সেকাজের জন্য বলখভিতিনভ নামক একজন দক্ষ অফিসারকে বেছে নেওয়া হল, একটা লিখিত প্রতিবেদন পেশ করা ছাড়াও সে মুখে মুখে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবে। মধ্যরাতে চিঠি ও মৌখিক নির্দেশ নিয়ে বলখভিতিনভ বাড়তি ঘোড়াসহ একজন কসাককে সঙ্গে নিয়ে প্রধান ঘাঁটির উদ্দেশ্যে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
.
অধ্যায়-১৬
হেমন্তের আতপ্ত অন্ধকার রাত। চারদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। দুবার ঘোড়া বদল করে আঠালো কর্দমাক্ত পথে দেড় ঘণ্টায় বিশ মাইল ঘোড়া ছুটিয়ে রাত একটায় বলখভিতিনভ লিশোভকায় পৌঁছল। একটা কুটিরের কঞ্চির বেড়ার গায়ে জেনারেল স্টাফ সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখে সেখানেই ঘোড়া থেকে নেমে হাতের লাগামটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে অন্ধকার পথে পা বাড়াল।
একটি লোক জেগে উঠে অন্ধকার পথেই সশব্দে নাক ঝাড়ছিল, তাকে দেখেই বলল, কর্তব্যরত জেনারেলের কাছে আমাকে নিয়ে চল, তুড়ন্ত! খুব জরুরি।
আর্দালিটি ফিসফিস করে বলল, সন্ধ্যা থেকে তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, আজ তিন রাত তিনি ঘুমোননি। আপনি আগে ক্যাপ্টেনকে ডেকে তুলুন।
কিন্তু ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আমি জেনারেল দখতুরভের কাছ থেকে আসছি, অন্ধকারেই খোলা দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলখভিতিনভ বলল।
আর্দালি আগেই ঘরে ঢুকে কাকে যেন ডাকতে লাগল।
ইয়োর অনার, ইয়োর অনার! একজন সংবাদবাহক।
কি? ব্যাপার কি? কার কাছ থেকে এসেছে? একটা ঘুমজড়িত কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
অন্ধকারে বক্তাকে দেখতে না পেলেও কথাশুনেই সে যে কনভনিৎসিন নয় সেটা অনুমানকরে বলখভিতিনভ বলল, দখতুরভ এবং আলেক্সি পেত্রভিচের কাছ থেকে।
যে লোকটিকে ডেকে তোলা হল সে হাই তুলে শরীরটা টান-টান করল।
কি যেন খুঁজতে খুঁজতে বলল, তাকে এখন জাগাতে চাই না। তিনি খুব অসুস্থ। হয় তো খবরটা গুজবমাত্র।
এই দেখুন চিঠি, বলখভিতিনভ বলল। আমার উপর হুকুম আছে, চিঠিটা এক্ষুনি দিতে হবে কর্তব্যরত জেনারেলের হাতে।
এক মিনিট অপেক্ষা করুন। মোমবাতিটা জ্বালাই। ব্যাটা রাস্কেল কোথাকার জিনিসপত্র সব কোথায় যে লুকিয়ে রাখে? শরীর টান-টান করে লোকটি আর্দালিকে বলল। (লোকটি কনভনিৎসি-এর অ্যাডজুটান্ট শচেরবিনিনি) পেয়েছি, পেয়েছি।
আর্দালি একটা দেশলাই ঠুকতে লাগল, শচেরবিনিন মোমবাতিদানের উপর কি যেন হাতড়াতে লাগল।
আঃ, যত সব জানোয়ার! লোকটি বিরক্ত গলায় বলল।
শচেরবিনিনের হাতের মোমবাতির আলোয় বলখভিতিনভ তার যৌবনদীপ্ত মুখটা দেখতে পেল। আর একটি ঘুমন্ত মানুষের মুখও তার চোখে পড়ল। সে কনভনিৎসিন।
মোমবাতির আলোয় শচেরবিনিন পত্রবাহককে দেখতে পেল। তার সর্বাঙ্গ কাদায় মাখামাখি, সেই আস্তিন দিয়ে মুখ মোছার ফলে মুখভর্তিও কাদা লেগেছে।
গ্রেট-কোটে শরীর ঢেকে নৈশ টুপি মাথায় যে লোকটি শুয়েছিল তার কাছে যেতে যেতে শচেরবিনিন বলল, কিছু করার নেই, তাকে ঘুম থেকে জাগাতেই হবে। পিতর পেত্রভিচ! (কনভনিৎসিন কিন্তু নড়ল না)। জেনারেল স্টাফ-এর চিঠি! সে জানে এই কথা কয়টি নিশ্চয় তার ঘুম ভাঙিয়ে দেবে।
বস্তুত সঙ্গে সঙ্গেই নৈশ টুপি পরা মাথাটা জেগে উঠল। কনভনিৎসিনের মুখটা সুন্দর ও কঠিন, গাল দুটো জ্বরে লাল হয়ে উঠেছে। মুহূর্তের জন্য বর্তমান থেকে বহুদূরের একটি স্বপ্নময় ভাব সে মুখে দেখা গেল, কিন্তু পরক্ষণেই সে চমকে উঠল, মুখের উপর নেমে এল তার স্বাভাবিক শান্ত, কটিন ভাব।
আলোর দিকে মিটমিট করে তাকিয়ে সে ধীরে সুস্থে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা। ব্যাপারটা কি?
অফিসারের বক্তব্য শুনতে শুনতেই কনভনিৎসিন সিল ভেঙে চিঠিটা পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে পশমি মোজা-পরা পা দুটো মাটির মেঝেতে নামিয়ে সে বুটজোড়া পরতে শুরু করল। মাথার টুপিটা খুলে চুলটাকে কপালের উপর আঁচড়ে আবার টুপিটা পরে নিল।
আপনি খুব দ্রুত এসেছেন তো? চলুন, হিজ হাইনেসের কাছে যাওয়া যাক।
কনভনিৎসিন সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরেছে যে আনীত সংবাদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং মোটেই সময় নষ্ট করা চলবে না। সংবাদ ভালো কি মন্দ তা সে ভাবল না। সেকথা জিজ্ঞাসাও করল না। সে ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ নেই। যুদ্ধের ব্যাপারটাকে সে বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়ে বিচার করে না, বিচার করে অন্য কিছু দিয়ে। তার মানে একটা গভীর অব্যক্ত দৃঢ় ধারণা আছে যে শেষপর্যন্ত সবই ভালোয় ভালোয় শেষ হবে, কিন্তু প্রত্যেককে নিজ নিজ কর্তব্য করে যেতে হবে। আর তাই সে করে, সর্বশক্তি নিয়োগ করে কর্তব্য পালন করে। বার্কলে, রায়েভস্কি, এর্মলভ, প্রাতভ ও মিলোরাদভিচদের মতো ১৮১২ সালের তথাকথিত মহাবীরদের তালিকায় দখতুরভের মতো পিতর পেত্রভিচ কনভনিৎসিনের নামটাও মনে হয় সৌজন্যের খাতিরেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দখতুরভের মতোই সীমিত ক্ষমতা ও তথ্যের মানুষ বলেই তারও খ্যতি ছিল, দখতুরভের মতোই সেও কখনো যুদ্ধের পরিকল্পনা রচনা করেনি, কিন্তু যেখানেই সংকট সেখানেই তাকে সবসময় দেখা গেছে। কর্তব্যরত জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হবার পর থেকে সে সর্বদাই দরজা খুলে ঘুমোয়, তার হুকুম রয়েছে প্রতিটি সংবাদবাহককে যেন তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলবার অনুমতি দেওয়া হয়। যুদ্ধের সময় সে সর্বদাই গোলাগুলির মধ্যে ছুটে যেত, তাই কুতুজভ সেজন্য তাকে তিরস্কার করেছে, তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতে ভয় পেয়েছে। দখতুরভের মতোই সেও তেমনি একটা কাঁটাওয়ালা চাকা যে কোনো শব্দ করে না বা যার প্রতিকারও নজর পড়ে না, অথচ যে চাকাটা গোটা যন্ত্রের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
