকে সমবেত হয়ে নানা রকম অভিমত প্রকাশ করলেও একেবারে সকলের শেষে কথা বলতে উঠে সরল হৃদয় সৈনিক মুতো যখন বলল যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালিয়ে যাওয়াই এখন একমাত্র দরকারি কাজ, তখন সকলের মুখই বন্ধ হয়ে গেল, এমনকি এই সর্বজনস্বীকৃত সত্যের বিরুদ্ধে নেপোলিয়নও কিছুই বলতে পারত না।
পালিয়ে যাওয়াই যে দরকার সেকথাটা সকলে বুঝলেও তাকে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যে একটা লজ্জাবোধ তবু থেকেই গেল। সেই লজ্জাকে জয় করার জন্য একটা বাইরের আঘাতের খুবই দরকার ছিল, আর যথা সময়েই সে আঘাতটাও এল। তাকেই ফরাসিরা বলত le hourra de IEmpereur।
মালো-ইয়ারোস্লাভেৎস-এর বৈঠকের পরদিন খুব সকালে একদল মার্শাল ও একজন পরিদর্শককে সঙ্গে নিয়ে নেপোলিয়ন নিজের এলাকার মধ্যেই অশ্বারোহণে বেরিয়েছিল, পূর্বেকার ও আসন্ন যুদ্ধের ঘটনাস্থল এবং সেনা বাহিনী পরিদর্শনের জন্যই নাকি তার এই পরিক্রমণ। যাই হোক, কয়েকজন কসাক লুটের মালের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে নেপোলিয়নের দেখা পেয়ে যায় এবং তাকে প্রায় গ্রেপ্তার করবার উপক্রম করে। কসাকরা যে তখন নেপোলিয়নকে গ্রেপ্তার করেনি, নেপোলিয়ন যে তখনকার মতো বেঁচে গিয়েছিল, তার কারণ কসাকদের মন ছিল তখন লুটের মালের দিকে। সৈন্যদের ছেড়ে তারা লুটতরাজের দিকেই মন দিল। নেপোলিয়নকে ফেলে তারা ছুটল লুটের সন্ধানে, নেপোলিয়ন কোনো ক্রমে পালিয়ে বাঁচল।
সৈন্য পরিবেষ্টিত অবস্থায় স্বয়ং সম্রাটই যখন এত সহজে শত্রুপক্ষের হাতে পড়তে পারত সে অবস্থায় নিকটবর্তী পরিচিত পথ ধরে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া ও কোনো গত্যন্তর ছিল না। চল্লিশ বছরের পুরোনো পাকস্থলী নিয়ে নেপোলিয়ন সৈনিকটির কথার ইঙ্গিতটা বুঝতে পারল, তার পূর্বেকার গতিশীলতা ও সাহস এখন আর নেই, তাছাড়া কসাকরাও তাকে বেশ ভয় পাইয়ে দিয়েছে, তাই মুতোর সঙ্গে একমত হয়েছে সঙ্গে সঙ্গে হুকুম দিল,-ইতিহাসকাররা তাই বলেস্মোলেনস্ক রোড ধরে পশ্চাদপসরণ করা হোক।
