হেলোসের চিঠি? প্রিন্স হেসে জিজ্ঞাসা করল; তার শক্ত, হলদে দাঁতগুলো দেখা গেল।
ভীরু চোখে তাকিয়ে ভীরু হাসি হেসে প্রিন্সেস বলল, হ্যাঁ, জুলির চিঠি।
প্রিন্স কড়া গলায় বলল, আরো দুটো চিঠি আমি ছেড়ে দেব, কিন্তু তৃতীয়টা আমি পড়ব। আমার ভয় হচ্ছে যে তোমরা অনেক বাজে কথা লেখ। তৃতীয় চিঠিটা আমি পড়বই।
ইচ্ছা করলে এটাও পড়তে পার বাবা, আরো লাল হয়ে প্রিন্সেস চিঠিটা বাড়িয়ে ধরল।
চিঠিটাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে প্রিন্স হঠাৎ চেঁচিয়ে বলে উঠল, তৃতীয়টা, বললাম না যে তৃতীয়টা পড়ব! তারপর টেবিলের উপর কনুই রেখে জ্যামিতির নক্সা-আঁকা অনুশীলন-খাতাটা সামনে টেনে নিল।
মেয়ের খুব কাছাকাছি খাতার উপর ঝুঁকে পড়ে তার চেয়ারের পিছনে হাত রেখে প্রিন্স বলল, তাহলে মাদাম; অনেক দিনের পরিচিত বার্ধক্যের ও তামাকের কটুগন্ধ যেন মেয়েকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরল। দেখ মাদাম, এই ত্রিভুজগুলো সমান; খেয়াল রাখ যে ত্রিভুজ ক খ গ…
প্রিন্সেস ভয়ে ভয়ে বাবার চকচকে চোখের দিকে তাকাল; তার মুখের লাল আভা একবার ফুটে ওঠে, আবার মিলিয়ে যায়; স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে সে কিছুই বুঝতে পারছে না; সে এতই ভয় পেয়েছে যে তার বাবা যত ভালো করেই বোঝাক না কেন এই ভয়ের জন্যই সে কিছুই বুঝতে পারবে না। দোষটা শিক্ষকের কি ছাত্রীর কে জানে, আসলে প্রতিদিন এই একই ব্যাপার চলে; প্রিন্সেসের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, সে কিছুই দেখতে পায় না, শুনতে পায় না; শুধু বোঝে যে বাবার কঠিন শুকনো মুখটা তার পাশেই আছে, তার নিঃশ্বাস ও গন্ধ সে পাচ্ছে; আর শুধু ভাবে কতক্ষণে নিজের ঘরে গিয়ে শান্তিতে পড়াটা করতে পারবে। বুড়ো মানুষটি চটে যায়, চেয়ারটাকে একবার সামনে, একবার পিছনে ঠেলে, যাতে চটে না যায় সে জন্য নিজেকে সংযত রাখতে চেষ্টা করে, কিন্তু সব সময়ই চটে যায়, বকাঝকা করে, কখনো কখনো খাতাপত্রও ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
প্রিন্সেস একটা ভুল জবাব দিল।
এই দেখ, কী বোকা মেয়ে রে! প্রিন্সে চেঁচিয়ে উঠল; খাতাটাকে ঠেলে দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল, চেয়ার ছেড়ে উঠে একটু পায়চারি করল; তার পরেই আলতো করে মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে আবার বসে পড়ল।
চেয়ারটা টেনে নিয়ে আবার বোঝাতে বসল।
প্রিন্সেস মারি যখন খাতাটা নিয়ে সেটাকে বন্ধ করে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল তখন প্রিন্স বলে উঠল, তা চলবে না প্রিন্সেস, তা চলবে না। গণিতটাই হচ্ছে আসল মাদাম! আমি চাই না যে তুমিও ঐ সব বোকা মহিলাদের মতো হয়ে থাক। অভ্যাস কর, দেখবে তাহলেই সব বুঝতে পারবে। মেয়ের গালে হাত বুলিয়ে আদর করে বলল, গণিত তোমার মাথার ভিতর থেকে সব জঞ্জাল ঝেটিয়ে বার করে দেবে।– মেয়ে যাবার জন্য পা বাড়াতেই প্রিন্স ইশারায় তাকে থামতে বলে উঁচু ডেস্ক থেকে একটা আনকোরা নতুন বই নামাল।
এই রহস্যের চাবিকাঠি বইখানা তোমার হেলোস তোমার জন্য পাঠিয়েছে। ধর্মপুস্তক! কারো ধর্মবিশ্বাসে আমি হাত দেই না।…বইটা আমি দেখেছি। এটা নাও। আচ্ছা, এবার যাও। যাও।
মেয়ের কাঁধ চাপড়ে দিয়ে প্রিন্স নিজেই দরজাটা বন্ধ করে দিল।
ভীত, বিষণ্ণ মুখে প্রিন্সেস মারি তার ঘরে ফিরে গেল। এ অবস্থা তার প্রায় সব সময়ই হয়। তার সাদা রোগাটে মুখটা আরো সাদা হয়ে গেছে। লেখার টেবিলে বসল। টেবিলে অনেক হোট প্রতিকৃতি। বই ও কাগজপত্র ছড়ানো। বাবা যেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, মেয়ে তেমনি অগোছালো। জ্যামিতির খাতা রেখে সাগ্রহে সে চিঠির সিল ভেঙে ফেলল। তার ছেলেবেলা থেকে সব চাইতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু জুলির চিঠি। রস্তভ-পরিবারের নামকরণ অনুষ্ঠানে যে জুলি কারাগিন উপস্থিত ছিল এ সেই।
জুলি ফরাসিতে লিখেছে :
প্রিয় সোনা বন্ধু, বিরহ কি ভয়ংকর, ভয়াবহ! যদিও, নিজেকে বলি, আমার অর্ধেক জীবন ও অর্ধেক সুখ তোমাকেই জড়িয়ে আছে, আমাদের মাঝখানে যত দূরত্বই থাকুক, আমাদের দুটি হৃদয় অচ্ছেদ্য বন্ধনে এক সাথে বাধা, তবু আমার মন ভাগ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, চারদিকের এত সুখ ও আমাদের মধ্যেও আমাদের ছাড়াছাড়ি হবার পর থেকে যে গোপন দুঃখ আমার মনে বাসা বেঁধেছে তাকে আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। গত গ্রীষ্মকালে তোমার বড় পড়ার ঘরটিতে, নীল সোফার উপরে, সেই গোপন সোফার উপরে, আমরা যে ভাবে মিলিত হয়েছিলাম, সেই ভাবে আবার কেন মিলিত হতে পারছি না? তোমার যে শান্ত, স্নিগ্ধ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে আমি এত ভালোবাসি, লিখতে বসে এখনো সে দৃষ্টি আমি যেন দেখতে পাচ্ছি, তিন মাস আগের মতো এখনো কেন আমি সেই দৃষ্টি থেকে নতুন করে নৈতিক শক্তি সংগ্রহ করতে পারছি না?
এই পর্যন্ত পড়ে প্রিন্সেস মারি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডান দিককার আয়নাটার দিকে তাকাল। একটি দুর্বল, সাধারণ দেহ ও পাতলা মুখের ছায়া পড়েছে সেখানে। তার বিষণ্ণ চোখ দুটি যেন একান্ত হতাশভাবে আয়নার সেই প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। ও আমাকে স্তোকবাক্য শোনাচ্ছে, এই কথা ভেবে মুখ ফিরিয়ে সে আবার পড়তে শুরু করল। জুলি কিন্তু বন্ধুকে স্তোকবাক্য বলে নিঃ প্রিন্সেসের বড় বড়, গভীর, উজ্জ্বল চোখ দুটি এতই সুন্দর যে তার ফলে তার সাদামাঠা মুখখানিও অন্য যে কোনো সুন্দরীর মুখের চাইতে অধিক আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু নিজের অজ্ঞাতে তার চোখে যে সুন্দর ভাবটি ফুটে ওঠে প্রিন্সেস নিজে তো কখনো তা দেখতে পায় না। অন্য সকলের মতোই আয়নার দিকে তাকাতে গেলেই তার মুখে জোর করে টেনে আনা একটা অস্বাভাবিক ভঙ্গি ফুটে ওঠে। সে পড়তে লাগল :
