মেয়েদের গাড়িটা চলে গেল। তার পিছন পিছন এল আরো গাড়ি, আরো সৈন্য, আরো মালগাড়ি, আরো সৈন্য, কামানের গাড়ি, সৈন্য, বারুদের গাড়ি, আরো সৈন্য, আর মাঝে মাঝেই মেয়ের দল।
পিয়ের কোনো ব্যক্তিবিশেষকেই দেখছে না, দেখছে শুধু তাদের গতিবিধি।
মনে হচ্ছে, কোনো অদৃশ্য শক্তি বুঝি এই সব লোকজন ও ঘোড়াকে টেনে নিয়ে চলেছে। পিয়েরের চোখের সামেন যারা নানা পথ ধরে ধেয়ে আসছে তাদের সকলেরই একই লক্ষ্য তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাওয়া : সকলেই ধাক্কাধাক্কি করছে, রাগ করছে, মারামারি করছে, তাদের সাদা দাঁতগুলি ঝিকমিক করছে, ভুরু কুঁচকে উঠছে, চারদিক থেকে একই ধরনের গালাগালি ভেসে আসছে, আর সকলের মুখেই ফুটে উঠেছে সেই একই কঠোর, নিষ্ঠুর ভাব যা সকালেই পিয়ের দেখেছে ঢাকের শব্দের সঙ্গে কর্পোরালের মুখে।
সন্ধ্যা নাগাদ রক্ষীদলের অধিনায়কের চিৎকার, হাঁকডাক ও আপ্রাণ চেষ্টায় চারদিক থেকে চিড়ে-চ্যাপ্টা হওয়া বন্দিরা কোনো রকমে কালুগা রোডে উঠে হাঁফ ছাড়ল।
বিশ্রাম না নিয়েই তারা দ্রুত হাঁটতে লাগল, থামল একেবারে সূর্যাস্তের মুখে। মালপত্রের গাড়িগুলোও পৌঁছে গেল, সকলে রাতের বিশ্রামের আয়োজন করতে লাগল। সকলেই ক্রুদ্ধ, অসন্তুষ্ট। অনেকক্ষণ পর্যন্ত চারদিক থেকে শোনা যেতে লাগল ঈশ্বরের দোহাই, ক্রুদ্ধ চিৎকার ও মারামারির শব্দ।
এই বিশ্রামের কালে রক্ষীদলের লোকরা বন্দিদের প্রতি আগের চাইতে অনেক বেশি খারাপ ব্যবহার করতে লাগল। এখানেই প্রথম বন্দিদের খাদ্য-রেশন হিসেবে দেয়া হল ঘোড়ার মাংস।
অফিসার থেকে শুরু করে নিম্নতম সৈনিক পর্যন্ত সকলেই প্রতিটি বন্দির উপর যেন ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে লাগল, অথচ আগে তাদের ব্যবহার ছিল কত বন্ধুত্বপূর্ণ।
এই আক্রোশ আরো বেড়ে গেল যখন বন্দিদের নাম ডাকার পরে দেখা গেল, যে রুশ সৈনিকটি, শূলবেদনার ভান করছিল, মস্কো ছাড়বার গোলমালের সুযোগে সে পালিয়েছে। পিয়ের দেখল, রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে সরে যাওয়ার জন্য জনৈক ফরাসি একটি রুশ সৈনিককে নির্মমভাবে প্রহার করছে, আর রুশ সৈনিকটির পলায়নের জন্য একজন নন-কমিশনড অফিসারকে দায়ী করে তার বন্ধু সেই ক্যাপ্টেনটি তাকে কোর্ট-মার্শাল করবে বলে শাসাচ্ছে। নন-কমিশনড অফিসারটি যখন যুক্তি দেখাল সে সেই বন্ধুটি অসুস্থ থাকায় হাঁটতে পারছিল না, তখন অফিসারটি জবাবে বলল, যারা পিছিয়ে পড়বে তাদের গুলি করে মারববার হুকুম তো দেয়াই ছিল। পিয়েরের মনে হল, যে মারাত্মক শক্তি প্রাণদণ্ড বিধানের সময় তাকে একেবারে বিধ্বস্ত করে ফেলেছিল, কিন্তু বন্দি অবস্থায় থাকার সময় যার কথা সে ভুলেই গিয়েছিল, সেই শক্তি আবার তার অস্তিত্বের উপর চেপে বসেছে। সে শক্তি ভয়ংকর, কিন্তু পিয়ের অন্তরে অন্তরে অনুভব করল, সেই মারাত্মক শক্তি তাকে ধ্বংস করতে যত চেষ্টাই করুক, তার অন্তরের মধ্যে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে, শক্তিশালী হয়ে উঠছে জীবনের এক নতুন শক্তি।
ঘোড়ার মাংস ও যবের ঝোল সহযোগ নৈশাহার সেরে সে বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজব করতে লাগল।
তারা মস্কোতে যা দেখেছে, অথবা ফরাসিদের কাছ থেকে যে রূঢ় ব্যবহার তারা পাচ্ছে, অথবা তাদের গুলি করে মারবার সে হুকুম জারি করা হয়েছে, পিয়ের বা অন্য কেউই সে সম্পর্কে কোনো কথাই বলল না। যেন তাদের অবস্থার অবনতির প্রতিক্রিয়া হিসেবেই তারা বিশেষভাবে উজ্জীবিত ও আনন্দিত হয়ে উঠেছে। অভিযানকালে যেসব মজার দৃশ্য তারা দেখেছে তারই স্মৃতিচারণায় তারা সময় কাটাতে লাগল, বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনো কথাই বলল না।
সূর্য অনেকক্ষণ অস্ত গেছে। আকাশে অনেক তারা জ্বলজ্বল করছে। পূর্ণ চাঁদের উদয়ে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে অগ্নিকাণ্ডের মতো একটা লাল আভা। প্রকাণ্ড লাল গোলকটি ধূসর পরিবেশের মধ্যে বিচিত্র ভঙ্গিতে দুলছে। ক্রমে তার রং হাল্কা হয়ে এল। সন্ধ্যার অবসান হয়েছে, কিন্তু এখনো রাত আসেনি। পিয়ের উঠে পড়ল, নতুন সঙ্গীদের ছেড়ে শিবির-আগুনগুলো পার হয়ে রাস্তার অপর পাশে চলে গেল, সে শুনেছে, সাধারণ সৈনিকদের সেখানেই রাখা হয়েছে। সে তাদের সঙ্গে কতা বলবে। পথে একটি ফরাসি শান্ত্রী তাকে থামাল, ফিরে যেতে হুকুম করল।
পিয়ের ফিরে গেল, শিবির-আগুনের পাশে সঙ্গীদের কাছে নয়, ফিরে গেল একটা গাড়ির কাছে, সেখানে কেউ নেই। গাড়ির চাকার পাশে দুই পা ভেঙে মাথাটা নুইয়ে ভিজে মাটির উপর বসে অনেকক্ষণ পর্যন্ত নিজের চিন্তায় ডুবে রইল। হঠাৎ সে উচ্চকণ্ঠে হো-হো করে এমনভাবে হেসে উঠল সে আশপাশের সকলেই সবিস্ময়ে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করল, এই বিচিত্র, একক হাসির অর্থ কি।
হা-হা-হা! পিয়ের হাসছে। তারপর উচ্চকণ্ঠে নিজেকেই বলল, সৈনিকটি আমাকে যেতে দিল না। তারা আমাকে ধরে আটক করেছে। আমাকে বন্দি করেছে। কি, আমাকে? আমাকে? আমার অমর আত্মাকে হা হা-হা! হা-হা-হা!… হাসতে হাসতে তার চোখে জল এসে গেল।
একজন উঠে দেখতে এল, এই বিচিত্র মানুষটি নিজে-নিজেই হাসছে কেন? হাসি থামিয়ে পিয়ের উঠে পড়ল, কৌতূহলী লোকটার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে চারদিকে তাকাল।
সীমাহীন প্রকাণ্ড অস্থায়ী আস্তানাটা এতক্ষণ শিবির-আগুনের ফট-ফট শব্দে ও নানা জনের কণ্ঠস্বরে মুখরিত ছিল, এখন সব নিস্তব্ধ, আগুনের লাল আভা ক্রমেই স্তিমিত হয়ে আসছে। মাথার উপরে আকাশের গায়ে ভরা চাঁদটা ঝুলে আছে। আগে চোখে না পড়লেও দূরের বন ও প্রান্তর এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আরো দূরে, সব বন ও প্রান্তর পেরিয়ে, উজ্জ্বল দোদুল্যমান অসীম দূরত্ব যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পিয়ের বহুদূরবর্তী আকাশ ও ঝিকিমিকি তারাদের দিকে তাকাল। ভাবল, আর এসবই তো আমি, এসবই তো আছে আমার অন্তরের মধ্যে, এই সবকিছুকে নিয়েই তো আমি। অথচ এই সবকিছুকে ধরে এনে ওরা কাঠের বেড়া দেওয়া চালাঘরের মধ্যে বন্দি করেছে। সে হাসল, তারপর উঠে গিয়ে সঙ্গীদের পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
