কুটির থেকে বেরিয়ে স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার রাতের মধ্যে এসে কনভনিৎসিন ভুরুটা কুঁচকাল-তার একটা কারণ মাথার যন্ত্রণাটা বেড়ে গেছে, আর অপর কারণ একটা অপ্রীতিকর চিন্তা ঢুকেছে তার মাথায় : এই সংবাদটা পাবার পরে এখানকার সব প্রভাবশালী লোকদের, এবং বিশেষ করে বেনিংসেনের বাসাটা কীভাবে নড়ে উঠবে, তারুতিনোর পর থেকে কুতুজভের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা তো একেবারে আদায়-কাঁচকলায়। এই চিন্তাটাই তার কাছে অপ্রীতিকর, যদিও সে জানে যে এ ব্যাপারে কিছুই করার নেই।
বাস্তবক্ষেত্রেও সে গিয়ে তোলকে সংবাদটা জানাতেই সে তার সঙ্গে একই ঘরে বসবাসকারী জেনারেলটি যুদ্ধ সম্পর্কে তার পরিকল্পনার কথা বোঝাতে লাগল। ক্লান্ত নীরবতার সঙ্গে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তার কথাবর্তা শুনবার পরে কনভনিৎসিন তাকে স্মরণ করিয়ে দিল যে অবিলম্বে তাদের হিজ হাইনেসের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
.
অধ্যায়-১৭
সব বুড়ো মানুষের মতোই কুতুজভও রাতে বেশিক্ষণ ঘুমতে পারে না। দিনের বেলায় প্রায়ই অপ্রত্যাশিত ভাবে ঘুমিয়ে পড়ে, কিন্তু রাতে পোশাক না ছেড়ে বিছানায় শুয়ে সাধারণত জেগে থেকে নানা কথা ভাবে।
এখনো ফোলা-ফোলা হাতের উপর ক্ষতচিহ্নিত ভারি মাথাটা রেখে সে বিছানায় শুয়ে আছে, গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে এক চোখে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে।
সম্রাটের সঙ্গে অধিক যোগাযোগের ফলে তার উপর বেনিংসেনের প্রভাবটাই অন্য সকলের চাইতে বেশি হওয়ায় বেনিংসেন ইদানীং কুতুজভকে এড়িয়েই চলে, ফলে তার এবং তার সেনাদলের পক্ষে অকারণ আক্রমণাত্মক কাজ কর্মে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাটা কম হওয়ায় কুতুজভ বেশ স্বস্তি অনুভব করছে। তারুতিনোর যুদ্ধ ও তার আগের দিনের শিক্ষার কথা কুতুজভ বেশ বেদনার সঙ্গেই স্মরণ করে থাকে, তার ধারণা সে শিক্ষার প্রভাব অন্যদের উপরেও পড়েছে।
কুতুজভ ভাবেঃ তাদের বোঝা দরকার যে আক্রমণ করলে আমাদের শুধু ক্ষতিই হবে। দৈর্য আর সময়ই হচ্ছে আমার যোদ্ধা, আমার বিজয়ী বীর। সে জানে, কাঁচা থাকতে আপেল তোলা উচিত নয়। যখন পাকবে তখন ওটা আপনি পড়বে, কাঁচা অবস্থায় পাড়লে আপেলটা নষ্ট হবে, গাছের ক্ষতি হবে, আর তোমার দাঁত টকে যাবে। অভিজ্ঞ শিকারীর মতো সে জানে যে জন্তুটা আহত হয়েছে, পুরো শক্তি নিয়ে রাশিয়ার পক্ষে যতখানি আঘাত করা সম্ভব ততখানি আহত হয়েছে। কিন্তু সে আঘাত মারাত্মক কিনা সেটা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু এখন লরিস্তন ও বার্থিলেমিকে পাঠানোর ফলে এবং গেরিলাদের বিবরণ অনুসারে কুতুজভ প্রায় নিশ্চিত যে আঘাতটা মারাত্মকই হয়েছে। কিন্তু আরো প্রমাণ তার চাই, আর সেজন্য অপেক্ষা করা দরকার।
ওকে কতখানি আহত করা গেছে সেটা দেখতেওরা চাইছে দৌড়ে যেতে। অপেক্ষা কর, তাহলেই দেখতে পাবে। অবিরাম চলা মানেই অবিরাম অগ্রগতি! কিসের জন্য নিজেদের বিশিষ্ট করে তুলতে! যুদ্ধ যেন একটা মজার ব্যাপার। তারা সব ছেলে মানুষের মতো–সকলেই দেখাতে চায় তারা কত ভালো যুদ্ধ করতে পারে, ফলে তাদের কাছ থেকে ঘটনার কোনো অর্থপূর্ণ বিবরণই পাওয়া যায় না। কিন্তু এখন তো তার কোনো প্রয়োজন নেই।
বরদিনোর আঘাতটা মারাত্মক হয়েছে কি না এই অনিশ্চিত প্রশ্নটা একটা পুরো মাস ধরে কুতুজভের মাথার মধ্যে ঘুরছে। একদিকে ফরাসিরা মস্কো দখল করেছে। অন্যদিকে কুতুজভ সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করে যে সে নিজে এবং সব রুশরা মিলে সর্বশক্তি দিয়ে যে ভয়ংকর আঘাত হেনেছে সেটা মারাত্মক হতে বাধ্য। কিন্তু সে যাই হোক প্রমাণ তো দরকার, প্রমাণের জন্য সে একটা মাস অপেক্ষা করেছে, যত অপেক্ষা করেছে ততই বেশি অধৈর্য হয়ে উঠেছে। সিয়েরের ডিভিশন সম্পর্কে দরখভের প্রতিবেদন, নেপোলিয়নের সেনাদলের দুর্দশা সম্পর্কে গেরিলাদের সংবাদ, মস্কো ছেড়ে যাবার প্রস্তুতির গুজব-সবকিছু এই ধারণাকেই সমর্থন করছে যে ফরাসি বাহিনী মার খেয়ে পালাবার তাল করছে। কিন্তু এসবই তো ধারণামাত্র, যুবকদের কাছে এগুলি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও কুতুজভের কাছে তা নয়। ষাট বছরের অভিজ্ঞতায় সে জানে গুজবকে কতটা মূল্য দেওয়া যায়, এতে আত্মতুষ্টির অবকাশ মেলে, কিন্তু বিরূপ পরিস্থিতির কোনো মূল্যায়ন হয় না। তাই তার মনে স্বস্তি নেই। রুটিনমাফিক সবকাজই সে করে-সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে, চিঠিপত্র লেখে, পিটার্সবুর্গের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, ইত্যাদি। কিন্তু একমাত্র সেই দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পায় ফরাসিদের ধ্বংস, আর সেটাই তার অন্তরের একমাত্র কামনা।
১১ অক্টোবর রাতে হাতের উপর ভর দিয়ে শুয়ে শুয়ে সেই কথাই সে ভাবছিল। পাশের ঘরে কারা যেন এসেছে, তোল, কনভনিৎসিন ও বলখভিতিনভের পায়ের শব্দ কানে এল।
আরে, ওখানে কারা? বহিরে আসুন, ভিতরে আসুন! খবর কি? ফিল্ডমার্শাল তাদের ডাকল।
একটি পরিচারক মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল। তোল সংক্ষেপে খবরটা জানাল।
সংবাদ এনেছে কে? এমন ভাবে তাকিয়ে কুতুজভ প্রশ্নটা করল যে মোমবাতির আলোয় তার কঠোরতা তোল-এর দৃষ্টি এড়াল না।
এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই ইয়োর হাইনেস।
তাকে ভিতরে ডাকুন, এখানে ডেকে আনুন।
কুতুজভ একটা পা ঝুলিয়ে বিছানায় উঠে বসল, অপর ভাঁজ-করা পায়ের উপর রইল তার ভুড়িটা। তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে সে সাংবাদবাহকের দিকে তাকাল, যেন নিজের মনের কথাটাই তার মুখের উপর দেখতে চাইল।
