আগুনে-পোড়া ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকিয়ে বন্দিরা অনেকেই বলতে লাগল, ওঃ, ওঃ, ওঃ! ওরা কী করেছে? নদীর ওপারে সবকিছু, আর জুবভা ও ক্রেমলিন…তাকিয়ে দেখ! অর্ধেকটাও নেই। হ্যাঁ, আমি তো বলেছিলাম-নদীর ওপার পর্যন্ত সবকিছু গেছে, আর সেই কথাই ঠিক।
মেজর বলে উঠল, আচ্ছা, জানই তো সব পুড়ে গেছে, তাহলে সেকথা বলে আর লাভটা কি?
খামভনিকির (এ অঞ্চলটা পোড়ে নি) একটা গির্জার কাছ দিয়ে যাবার সময় বন্দিরা সকলেই সহসা একপাশে সরে গেল, সকলের কণ্ঠে ফুটে উঠল ত্রাস ও বিরক্তির চিৎকার।
আঃ, শয়তানের দল! নাস্তিকের দল! হ্যাঁ, মৃত, মৃত, লোকটা নির্ঘাৎ মৃত…সারা গায়ে কি যেন মাখানো!
যে বস্তুটি দেখে সকলে চিৎকার করছে। পিয়ের গির্জার সেই দিকটাতে এগিয়ে গেল। অস্পষ্টভাবে দেখতে পেল, কে যেন গির্জার বেড়ার গায়ে হেলান দিয়ে রয়েছে। একটা মানুষের মৃতদেহ, বেড়ার গায়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে, মুখে ঝুল-কালি মাখিয়ে দিয়েছে।
এগিয়ে চল! কী শয়তান…এগিয়ে চল! ত্রিশ হাজার শয়তান!…
রক্ষীবাহিনীর লোকরা শাপ-শাপান্ত করতে লাগল, আর ফরাসি সৈন্যরা নতুন উদ্যমে সেই সব বন্দিদের তলোয়ারের খোঁচায় এগিয়ে নিয়ে চলল যারা দাঁড়িয়ে মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
.
অধ্যায়-১৪
খামনিকি অঞ্চলের এড়ো পথ ধরে বন্দিরা এগিয়ে চলেছে। তাদের পিছনে চলেছে শুধু রক্ষীবাহিনীর লোক এবং তাদের যানবাহন ও মালগাড়ি। কিন্তু সরবরাহ-ভাণ্ডারের কাছে পৌঁছেই তারা মিশে গেল প্রকাণ্ড একসারি বারুদবাহী গাড়ি ও বেসরকারী যানবাহনের জটলার মধ্যে। যারা সামনে রয়েছে তাদের রাস্তা পার হবার অপেক্ষায় বন্দিরা সেতুর মুখে থেমে গেল। সেতুর উপর থেকে তারা দেখল, সামনে ও পিছনে মালগাড়ির সীমাহীন ভিড়। ডানদিকে যেখানে কালুগা রোড নেসকুচনির কাছে মোড় নিয়েছে সেখানে সেনাদল ও গাড়ির সীমাহীন সারি বহুদূর পর্যন্ত চোখে পড়ছে। এইসব সৈন্যই বিউহারনায়েস-এর দলের, তারাই যাত্রা করেছে অন্য সকলের আগে। পিছনে নদীর তীরবরাবর এবং পাথর সেতুর উপরে রয়েছে নে-র সেনাদল ও যানবাহন।
বন্দিরা আছে দাভুত-এর সেনাদলের হেপাজতে। তারা ক্রিমিয় সেতু পার হচ্ছে, অনেকে ইতিমধ্যেই ভিড় থেকে বেরিয়ে কালুগা রোডে পড়েছে।
ক্রিমিয় সেতু পার হয়ে বন্দিরা কয়েক পা এগিয়ে থামল, তারপর আবার এগিয়ে চলল। চারদিক থেকে যানবাহান ও সৈন্যরা এসে ক্রমেই ভিড় বাড়াতে লাগল। কালুগা রোড থেকে সেতু পর্যন্ত কয়েকশো পা এগোতেই তাদের একঘণ্টার বেশি সময় লাগল। কালুগা রোড ও ট্র্যান্সমকভার সংযোগে পৌঁছে ভিড়ের চাপে বন্দিদের কয়েক ঘন্টা সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হল। সমুদ্রগর্জনের মতো চারদিক থেকে শোনা যেতে লাগল চাকার ঘর্ঘর, পায়ের শব্দ, আর রাগারাগি ও গালাগালির অবিশ্রাম চিৎকার। একটা পোড়া বাড়িতে হেলান দিয়ে পিয়ের সেই শব্দ শুনছে, তার কল্পনায় সেই শব্দের সঙ্গে এসে মিশেছে ঢাকের শব্দ।
পিয়ের যে আধ-পোড়া বাড়িটার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কয়েকজন অফিসার-বন্দি পরিস্থিতিটা ভালো করে দেখবার জন্য সেই বাড়িরই প্রাচীরের উপর উঠে গেল।
তারা চেঁচিয়ে বলতে লাগল, কী ভিড়! ভিড়ের দিকে তাকাও!…কামানের উপরে পর্যন্ত মালপত্র বোঝাই করেছে। দেখ, দেখ, বদমাসরা কত জিনিস লুট করেছে…ওই দেখ। গাড়িতে লোকটার পিছনে কি রয়েছে।…আরে, হা ঈশ্বর, ওগুলো দেবমূর্তির ফ্রেম!…ওঃ, রাস্কেলের দল!…দেখ, ওই লোকটা কত জিনিস কাঁধে নিয়েছে, হাঁটতে পারছে না। হায় প্রভু, ওরা যে গাড়ির চাকাগুলো পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে।…আর ট্রাংকের উপর বসে-থাকা ওই লোকগুলোকে দেখ…হায় ভগবান! ওরা যে লড়াই করছে…।
ঠিক হয়েছে, লাগাও নাকের উপর এক ঘুষি-ঠিক নাকের উপর। এভাবে চললে আমরা তো সন্ধ্যার আগে বের হতেই পারব না। দেখ, ওদিকে দেখ…আরে, ওটা নিশ্চয় নেপোলিয়নের নিজের। কী সব ঘোড়া! আর মুকুটসহ যুক্তাক্ষর-চিত্রগুলি। সবটাই যেন একটা চলমান বাড়ির মতো।…ওই একটা লোকের বস্তাটা পড়ে গেল, আর সেটা খুঁজে পাচ্ছে না। আবার লড়াই…শিশু-কোলে একটা মেয়েমানুষ, দেখতে মন্দ নয়! হ্যাঁ, এভাবে ছাড়া এগোবার পথ পাবে না…তাকিয়ে দেখ, ভিড়ের যেন শেষ নেই। রুশ কুমারীরা…হা ঈশ্বর, তারাও এসেছে! গাড়ির মধ্যে-দেখ, কেমন আরাম করে তারা বসেছে।
খামভনিকির গির্জার কাছে যেমন ঘটেছিল তেমনই কৌতূহলের ঢেউয়ের টানে বন্দিরা আবারও সামনের দিকে এগিয়ে গেল, চেহারাটা উঁচু-লম্বা হওয়ায় পিয়ের সকলের মাথার উপর দিয়েই তাদের এই কৌতূহলের কারণটা লক্ষ্য করতে পারল। বারুদের গাড়িগুলো মাঝখানের তিনটে গাড়িতে গাদাগাদি করে বসে আছে কতকগুলি মেয়ে। চোয়াড়ে মুখ, পরনে জ্বলজ্বলে রঙের পোশাক। কর্কশ স্বরে চিৎকার করে তারা কি যেন বলছে।
সেই রহস্যময় শক্তিকে চিনবার মুহূর্ত থেকেই পিয়েরের কাছে কোনো কিছুই আর বিচিত্র বা ভয়ংকর বলে মনে হচ্ছে না : কৌতুকভরে মুখে ঝুল-কালি মাখানো একটা মৃতদেহ নয়, এই চলমান মেয়েগুলো নয়, বা মস্কোর ধ্বংসাবশেষও নয়। এখন যা কিছু চোখে পড়ছে কিছুই তার মনের উপর দাগ কাটতে পারছে না–যেন একটা কঠোর সগ্রামের প্রস্তুতির দরুন তার মনকে দুর্বল করে দিতে পারে এমন কোনো কিছুকেই সে আমল দিচ্ছে না।
