.
অধ্যায়-১৫
অক্টোবরের গোড়ায় নেপোলিয়নের কাছ থেকে শান্তির প্রস্তাবের চিঠি নিয়ে আর একজন দূত এল কুতুজভের কাছে। যদিও নেপোলিয়ন তখন কুতুজভের কাছ থেকে অনতিদূরে কালুগা রোডেই ছিল, তবু সে চিঠিতে মস্কোর তারিখ দেয়া। লরিস্তন আগে যে চিঠি এনেছিল তার যে জবাব কুতুজভ দিয়েছিল, এবারেও সেই একই জবাব দিয়ে সে জানিয়ে দিল, শান্তি স্থাপনের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
দরখভের যে গেরিলা বাহিনী তারুতিনোর বাঁ দিকে কর্মরত ছিল সেখান থেকে অচিরেই খবর এল যে ব্রুসিয়েরের এক ডিভিশন সৈন্যকে ফরমিনস্কে দেখা গেছে, আর যেহেতু তারা মূল ফরাসিবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তাই অনায়াসেই তাদের ধ্বংস করা যাবে। সৈনিক ও অফিসাররা পুনরায় যুদ্ধের দাবি জানাল। তারুতিনোর অনায়াস জয়লাভের স্মৃতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে জেনারেলরাও দরখভের প্রস্তাব মতো কাজ করতে কুতুজভের উপর চাপসৃষ্টি করল। কোনোরকম আক্রমণের দরকার আছে বলে কুতুজভ মনে করল না। ফলে অনিবার্য ভাবেই একটা সমঝোতা হল :ব্রুসিয়েরকে আক্রমণ করতে একটা ছোটখাট সেনাদলকে ফরমিনস্কে পাঠানো হল।
পরবর্তীকালে এই ছোট কাজটাই অত্যন্ত কষ্টকর ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছিল, আর একটা বিচিত্র যোগাযোগের ফলে এই কাজের ভার পড়ল দখতুরভের উপর-এ লোকটি সেই বিনীত ছোটখাট দখতুরভ যার সম্পর্কে কেউ কখনো লেখেনি যে সে যুদ্ধের পরিকল্পনা রচনা করেছে, রেজিমেন্টের আগে আগে ছুটে গিয়েছে, কামানশ্রেণীর উপর কুশ ছুঁড়ে দিয়েছে, ইত্যাদি, আর যার সম্পর্কে এই কথাই ভাবা হয়েছে ও বলা হয়েছে যে সে অস্থিরমতি ও স্বল্পবুদ্ধি-অথচ অস্তারলিজ থেকে শুরু করে ১৮১৩ সাল পর্যন্ত গোটা রুশ ফরাসি যুদ্ধে আমরা তাকেই দেখেছি যে কোনো সংকট-কালে নেতৃত্ব গ্রহণ করতে। অস্তারলিজে সকলেই যখন পালাচ্ছিল আর মরছিল, পশ্চাৎ-রক্ষীদলের একজন জেনারেলও যখন উপস্থিত ছিল না, তখন একমাত্র সেই শেষপর্যন্ত অগেজদ বাধে ছিল, রেজিমেন্ট পরিচালনা করছিল এবং সাধ্যমতো সবকিছু রক্ষা করছিল। জ্বরে আক্রান্ত হয়েও নেপোলিয়নের গোটা বাহিনীর আক্রমণ থেকে স্মোলেনস্ক শহরকে রক্ষা করতে মাত্র বিশ হাজার সৈন্য নিয়ে সে সেখানে গিয়েছিল। স্মোলেনকের মলাখভ ফটকে জ্বরের ঘোরে সবে একটু তন্দ্রা এসেছিল এমন সময় শহরের উপর বোমাবর্ষণের শব্দে জেগে উঠে সে সারাটা দিন স্মোলেনস্ক শহরকে রক্ষা করেছিল। বরদিনোর যুদ্ধে যখন ব্রাগ্রেশনের মৃত্যু হল, বাম ব্যূহের দশ ভাগের নয় ভাগ সৈন্য নিহত হল, এবং ফরাসি গোলন্দাজ বাহিনী সর্বশক্তি নিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন এই অস্থিরমতি, স্বল্পবুদ্ধি দখতুরভকেই সেখানে পাঠানো হয়েছিল-প্রথমে অন্য কাউকে সেখানে পাঠিয়ে কুতুজভ যে ভুলটা করেছিল তাড়াতাড়ি সে ভুলের সংশোধন করা হয়েছিল। শান্তশিষ্ট, হোটখাট দখতুরভ সেখানেই ঘোড়া ছুটিয়ে দিল, আর রুশ বাহিনীর শ্রেষ্ঠ গৌরবের প্রতিভূ হয়ে দেখাদিল বরদিনো। কাব্যে ও গদ্যে অনেক মহাবীরের বর্ণনাই আমাদের শোনানো হয়েছে, কিন্তু দখতুরভ সম্পর্কে একটি কথাও কেউ বলেনি।
আবার এই দখতুরভকেই পাঠানো হল ফরমিনস্কে, আর সেখান থেকে মালো-ইয়ারোস্লাভেসে, সেখানেই হল ফরাসিদের সঙ্গে শেষ যুদ্ধ, আর সেখান থেকেই ফরাসি বাহিনীতে ভাঙনের সূত্রপাত ঘটল। অথচ অভিযানের সেই সময়কার অনেক প্রতিভাধর ও বীরের কথা আমাদের শোনানো হলেও দখতুরভ সম্পর্কে প্রায় কিছুই বলা হল না, অথবা যৎকিঞ্চিৎ বলা হলেও সেটা যেন নেহাৎই একটা দায়সারা কাজের মতো করা হল। আর দুখতুরভ স্মপর্কে এই নীরবতাই তার কৃতিত্বের সব চাইতে বড় প্রমাণ।
১০ই অক্টোবর তারিখে দখতুরভ ফরমিনস্ক-এর অর্ধেক পথ পার হয়ে অরিস্তভ গ্রামে থামল এবং প্রাপ্ত আদেশমতো আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হতে লাগল। ঠিক সেই সময় গোটা ফরাসি বাহিনী যুদ্ধ করবার অভিপ্রায় নিয়ে মুরাত-এর ঘাঁটিতে পৌঁছেই হঠাৎ বিনা কারণে বাঁ দিকে মোড় নিয়ে নব কালুগা রোডে পড়ে ফরমিনস্কে ঢুকতে লাগল, সেখানে তখন ছিল শুধুমাত্র ব্রুসিয়ের। সেই সময় দখতুরভের অধীনে ছিল দরখভের সেনাদল ছাড়াও ফিনার ও সেসলাভি-এর দুটি ছোট গেরিলা বাহিনী।
১১ই অক্টোবর সন্ধ্যায় সে সলাভিন একজন ফরাসি রক্ষী সৈন্যকে গ্রেপ্তার করে অরিস্তভ প্রধান ঘাঁটিতে এসে হাজির হল। বন্দিটি বলল, ফরাসি বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশটাই সেদিন ফরমিনস্কে ঢুকেছে, নেপোলিয়ন তাদের সঙ্গেই আছে, আর চারদিন আগেই গোটা বাহিনী মস্কো ছেড়ে চলে এসেছে। সেইদিন সন্ধ্যায়ই জনৈক পারিবারিক ভূমিদাস বরভঙ্ক থেকে এসে জানাল, একটা প্রকাণ্ড বাহিনীকে সে শহরে ঢুকতে দেখেছে। দখতুরভের দলের কয়েকজন কসাকও জানাল, ফরাসি রক্ষী বাহিনীকে তারা বরভস্কের পথে যেতে দেখেছে। এই সব সংবাদ থেকে স্পষ্টই বোঝা গেল, যেখানে তারা আশা করেছিল যে মাত্র একটি ডিভিশনের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে, সেখানে এখন গোটা ফরাসি বাহিনীই একটা অপ্রত্যাশিত পথে মস্কো থেকে এগিয়ে আসছে–অর্থাৎ তারা আসছে কালুগা রোড ধরে। এ অবস্থায় কি করা উচিত সেটা। ঠিক বুঝতে না পারার জন্য তখনই সংঘর্ষে লিপ্ত হবার ইচ্ছা দখতুরভের ছিল না। তাকে হুকুম দেওয়া হয়েছে ফরমিনস্ক আক্রমণ করতে হবে। কিন্তু তখন তো সেখানে ছিল শুধুমাত্র ব্রসিয়ের, কিন্তু এখন যে গোটা ফরাসি বাহিনী সেখানে হাজির। এমলভ নিজের বিচার-বুদ্ধি অনুসারে কাজ করতে চাইল, কিন্তু দখতুরভ জানাল, তার আগে কুতুজভের নির্দেশ অবশ্যই পেতে হবে। সুতরাং স্থির হল, তার কাছে একটা চিঠি পাঠানো হবে।
